তাহরিমা জান্নাত সুরভী, তাকে দুইদিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। তারপর সন্ধ্যায় ওই মিথ্যা মামলায় জামিন দেওয়া হয়। কিন্তু জামিনেই কি সব সমস্যা মিটে গেছে? আজকের আলাপে থাকছে সে বিষয়-
বিপ্লবীদের অভিযোগ, জন্মসনদে তার বয়স ১৭ হলেও ২১ বছর দেখিয়ে সুরভীকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিলো।
প্রিজন ভ্যানে ওঠার আগে ধারণ করা তার একটি ভিডিও ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেখানে সুরভী স্পষ্টভাবে অভিযোগ করেছে- ফারুক নামের একজন তার কাছে টাকা দাবি করেছিলো। টাকা না দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।
এই ফারুক কে?
তিনি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, কালিয়াকৈর থানার উপ-পরিদর্শক ওমর ফারুক।
ধরে নেওয়া যাক, সুরভীর অভিযোগ মিথ্যা। কিন্তু সেটি মিথ্যা- এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগেই প্রশ্ন আসে: এই অভিযোগের পর পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এসেছে কি?
এই ভিডিও ধারণ করা পর্যন্ত আসেনি।
আর ঠিক এখানেই রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়।
সত্য হোক বা মিথ্যা- একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ উঠলে সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত শুরু হওয়াই ছিল ন্যূনতম দায়িত্ব। কারণ পুলিশের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ নতুন নয়; এটি একটি কাঠামোগত ব্যাধি, বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
কিন্তু আইজিপি বাহারুল আলম সাহেব নীরব।
জুলাইয়ে তার ভূমিকা ছিল- এ কথা সত্য। পিনাকী ভট্টাচার্য তাকে প্রকাশ্যে সার্টিফিকেটও দিয়েছেন। এই কারণেই হয়তো অনেকে তাকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখছেন। আমিও আপাতত রাখছি।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়।
তিনি জাতীয় পার্টির নেতা মুজিবুল হক চুন্নুর ভাতিজা। তার শ্বশুরবাড়ি গোপালগঞ্জে। একটু খোঁজ নিলেই শ্বশুরবাড়ি পক্ষের আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।
এসব বলার উদ্দেশ্য চরিত্রহনন নয়- বরং স্বার্থের সংঘাত বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট বোঝানো।
এই প্রেক্ষাপটে পিনাকী ভট্টাচার্যের কাছে অনুরোধ-
আপনি বাহারুল আলম সাহেবের বর্তমান অবস্থান নিয়ে একটি পর্যালোচনা দিন।
আপনি সুরভীকে নিয়ে একটি স্ট্যাটাসে লিখেছেন- “এই ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, সবাই জয় বাংলা হয়ে যাবে।”
আমরাও সেটাই চাই।
কিন্তু তার আগে জানতে চাই- আইজিপি বাহারুল আলম এই চেয়ারে বসে আসলে কী করছেন?
তিনি যদি সৎ হন, কিন্তু কাঠামোগতভাবে অসহায় হন- তাহলে তার উচিত পদত্যাগ করা। পদত্যাগ না করলেও অন্তত একটি ব্যাখ্যা দেওয়ার নৈতিক দায় তার রয়েছে।
ইদানীং যারা তাকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন, তাদের ওপর সামাজিক মাধ্যমে সংঘবদ্ধ আক্রমণ হচ্ছে। আশ্চর্যজনকভাবে দেখা যাচ্ছে- এই আক্রমণকারীদের বড় অংশই ‘জয় বাংলা’ পরিচয়ে সক্রিয়।
প্রশ্ন তৈরি হয়-
বাহারুল আলমকে রক্ষা করতে ‘জয় বাংলা’র লোকদের আগ্রহ এতো বেশি কেন?
অন্যদিকে তার অধীনস্থ বাহিনী উঠে-পড়ে লেগেছে জুলাই যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিতে।
সুরভীর বিরুদ্ধে আনা হয়েছে চাঁদাবাজির অভিযোগ। দেশজুড়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা চলছে। পুলিশ যদি সত্যিই সঠিক অবস্থানে থাকে, তাহলে তারা নীরব কেন?
