
আতা সরকার
রঙমালা টের পায়নি, ময়দান সওদাগর সারা রাত ঘরে ফিরে নাই। এমন মাঝেমাঝেই হয়। ময়দান নিজ গাঁয়ে কিংবা দূর গাঁয়ে কোথাও তাসের আড্ডায় বসে অথবা যাত্রা পালা দেখতে যায়। বাউলা গানের আসরও তাকে খুব টানে। এসবের পাল্লায় পড়লে তার দিনরাত বা বৌ সংসার- কারো কথাই কিচ্ছু মনে থাকে না। সে রাত আর তার ঘরে ফেরার কথা মনেই পড়ে না। চোখ লাল টকটকে ভাঙ্গাচুরা চেহারা নিয়ে ফিরে পরদিন রোদ-জ্বলা সকালে।
সেদিনও সন্ধ্যায় ময়দান সওদাগর সন্ধ্যা নেমে আসার আগেই নীল বর্ণ সার্ট গায়ে চড়িয়ে লাল মাফলার গলায় জড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছিল।
রঙমালা সোহাগী মধুর স্বরে আহ্লাদি গলায় জিজ্ঞেস করেছিল: নওশা সাইজ্যা কই যাইতাছো গো?
ময়দান ধমকে উঠেছিল: কি করতাছি, কই যাইতাছি, এইসব ঠিকানা খবর জাইন্যা তর কাম কিরে মাগী?
সেদিন থেকেই রঙমালা তার কৌতুহলী জিজ্ঞাসা থামিয়ে দিয়েছিল।
ময়দান সওদাগর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই রঙমালা তার নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। পাশের ঘরটাতেই রমজানের বুড়ো বাপ। দিন-রাত অষ্টক্ষণ বিছানায় শুয়ে কাটায়। কোথায় কি ঘটছে, জগত-সংসার কিভাবে কে চালাচ্ছে, কিছুই টের পায় না বুড়ো। চোখ মেলে দেখে চারপাশটাই আন্ধার। যেন নিঃশ্বাসটাও বন্ধ হয়ে আসতে চায় তার। চারদিকের কোন শব্দও শুনতে পাচ্ছে না সে। যেন হঠাৎ করেই চরাচরের সবকিছুই থেমে আছে। বুড়োর গলায় ঘরঘর আওয়াজ ওঠে। সে আর্তনাদ করে ওঠে। চেঁচায়: অংমালা! অংমালা!
খনখনে ভাঙা গলার আর্তনাদ থেমে যেতেই নৈশব্দ ও অন্ধকার আরো বেড়ে যায়। বুড়ের সারা শরীর ছমছম করে। ভয়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। বুড়ো তারস্বর আর্তনাদের মাধ্যমে এসব ভয় তাড়াতে চায়: অংমালা! অংমালা! তুই গেলি কই? আইন্ধারে আমার দম আইটক্যা আসে। ই কুন্ গুরুস্থানে হুইত্যা আছি অংমালা? বাত্তি জ্বালাইবি না? হারামির মাগী, গেলি কই? কুন্ নাগররে লইয়্যা অসের কলসি বানতাছোস?
পাশের ঘরের ফিসফাস বুড়োর কানে আসে না। অস্থির হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে বসে সে। খ্যানখ্যানে গলায় আবার ডাকে: অংমালা!
পাশের ঘর থেকে রঙমালা এবার ঝনঝন সাড়া দেয়: কি হইছে? হইছেডা কি?
মাথায় রাগ চিড়িক দিয়ে ওঠে বুড়োর: ছিনালি ভাতারখাগী, আন্ধারে তর কুন ভাতারের আন্ডা টিপোস?
পাশের ঘরের দরজায় ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ ওঠে। কেউ ঘর থেকে বেরিয়ে চলে যায়। রঙমালা শ্বশুরের ঘরে এসে ঢোকে। বলে: অ বুইড়্যা, এই ভর সইন্দ্যেবেলায় তুমার বিগার উঠলো? নেও, এই আমি আইছি, এহোন মুখে ছিটকিনি দ্যাও।
খচ করে ম্যাচের কাঠি জ্বলে ওঠে। কুপিতে আগুন জ্বলে। বুড়ো আবার শুয়ে পড়ে বিছানায়। শুয়ে শুয়েই দেখে রঙমালাকে। আন্দাজে ঢিল ছোঁড়ে: ক্যাডা আইছিলো?
রঙমালা খ্যাঁক করে ওঠে: আইছিলো আমার যম।
ঘর থেকে বেরিয়ে যায় রঙমালা।
যাওয়ার পথে বুড়ো চোখ পাকিয়ে বলে: কই যাস?
রঙমালার পাল্টা প্রশ্ন: সাগু খাইবা না?
মুখ বিকৃত করে ঘরের চালের কড়িকাঠের দিকে তাকায় বুড়ো। ছানি পড়া চোখ সবকিছুই ঝাপসা দেখে। বুড়োর চোখের ঝাপসায় তার জোয়ানকাল তড়পায়। যৌবনবেলার গতর দৈত্য-দানোর বেশ-বাস নিয়ে তারই চারপাশে নেচে লাফিয়ে বেড়ায়। এখনকার বুড়ো অসহায় দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে শনের ফুটো চালের দিকে।
: অ বাজান, তুমার শইলের গতিক কি আইজ?