জুলাই যোদ্ধা মাহদী হাসানকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অভিযোগ- সে থানায় গিয়ে ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে।
ঔদ্ধত্য দেখানো ঠিক না। কিন্তু সে থানায় গিয়েছিল কেন? একজন নির্দোষকে ‘ডেভিল’ আখ্যা দিয়ে আটক করা হয়েছিল। তাকে ছাড়াতে গিয়েছিল মাহদী। ওই ছেলেটা জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে, সেটা পুলিশের অজানা থাকার কথা নয়।
তাহলে পুলিশের সমস্যা কোথায়?
তারা মূলত ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের ধরতে পারছে না। কিন্তু ছাত্রলীগ ছেড়ে যারা জুলাই যুদ্ধে গেছে- তাদেরকেই ‘ডেভিল’ বানাচ্ছে।
সমস্যাটা এখানেই-
ছাত্রলীগ করেও তারা কেন বিপ্লবের পক্ষে দাঁড়ালো, সেটাই তাদের কাছে অপরাধ। জুলাই আন্দোলনের সময় বহু ছাত্রলীগ নেতা পদত্যাগ করেছিলেন। তাদের সেই সাহসী সিদ্ধান্ত আন্দোলনে শক্তি এনে দিয়েছিলো।
আর আজ-
জুলাইয়ের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সরকার সেই মানুষগুলোকেই একে একে মিথ্যা মামলায় ফাঁসাচ্ছে। জনমতের চাপে মাহদী আর সুরভী জামিন পেয়েছে। এতে “সত্যের জয় হয়েছে” বলে জয়ধ্বনি দিচ্ছে মানুষ। কিন্তু পুলিশের যে লোকগুলো এই অন্যায় করলো- তারা তো বহাল তবিয়তেই থেকে গেছে। আর মাহদী এবং সুরভী কিন্তু মামলা থেকে মুক্ত হয়নি। তাদের হয়রানি এখনো বাকি আছে। মামলার ধকল টেনে নিয়ে যেতে হবে এই দুই জুলাইযোদ্ধাকে।
কিন্তু যারা তাদেরকে ফাঁসালো- তাদের দায় কী?
পুলিশ বলে কি তারা দায়মুক্ত?
যদি দায় না থাকে, তাহলে আইনের শাসন শব্দটাই অর্থহীন।
তাহলে পুলিশ রাখার প্রয়োজনই বা কী?
আপনারা কি চান- এই অন্যায়ের বিচার জনতা নিজের হাতে তুলে নিক? তখন আবার “মব” বলে চিৎকার করবেন।
ইতিহাস বলে- যখন রাষ্ট্র অন্যায় ঠেকাতে ব্যর্থ হয়, তখন জনতার বাঁধ ভাঙে। জুলাইয়ে ভেঙেছিল। ভুলে গেছেন?
আমাদের দুর্ভাগ্য-একটি বিপ্লব ঘটেছিল, কিন্তু বিপ্লব সম্পন্ন হয়নি। পুরনো ডেভিলরা নতুন মুখোশ পরে রাষ্ট্র চালাচ্ছে। তার ফল-শহীদ ওসমান হাদি। হাসনাত আব্দুল্লাহর গাড়িবহরে একের পর এক হামলা। ওইসময় পুলিশ কোথায় ছিল?
আজ পুলিশ সন্ত্রাস ঠেকাচ্ছে না- পুরনো কায়দায় নিজেরাই সন্ত্রাসে পরিণত হয়েছে। মাহদী, সুরভী- একটার পর একটা জুলাই যোদ্ধাকে থামানোর চেষ্টা চলছে।
হাদিকে হত্যা করার পরের দৃশ্য দেখেননি আপনারা?
তারপরও এই সাহসটুকু করছেন কীভাবে?
নির্বাচনী বিধি-নিষেধের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিপ্লবীদের ওপর প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছেন?
আপনারা চাচ্ছেন, ওরা আবার রাস্তায় নেমে আসুক, নির্বাচন বানচাল হয়ে যাক। তারপর ক্ষমতা হাতে তুলে নিক বুকে পাথর চাপা দিয়ে রাখা কোনো ব্যক্তি!