বুড়ো সাড়া দিতে চায়। গলায় ঘর-ঘর আওয়াজ ওঠে: ক্যাডা? সম্বুন্ধির পুত নাহি?
কিন্তু গলার স্বর বুঁজে আসে।
আগন্তুক কোন জবাব না পেয়ে আবার কথা বলে: কি বাজান, কতা কও না ক্যান? ভালা লাগতাছে না?
ঘরে ঢোকে তাছির আলি। চেয়ারম্যানের মেজো ছেলে। বসে বুড়োর সিথানের কাছে। কথা বলতে গিয়ে বুড়োর চোখ দিয়ে ঝরঝর পানি গড়ায়, আবেগে বুঁজে আসতে চায় কণ্ঠস্বর। ভাঙ্গা খুন খুনে গলায় বলে: তরা আছস বইল্যাই আমি আইজো বাঁইচ্যা আছি।
তাছির আলি বুড়ার অজান্তে হাসে। ভাবে: বাঁচা-বত্ত্যি আমাগোর লাইগাই তো। আমাগোর কাম সাইরা না দিয়া তুমি কোন্ দোযখে গিয়া হান্দাইবা?
বুড়ো বলে: অ তাছিইর্যা, তুই আছোস? না, গেছোসগা?
তাছির আলি সাড়া দেয়: আছি আছি! তুমারে না কইয়া যাইমু কই? তুমার চিকিৎসা তো ঠিকমতোনই চলতাছে? ওষুদপাতি আছে তো?
বুড়ো দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দেয়: মরন খাড়াযা পাহারা দ্যায় দুয়ারে। তারে ঠ্যাকামু ক্যামনে?
তাছির বলি সান্তনা দেয়: যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণে আশ। পুলা তুমার বহাত্তুইরা। দিনমজুরি কইরা যা কামায়, তার সবডাই ঝাইড়্যা আসে জুয়ার তাসে, না হইলে যাত্রাপালার হিজড়ার নাচে।
বুড়োর দীর্ঘশ্বাস প্রলম্বিত হয়: পোলাডা আর মানুষ হইলো না। বৌডা আছে বইল্যাই ঘর-সংসার এহনো টিইক্যা আছে- ভাইস্যা যায় নাই।
তাছির আলি মৃদু কণ্ঠে টিপ্পনি কাটে: গাঁও-গেরামের মানুষ তুমার ব্যাডাবৌ লইয়া এক-আধটা আকথা-কুকথা কয়।
খেঁকিয়ে ওঠে বুড়ো: কউক। মাইনষ্যা কারো ভালা দেখতে পারে না। সতী লক্ষ্মী ব্যাডাবৌ আমার। মাটি কাইট্যা, মাইনষ্যার বাড়িত বান্দি খাইট্যা আমারে খাওয়ায়, আমার পুলাডারেও। পুলার নিজের কামাই তো সব হারাম রাস্তায় খতম। এহন বৌয়ের রেজগারই ঠ্যাকা দিয়া টিকায়া রাখছে এই সংসারডারে, ঘরডারে খাড়া করাইয়া রাখছে।
তাছির আলি টিপ্পনি কেটে বিড়বিড় করে: ব্যাডাবৌয়ের উপর খুবই মোহব্বত দেখতাছি। তয় বৌডারে অতো খাডাও ক্যান?
: আমার নিজের এখন আর খাডনের তাকত নাই। আমাগোর দিকে তাকায়া বৌডা খাইডা মরে। এইডাই অর কপাল। আমাগরো কপাল!
তাছির আলি চাপা গলায় বলে: কইছিলাম তো, এতো কষ্ট কইরা কাম নাই। জমিডা দিয়া দেও। বাজান ভালো দাম দিবেন কইছেন। যদ্দিন তুমি বাঁইচ্যা আছো, তুমি এইখানেই ব্যাডা ব্যাডাবৌ নিয়া থাকবা। জমিডা পাহারা দিবা। তুমার ব্যাডারে আমাগর বছরমারি কামলা রাখমু। তারে আমাগোর খানিক জমিও বর্গা চাষে দিমু। তুমার ব্যাডাবৌরে আমার ঘরের ঢেঁকিঘরে কামে লাগামু।
বুড়োর চোখদুটো ছলছল করে ওঠে। বলে: তুমার পেস্তাবটা আমার মোনে ধরছিলো। কিন্তুক ময়দান আর অংমালা হুনলেই ছ্যাঁৎ কইরা উডে।
সাগুর বাটি হাতে রঙমালা বুড়োর ঘরে ঢোকে। তাছির আলির দিকে চোখ পাকিয়ে তাকায়। বলপ: এতক্ষণে বুঝলাম, কিয়ের লািগা এই ঘরে এতো গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর। জমি হাতাইতে আইছো? হইবো না।
তাছির আলি প্রতিবাদ জানায়: আরে না। ঐসব বাপজানের চিন্তা। আমি সাইনঝ্যার পর বাজানের খবর লইতে আইছি।
পরক্ষণেই গলা নামিয়ে বলে: আইছি তো তর লাইগ্যা। একডা অছিলা দেওন লাগে, তাই দিলাম। ময়দান কই?
রঙমালা বলে: ময়দান মিয়া সাইজা-গুইজ্যা মাঠে-ময়দানে বারাইছে। তয় তুমার কাম হইবো না।
বুড়ো রঙমালার কণ্ঠস্বর শুনে হাচড়ে-পাচড়ে উঠে বসার চেষ্টা করে। মুখে বলে: অংমালা, খাবার আনছোস?
রঙমালা মুখ ঝামটা দিয়ে বলে: আনছি। তয় রাজার পোলা রাজপুত্তুর তুমার লাইগ্যা কমলা-বেদনা আনছে। সাগু কি তুমার মুখে সাধ লাগবো?
বুড়োর ফোকলা মুখে হাসি ফোটে: সম্বুন্ধির পুত, কমলা বেদনা আনছোস নাহি?
তাছির আলি চোখ পাকিয়ে রঙমালার দিকে তাকায়। বলে: বাজান, কমলা বেদনা খাওয়ার বুঝি খুব হাউস? আনমুনি।
রঙমালা খিলখিল হাসিতে ভেঙ্গে পড়ে।
তাছির আলি বেশিক্ষণ বসেনি। এরাতেই পাশের গাঁয়ে তার জরুরি কাজ। তাই সে তাড়াহুড়া করে চলে যায়।
রঙমালা শ্বশুরকে খাইয়ে ঘর-গেরস্থালির কাজ-কম্মো সেরে নিজে খেয়ে তার ঘরে ঘুমোতে আসে।
রঙমালা-ময়দান সওদাগরের উপখ্যানের একটি আদিপর্ব রয়েছে। সওদাগর ডখন মাথায় গামছা বেঁধে মাঠে-ক্ষেতে কাজ করে। গুণগুণিয়ে গান ভাজে। মেঘ-ডাকের মতো গুরুক গুরুক হুঁকোয় তামাক টানে। কাজের অবসরে আলি বাড়ির কাচারিঘরের টানা বারান্দায় আসর জমিয়ে বসে চুটিয়ে আড্ডা জমায়।
তখন রঙমালার বয়স আর কতোইবা হবে! দশ-এগারো বছরের ছুঁড়ি। সারা দেহে ঢেঁকি-ভানার ছন্দ তুলে লাফিয়ে বেড়ায়। কথায় কথায় মুখে মুখে নানান শোলোকের রহস্যের মায়াজাল। এর সাথে ইতল-বিতল ছড়াগান। অকারণ খিলখিল হাসি। ময়দান সওদাগরকে সওয়াল করে: ও ময়দান ভাই, তুমার নামের পিছে সওদাগর ক্যান্? বাণিজ্যি নাই, বেসাত নাই, দুকানপাট-সওদাপাতির কিনাবেচা নাই- তাও তুমি হইলা এই গাঁওয়ের সওদাগর?
ময়দান সওদাগর হুঁকায় তামাক টানার ধূঁয়ো ওড়ায়। তার চোখেও চকিতে পালতোলা নাওয়ের বাণিজ্য বহর চোখে চকিতে ঝিলিক দিয়ে ওঠে। পরমুহূর্তেই সে আবার ঝিমিয়ে পড়ে।
রঙমালার তাকিয়ে এক গাল হাসে। হাসতে হাসতেই কথার পিঠে পাল্টা কথা ছাড়ে: বুবুজান আমাগোর বুদ্ধির জাহাজ একখান। তো, তুইও তো সাদা না, গা-গতরে নাই কুনো অং, আছে কেবল কালা আছাং আংরা, তাও তর নাম অংমালা ক্যান্?
দুই হাতের দুই বুড়ো আঙ্গুল উঁচিয়ে ভেংচি-কাটা জিভ দেখিয়ে বালিকা ছুটে পালায়।
ময়দান সওদাগরের তৃতীয় স্ত্রীর যখন মৃত্যু হয়, সেসময়ই রঙমালার বিয়ে হয় ভিন গাঁয়ের এক ছেলের সাথে। কিন্তু বিয়ে টিকেনি বেশিদিন। রঙমালা ফিরে এসে আবার এই গাঁয়েরই সেই চঞ্চল মেয়েটি হয়ে তার চঞ্চলতা দেখিয়ে ছুটোছুটি শুরু করে দেয়।
ময়দান সওদাগরের তৃতীয় স্ত্রী জীবিতকালেই সে উপজেলা সদর হাসপাতালে গিয়ে ভ্যাসেক্টমি করায়। তখন থেকেই তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে শুরু করে। মেজাজও ঠিক থাকে না। মুখে নানান জাতের আকথা কুকথা ফুটতে থাকে। এমন মেজাজের সাথে তাল মিলাতে হিমসিম খায় তৃতীয় স্ত্রী। ময়দান সওদাগরের ঘর প্রতিরাতের তর্জন-গর্জন ও আর্তনাদে রূপান্তরিত হয়। একদিন এক সকালে গ্রামবাসীরা দেখতে পায়, সওদাগরের তিন নাম্বার বৌ বাড়ির পাশের লিচু গাছের ডালে দিগম্বর ঝুলছে।
এরপরই গাঁয়ে রটনা: স্বামী পরিত্যক্তা রঙমালার পেটে কিছু একটা যেন নড়াচড়া করে। তা রঙমালা স্বামীর বাড়ি ছেড়ে এসেছে দেড় বছর হলো।
ময়দান সওদাগর সেসময় দিনমান ঘরেই কাটায়। আগের মতো সে আর কাজ করার জোর পায় না। বাইরে বেরুলেই মাথা ঘোরে। দুর্বল শরীরে কাজকাম করতে আর ভালো লাগে না।