আসলে ভুলটা তো বিপ্লবীদের। ওরা শুরুতেই এক চিমটি বিপ্লবী, এক চিমটি এলিট আর এক চিমটি সুবিধাবোঘীদের নিয়ে একটা স্যালাইন সরকার বানিয়েছে।
বিপ্লব সফল হওয়া আর বিপ্লবের লক্ষ্য বাস্তবায়ন হওয়া এক জিনিস নয়। বিপ্লব যদি কেবল শাসকের পতনে সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু রাষ্ট্রের কাঠামো, আইন, নিরাপত্তা বাহিনী ও আমলাতন্ত্রে মৌলিক পরিবর্তন না আসে, তবে পুরনো শক্তিগুলো নতুন মুখোশে ফিরে আসে।
বিপ্লব-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার যদি আগের ত্রুটিপূর্ণ সংবিধান, অপরাধী প্রশাসন এবং দমনমূলক নিরাপত্তা কাঠামো অক্ষত রাখে, তবে সেটি কার্যত একটি “কাউন্টার-রেভল্যুশনারি ট্রানজিশন”-এ পরিণত হয়।
রাজনীতি তত্ত্বে বলা হয়, বিপ্লবের পর যদি ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে পুরনো এলিটদের সরানো না হয়, তারা রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে বিপ্লবকে ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। পুলিশ ও আমলাতন্ত্রে পুরনো অপরাধীরা থাকলে রাষ্ট্র আসলে বিপ্লবী জনগণের নয়, বরং পুরনো শাসকগোষ্ঠীর হাতেই থেকে যায়।
পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী যদি বিপ্লবের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের জন্য বিচারের মুখোমুখি না হয়, তাহলে তাদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা যায়: “আমরা দায়মুক্ত।” এই দায়মুক্তি থেকেই আসে- তদন্তে গাফিলতি। অপরাধীদের রক্ষা। দমন। বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা।
বিপ্লব পুরনো কাঠামোর জন্য এক ধরনের অস্তিত্বগত হুমকি। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, যারা ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা করে, তারা ভয়ের কারণে আরও সহিংস হয়। নিজেদের অপরাধ ঢাকতে নতুন অপরাধ করে। বিপ্লবীদেরকে “শত্রু” হিসেবে ডিহিউম্যানাইজ করে। একজন বিপ্লবীকে হত্যা, এতে পুলিশের গাফিলতি এবং তার বিচার না হওয়া এই মানসিকতারই ফল।
ট্রানজিশনাল জাস্টিস ছাড়া বিপ্লব টেকে না। এখানে দরকার ছিলো- সত্য উদঘাটন। অপরাধীদের বিচার। ভুক্তভোগীদের স্বীকৃতি। কিন্তু হয়েছে উল্টোটা। চালু হয়ে গেছে “ভুলে যাওয়ার রাজনীতি”। এতে রাষ্ট্র হারাতে বসেছে নৈতিক ভিত্তি।
যে সরকার জনগণের বিপ্লবী ম্যান্ডেট না নিয়ে আগের সংবিধানের আশ্রয়ে দাঁড়ায়, তার বৈধতা দুর্বল হয়। এই দুর্বলতার সুযোগ নেয় পুরনো ষড়যন্ত্রকারীরা।
পুলিশকে বুঝতে হবে- রাষ্ট্র কোনো দল বা গোষ্ঠীর নয়। বিচার এড়িয়ে গেলে ইতিহাস ক্ষমা করে না। আজ তারা অপরাধ আড়াল করছে, কাল তারাই বলির পাঁঠা হতে পারে।
বিপ্লবীরা এখন তাহলে কী করবেন?
প্রশাসন ও নিরাপত্তাবাহিনীতে লুকিয়ে থাকা লোকদের অন্যায়গুলোর দলিল সংরক্ষণ করুন। লিখে রাখুন। সাক্ষী, সময় ও প্রমাণগুলোই হবে ভবিষ্যতের বিচারের ভিত্তি।
রাজনীতিতে বন্দুকের চাইতেও শক্তিশালী হলো বর্ণনা। বিপ্লবীদের “অপরাধী” বানানোর চেষ্টার বিরুদ্ধে যুক্তি ও তথ্য দিয়ে কথা বলতে হবে। ঐক্য ধরে রাখুন। দমনমূলক পরিস্থিতিতে বিভক্তি উসকে দেয় ষড়যন্ত্রকারীরা। তাদের উসকানিতে পা দেওয়া যাবে না।
বিপ্লব একদিনের ঘটনা নয়- এটি একটি দীর্ঘ নৈতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম। যদি বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্র পুরনো অপরাধীদের আশ্রয় দেয়, তবে রাষ্ট্র নিজেই জনগণের শত্রুতে পরিণত হয়। ইতিহাস বলে, সত্য চাপা দেওয়া যায়, মুছে ফেলা যায় না।
আলাপ: শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ
প্রযোজনা: সজল ফকির