এক সন্ধ্যায় রঙমালার বাবা তার ঘরে আসে। হাতদুটো জড়িয়ে ধরে। ময়দান মাথা চুলকে বলে, বাজানের সাতে আলাপ কইরা লই। বাজান পাশের ঘরেই ছিল। সেখান থেকেই সব আলাপ তার কানে আসে। হেড়ে গলায় বলে: আর আলাপের কাম নাই। ঘরে একজন মাইয়া মানুষ লাগে। নইলে সংসারের ছিরি ছাদ থাকে না। তয় অংমালার বাপ, মাইয়া গছাইতে চাইতেছ, নগদ কিছু দিও। খালি হাতে কুনো কাম হয় না।
পরের দিনই ময়দান সওদাগর তার মেয়েবয়েসী রঙমালাকে কলপমা পড়ে নিজের ঘরে তুলে আনে। বিয়ের কয়েক মাস পর রঙমালা এক মৃত সন্তানের জন্ম দেয়।
রঙমালাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ময়দান সওদাগরের ঘরে তার কেমন কাটছে, রঙমালা চোখ বন্ধ করে এক বাক্যে জবাব দিবপ: ভালাই তো।
না-মরদ না-মুরোদ তার স্বামী ময়দান সওদাগর। শরীরের সুখ তার কাছে কিছুই পায় নাই রঙমালা, কিল-চাপর আর কথায় কথায় বকাবকি ছাড়া। খাওয়া-পরারও তেমন ব্যবস্থা নাই। সবার সাথে উপোস দিতে দিতে রঙমালা শেষে নিজের খাবার, নিজের কাপড়, নিজের সুখ নিজেই খুঁজে নিয়েছে। এর সাথে সাথে স্বামী-শ্বশুরের জন্যও ব্যবস্থা করেছে। শ্বশুরের চিকিৎসা ওষুধের ব্যবস্থাও তার। শরীরে স্বাস্থ্যে ময়দানকেও খানিকটা তাজা করে তুলেছে।
কিন্তু স্বভাব বদলায়নি ময়দান সওদাগরের। আগের মতোই সুযেগ পেলে বৌকে পিটায়। মেজাজ বিগড়ালেই তার ঝাল গিয়ে পড়ে রঙমালার পিঠে।
এরপরও ময়দান সওদাগরের মতো লোকটার প্রতি, সংসারের প্রতি কৃতজ্ঞ রঙমালা। কমতজ্ঞতা থেকেই মমত্ব ও ভালোবাসা অনুভব করে। সংসারের মায়ায় জড়িয়ে যায়।
ময়দান সওদাগর রঙমালার কষ্ট অনুভব করার চেষ্টা করে। এক-আধটুকু দানাপানি পেটে পড়ায় তার শরীরে জোর এসেছে। খেত-জমিতে দিন-মজুরি খাটে। কামাইয়ের পয়সা আরো বাড়ানোর জন্য তাস নিয়ে বসে। কিন্তু হেরে যাওয়াই যেন তার ললাটলিখন। হেরে হেরে মেজাজ তিরিক্ষি হয়। তখন ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করে না সংকোচে। কিন্তু ঘরে যখন ফিরে, সব ঝাল ওঠে রঙমালার উপর। মেয়েটি যখন চুপিসারে একা একা ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদে, তখনই তাকে জড়িয়ে ধরে, সোহাগ করে। এই সোহাগে কোন কৃত্রিমতা নেই।
এইসব ভাবতে ভাবতে রঙমালার চোখ থেকে ঘুম পালায়।
আজো লোকটা বাইরে। জুয়ায়? নাকি যাত্রায়? ফিরবে কিনা আজ রাতে কে জানে! আসলে লোকটা তার থেকেই পালিয়ে বেড়ায়।
এসময় ঘরের বাইরে মৃদু ডাক: অংমালা!
রঙমালা সাড়া দেয় না।
আবার ডাক।
আবার।
রঙমালা বিরক্ত গলায় চাপা স্বরে বলে: আইজ হইবো না। যাওগা।
কী এক কায়দায় দরজা খুলে রঙমালার সিথানে এসে দাঁড়ায় তাছির আলি। বলে: আইজই তো লাগবো। আইজই চাই।
তাছির আলির কাপড়ে কাদার দাগ লেগে রয়েছে। সে নিঃসংকোচে তার পরনের কাপড় খুলে ফেলে।
রঙমালা বলে: আজ যদি সদাগর থাকতো?
তাছির আলি রঙৃালার কাছ ঘেঁষতে ঘেঁষতে জবাব দেয়: জানি, থাকবো না। সে যাতরার বাঈজী নাইচ দেখতে টাউনে গ্যাছে।
তাছির আলি আজ যেন অসুর হয়ে উঠেছে। রঙমালাকে দলিত মথিত করে মহাতৃপ্তির শ্বাস ফেলে। কাদামাখা কাপড়গুলো কাঁধে ফেলে নগ্ন দেহেই সে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
রঙমালার স্বপ্ন ফুরোয়। চোখে ঘুম নামে।
বুড়োর বাজখাই গলার আর্তচিৎকারে রঙমালার ঘুম ভাঙ্গে। ধড়ফড় করে বিছানার উপর উঠে বসে সে। বুড়ো চিল্লাচ্ছে: আমার গেল্লা! গেল্লারে! তোর এতোবড় সব্বোনাশ ক্যাডায় করলো?
রঙমালা পরনের কাপড় ঠিকঠাক করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। তখনো সূর্যের আলো ফোটেনি। কিন্তু তাদের উঠোনে গ্রামের সব মেয়েরা ভেঙ্গে পড়েছে। বুড়োর আর্তনাদ ও আহাজারি, পড়শিনীদের আহাজারি থেকে রঙমালা তেমন কিছুই ঠাহর করতে পারল না।
শুধু এই কথাটা মাথায় ঢুকল যে মধ্যডাঙ্গা বিলে তার স্বামী ময়দান সওদাগরের কিছু একটা হয়েছে।
বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল রঙমালার। ময়দান সওদাগর কি তার তৃতীয় স্ত্রীর মতো আত্মহত্যা করেছে? রঙমালারই কারণে?
উঠোনের সবাই রঙমালাকে দেখে মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছে। সবাই শধুই হায়-হায় করছে। কিন্তু ময়দানের কি হয়েছে তা কেউ খোলাসা করে সঠিক ভাবে বলছে না। ওদিকে বুড়োর বিলাপ বাড়ছে। বাড়ছে তার কণ্ঠস্বরের উচ্চগ্রাম। কিন্তু সেই বিলাপ থেকেও বুজা যাচ্ছে না, ময়দানের আসলেই কি হয়েছে! একটা কিছু ভয়ংকর সর্বনাশ ঘটেছে, রঙমালা এটা মোটামুটি বুঝতে পারল এবং সর্বনাশটা যে মধ্যডাঙ্গা বিলে এতেও তার আর কোন সংশয় নাই।
রঙমালা আর মুহূর্তও দাঁড়াল না। উঠি-পড়ি করে ছুটে চলল মধ্যডাঙ্গা বিলের দিকে। কোন বিলাপ নয়। কোন আর্তরব নয়। শুধুমাত্র হু-হু উদ্গত কান্নার চাপা ধ্বনি আর বিপন্ন চোখ গড়িয়ে অশ্রুর ধারা তার হাহাকার ছোটার রাস্তা জুড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে। শাড়ির আঁচল লুটোচ্ছে ধুলোয়, ঝাড় দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে রাস্তার আবর্জনা। এক ছুটে সে এসে হাজির হলো মধ্যডাঙ্গা বিলের পাড়ে।
বিলের পাড়ে গ্রামের লোকজনের ঢল। পুরো গ্রাম শুধু নয়, আশপাশের গ্রাম থেকেও বহু মানুষ জড়ো হয়েছে। এমন ঘটনা এই তল্লাটে এর আগে বহুদিন ঘটেনি। কেউ ভাবতেও পারে নাই, এমন ঘটবে। তাও আবার ময়দানের মতো এক ছাপোষা কামলা ব্যাটার ক্ষেত্রে।
বিলের পাড়ে চিৎ করে শুইয়ে রাখা হয়েছে ময়দান সওদাগরকে। সারা শরীর কাদামাখা। মৃত। পুরোপুরি নগ্নদেহ। মুখমন্ডলও কাদায় মাখামাখি।
তাকে পাওয়া গিয়েছে বিলের এঁদো কাদায়। মাথা কাদার ভিতর পুঁতে রাখা হয়েছিল। ঠ্যাং উপরে। পাশেই একটা বাঁশ পুঁতে তার সাথে বেঁধে রাখা ছিল।
চেয়ারম্যানের হুকুমে লোকজন তার মৃতদেহ বিল থেকে তুলে এনে পাড়ে এখানে শুইয়ে রাখা হয়েছে একটা বাঁশের চাটাইয়ের উপর। একজন কোত্থেকে একটা ছেঁড়া চাদর এনে লাশের নগ্নতা ঢেকে দিল।
কেউ কেউ বলছে: মধ্যডাঙ্গা বিলের খাটাস জ্বীন ময়দানকে ধরে এনে এখানে পু্ঁতে দিয়ে গিয়েছে।
কেউ বলছে: জুয়ার আড্ডায় হারজিত লেনদেন নিয়ে মারামারি। জুয়াড়িরা গলায় গামছা বেঁধে শ্বাসরোধে খুন করে এখানে পুঁতে দিয়ে গিয়েছে। সবগুলোই পার মাতাল ছিল। ময়দানও।
আবার কারো অনুমান: যাত্রাপালার নাচুনে হিজড়াকে নিয়ে মারপিট। তারই ধকল গিয়েছে ময়দান সওদাগরের জানের উপর দিয়ে।
রঙমালা ছুটে এলো। হামলে পড়তে গেল ময়দান সওদাগরের লাশের উপর। গাঁয়ের লোকরা তাকে আটকাল। স্বামী তা সে যেমনই হোক, তার এমন অপঘাত মৃত্যুতে শোক অত্যন্ত স্বাভাবিক, কিন্তু এখন এটা তো পুলিশ কেস। পুলিশ না এলে এই লাশ এখন ছোঁয়া যাবে না।
লোকজনের বাধা পেয়ে বিল পাড়েই লুটিয়ে পড়ে রঙমালা। তার বুক জুড়ে হু-হু পাড় ভাঙ্গে। দুর্বিনীত অন্ধকার নেমে আসে তার চোখে। সে জ্ঞান হারায়।
পুলিশ আসে। লাশ নিয়ে যায় সদরে। লাশ আর ফেরত পায় না রঙমালা। লাশ কদিন মর্গে থাকে। তারপর এর কাটাকুটি। এটাকেই নাকি পোস্টমর্টেম বলে। এরপর লাশ চলে যায় ফৌতি গোরস্থানে। সেখানেই ময়দান সওদাগরকে গোর দেওয়া হয়।
সদর যেতে পারে না রঙমালা। এক-দুদিন পুলিশ আসে। গ্রাম ঘুরে যায়। চেয়ারম্যানের বাড়িতে চা-নাস্তা খায়।
রঙমালাকে চেয়ারম্যানের বাড়িতেই তলব করে আনে। এটা ওটা নানা ধরনের টুকটাক প্রশ্ন কর। ময়দান সওদাগরের স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে। রঙমালার নিজের সম্পর্কেও। খুনের একটা সুরাহা করবেই বলে আশ্বাসও দেয়। তারপর আবার চলে যায়। কোন সুরাহাই আর হয় না।
মধ্যডাঙ্গা বিল থেকে পুলিশ ময়দান সওদাগরের লাশ নিয়ে চলে যাওয়ার পর বিলের ঠিক ওপারে ময়দান সওদাগরের একটা সার্ট পাওয়া গিয়েছিল। নীল বর্ণ সার্ট। রক্তের ছোপ জমাট বেঁধে শুকিয়ে কালচে হয়ে উঠেছে।
ময়দানের গায়ে কোন জখম নেই। হয়তো যখন তাকে শ্বাসরুদ্ধ করা হয়েছিল, তখন মুখ উগলে রক্ত বুঝিবা বেরিয়ে এসে সার্ট ভিজিয়ে দিয়েছিল।
এই সার্টটা পুলিশের কাছে গোপন রাখে রঙমালা। কি হবে ওদেরকে জানিয়ে? উল্টে হয়তো ময়দান সওদাগরকেই মারকুটে খুনী সাজিয়ে দিতে পারে।
গ্রামে পুলিশের আনাগোনা কমে এলে রঙমালা একটা বাঁশের ডগায় সার্টটা বাঁধে। বাঁশের খুঁটি পুঁতে রাখে ঠিক মাঝ-উঠোনে। পতাকার মতো ওড়ে সার্টটা। তার স্বামীর নিশানা।
রঙমালা বাঁশের গোঁড়ায় বসে ধারালো দা শান দিয়ে দিয়ে আরো ধারালো আরো শাণিত করে তোলে। বিড়বিড় করে বলে: তুমার খুনের বলে বিচার কেউ করবে না। পুলিশ তো নাই-, অরা চেয়ারম্যানের পা-চাটা। এই গাঁওয়ের মানুষও না। তুমারে নাহি ভূত গলা টিইপ্যা মারছে। সেই ভূত ক্যাডা, তারেও আমি চিনি। তার বিচার তো আমারই করোন লাগবো।
চেয়ারম্যান আসে বুড়োকে দেখতে। রঙমালা ঘরে বসেই তাদের বাড়িতে চেয়ারম্যানের আসাটা টের পায়। গাঁয়ের ঘরে ঘরে তখন সন্ধ্যাবাতি কেবল জ্বলে উঠেছে। এসময়ই ভট ভট আওয়াজ। এই আওয়াজ শুনেই রঙমালা বুঝতে পারে। সড়কের ধূলো উড়িয়ে মোটর সাইকেল এসেছে চেয়ারম্যান আর তার চামচাকে বহন করে।
চেয়ারম্যান এসেই বুড়োর ঘরে ঢুকে পড়ে। মমতার হাত রাখে বুড়োর কপালে।
বুড়ো চোখে ঝাপসা দেখে। এমনিতে কানেও কম শোনে। কে তার ঘরে ঢুকল, কে কপালে হাত রাখল- সে বুঝতে পারে না। ভুরু কুঁচকে ওঠে। বলে: ক্যা? ক্যাডা?
চেয়ারম্যান নরম গলায় বলে: ভাইছাব, আমি।
এবার কণ্ঠস্বরে চিনতে পারে বুড়ো। কিন্তু কোন উৎসাহ বোধ করে না। শুধু সামান্য সাড়া দেয়: অ।
চেয়ারম্যান তার সিথানে বসে। বুড়োর হাতটা টেনে নেয় নিজের হাতের মুঠোয়। গলায় দরদ ঢেলে বলে: ভাইছাব, ক্যামুন আছেন?
বুড়ো দীর্ঘশ্বাস ফেলে। জবাব দেয়: ভালা।
চেয়ারম্যান বলে: ভাইছাব কি আমার উপর রাগ করছো?
বুড়ো বলে: আমরা গরীব-গুব্বা মানুষ। আমাগোর কুনোই রাগ করোন নাই।
এ জবাবে অস্বস্তি বোধ করে চেয়ারম্যান। কথার ভঙ্গিতে যেন প্রচ্ছন্ন রাগের প্রকাশ রয়েছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে বুড়োর ঘর দেখে। বলে: দিন চলতাছে ক্যামুন?
বুড়ো বলে: আমি বুডঢা মানুষ। এহোন মরনের আজান শুনি। সোনালক্ষ্মী ব্যাডাবৌ ঘরে আছে বইল্যা রক্ষা। সংসার আর দিনডা তো সেই কাটাইয়া লইয়া যাইতাছে।
চেয়ারম্যানের মুখে সামান্য বিরক্তির আভাস: সতী লক্ষ্মী ব্যাডাবৌ!
বুড়ো বলে: হ। তুমাগোর রাস্তায় মাডি কাটার কামে লাগছে। এই কামে তুমরা যা দেও, তাই দিয়াই দুইজনের পেট চইল্যা যায়।
চেয়ারম্যান বলে: মাইয়া মানুষ! রাস্তার মাটি কাডার কামডা ভালা না। আমি কই কি, এতো কষ্ট করনের কামডা কি? জমিডা আমারে দিয়া দ্যাও, আমি নগদ ট্যাহা দিমু। জমি নেহাপড়া হয়্যা থাকবো। কিন্তুক তুমার জমিন তুমার কাছেই থাকবো। তুমরা এইখানে থাইকাই আমার জমিন পাহারা দিবা।
বুড়া দীর্ঘশ্বাস ফেলেই যেন জবাব দিতে চায়: হ, এমন একডা পেস্তাব অনেক আগেই পাইছিলাম। আপনের মাইজল্যা পুলাও আইসা আমারে বাজান ডাইক্যা এমন একখান কতা কইয়া গেছিল।
চেয়ারম্যান বলে: তখন তো তুমি রাজীই আছিলা।
বুড়ো বলে: হ। কিন্তুক আমার ব্যাডা আজী আছিল না। কইছিল, এইসব মিষ্টি মিষ্টি পেস্তাব আর দরদমাখানি কতার মাঝে বদমতলব আছে।
চেয়ারম্যান হাসে। বলে: মেজাজ গরম। খামুকাই বেশি বেশি বুজে। আল্লায় পুলাডারে বেহিশতে নসিব করুক। তয় এখন তুমি কি কও? আগের মতেই আছো, নাহি মত পাল্টাইয়া ফেলাইছো?
বুড়ো বলে: আমি আর বাঁচমুই কয়দিন? জমি দিয়া আমার কি হইবো? কিইবা হইবো ট্যাহা দিয়া? এই জমিন আমার বাপ-দাদার নিশানা, আমার পুলার নিশানা। এইডা কি আর বেঁচোন যাইবো? না আমার বেচা উচিত কাম হইবো?
এসময়ই রঙমালা বুড়োর ঘরে ঢোকে। চেয়ারম্যান বুড়োর কথার পিঠে কথা বলতে গিয়ে থামে। তাকায় রঙমালার দিকে। ঘরের কুপিটির কাঁপা কাঁপা আলোয় রঙমালার পরিপুষ্ট শরীরটি দেখে। তেল চকচক কালো বর্ণ। এর মধ্যেও সুশ্রী যৌবন কালো গোলাপের মতো ফুটে উঠেছে।
রঙমালা চেয়ারম্যানের নোংরা লোলুপ দৃষ্টি খেয়াল করে। এক চিলতে হাসি খেলে গিয়েই মুছে যায়। বলে: আপনের মাইজল্যা ব্যাডা কই?
জবাব দিতে গিয়ে চেয়ারম্যান কেন জানি থতমত খায়। বলে: ক্যান্? টাউনে আছে। লেখাপড়া করতাছে। তার খবর ক্যান্?
রঙমালা যেন হঠাৎ উদাস। বলে: না, এমনই। তার খুনের পর হুঁশ-জ্ঞান আছিল না আমার। তারপর থাইক্যা দেখতাছি, আপনের মাইজলা তাছির আলি গেরামে নাই। আরে, খুনের আইতেও তো সে বাজানের খুঁজ-খবর লইতে আইছিল। বুজলাম, টাউনে সে নেহাপড়া করতাছে। তো, গাঁয়ে আহে না ক্যান্?
চেয়ারম্যান উঠে দাঁড়ায়। নলে: লেখাপড়ার খুউব চাপ।
বুড়োর দিকে তাকিয়ে বলে: আচ্ছা ভাইছাব, আসি। আমার পস্তাবডা ভাইব্যা দেইখেন। তোমাগোর মঙ্গলের লাইগাই কইলাম।
ঘর থেকে বেরিয়ে এসে উড়ন্ত রক্তাক্ত সার্টের স্ট্যান্ডে থমকে দাঁড়ায় চেয়ারম্যান। চাঁদের আলোয় দেখা যায় সার্টটা উড়ছে।
ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে খিলখিল হাসে রঙমালা। বলে: আমার ভাতারের নিশান। এই জমির উপরই উড়তাছে।
রঙমালা ইউনিয়ন পরিষদ অফিসে ধর্না দিয়েছে। রাস্তায় মাটি কাটার কাজ করে সে। কাজেট বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচীর আওতায়। একটা গ্রুপে তাকে সর্দারনী বানানো হয়েছে। দিনকার কাজ শেষ হলে দিনশেষে বিকালে গম দিয়ে তাদের মজুরি শোধ করা হয়। জনপ্রতি আড়াই কেজি গম। এটা নিয়েই তাদের আপত্তি। তাদের ধারণা, সুপারভাইজার তাদের যথাযথ পাওনা গম ঠিকমতো না দিয়ে কারচুপি করে আরতদারদের কাছে বেচে দিচ্ছে। আড়াই কেজি গমে এতো সস্তায় কি মজুর পাওয়া যায়?
সেদিনকার মতো রাস্তার মাটি কাটার কাজ শেষে সন্ধ্যায় রঙমালা অভিযোগ নিয়ে এসেছে ইউপি অফিসে। চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারি দুজনকেই পাওয়া গেল অফিসে। কিন্তু এখানে নালিশ করে কোন ফায়দা হয় না। আড়াই কেজি গমই নাকি দস্তুর। বিশেষ কেস হিসেবে বিবেচনা করে খায়খাতিরে রঙমালাকে তিন কেজি গম দেয়া যেতে পারে। সে মাটি কাটে, আবার তার গ্রুপের মেয়েদের কাজেরও তদারকি করে- এজন্য। অন্য সবার জন্য ঐ আড়াই কেজি গমই।
এই নিয়েই সেক্রেটারির সাথে বিতন্ডা। চেয়ারম্যান গম্ভীর। বলে: ম্যালা হইছে। আর বাড়াবাড়ি করিস না। এমনিতেই গাঁয়ের মাইনষে তর নামে আমার কাছে ম্যালা নালিশ কইরা যায়। সাইনঝার পর তর ঘর নাহি নরক গুলজার হয়া থাকে।
সেক্রেটারি বলে: রঙমালা, বেশি প্যাঁ বাজাইস না। তরে আমি পাঁচ কেজি কইরা দেওনের ব্যবস্থা করমুনে।
চেয়ারম্যানের মন্তব্যে রঙমালার গায়ে তখন আগুন জ্বলছে। সে চেঁচিয়েই ওঠে: মুইত্যা দেই আপনাগোর গমে। হুইন্যা রাইহেন চেয়ারম্যান সাব, আমার নরকের এক নম্বর ইবলিশ আপনের মাইজলে ব্যাডা।
বলতে বলতে বাইরে বেরিয়ে আসে।
রাস্তায় নেমেই মনস্তাপ হয় রঙমালার। কাজটা বোধহয় ঠিক হলো না। চেয়ারম্যান মানী লোক। তার মুখের উপর অতোগুলো কড়া কথা বলা ঠিক হয় নাই। কীইবা অসুবিধা হতো পাঁচ কেজি গম নিয়ে এলে। আড়াই কেজি গম নিয়ে তো কেউ আর উচ্চবাচ্য করে নাই। ফাঁক তালে তার পাঁচ কেজি গম কামাইটা হয়ে যেত!
সন্ধ্যা ঘন হয়ে নেমেছে। আধো-অন্ধকারে ভাঙ্গা সড়ক ধরে হোঁচট খেতে খেতে হাঁটছে রঙমালা। চেয়ারম্যান তার কথাবার্তায় খুব বেশি কি রেগে গিয়েছে? ইউপি অফিসে ফিরে যাবে নাকি? মাফ চাইবে?- এর সাথে গম পাঁচ কেজিও জুটবে?
সে এখন যাচ্ছে কোথায়? ঘরে?
বিছানায় উপুড় হয়ে আছে বুড়ো শ্বশুর। তার মুরোদ নেই কিছুই। কিন্তু নালিশ সালিশ অভিযোগ আছে বিস্তর। ঐ শনের ঘরে একদিকে গোরস্থান। আরেকদিকে দোযখ। এই নিয়েই তো সংসার রঙমালার।
দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। রঙমালা অভিশাপ দেয় নিজেকে, তার ভাগ্য ও নিয়তিকে।
এসময়ই দুটি ছায়াময় মানুষ তাকে ধাক্কা দিয়ে ছুটে পালায়। রাস্তার একপাশে পড়ে যায় রঙমালা। অস্ফুট আর্তনাদ করে। একনকে চেয়ারম্যানের পুত বলেই মনে হলো। কিন্তু ঐভাবে ছুটছে কেন. তাকে ধাক্কা দেয়াই কি ওদের মতলব ছিল।
এসময়ই অদ্ভুত শব্দটা আসে তার কানে। সামনে রাস্তার ঢাল থেকে আসছে ক্ষীণ ক্ষীণ ঘরঘর আওয়াজ।
সড়ক থেকে উঠে গায়ের ধূলো ঝাড়ে রঙমালা। সামনে এগিয়ে আওয়াজের উৎস সন্ধান করে। আধো আলোয় ঝাপসা দেখতে পায় কেউ পড়ে আছে রাস্তার ঢালে। তড়পাচ্ছে। কালচে তরলে, সম্ভবত রক্তে থকথকে ধূলোমাটি দূর্বাঘাস। চেয়ারম্যানের মেজো ছেলের বন্ধু ও সাথী মাজেদকে চিনতে পারে রঙমালা। চেনার সাথে সাথেই কী যে একধরনের বিবমষায় তার গা রি-রি করে উঠতে থাকে। ভয়ে উত্তেজনায় ঘৃণায় তার সর্বাঙ্গ থরথর কাঁপছে। সে পড়ি-মরি ছুটতে থাকে।
এভাবেই এক দৌড়ে সে এসে পড়ে তার বাড়িতে। উঠোনে রক্তমাখা সার্ট-খচিত পতাকার তলে খুঁটার পাশে শরীর ছেড়ে বসে পড়ে। তখনো তার সর্বাঙ্গ কাঁপছে।
অনেকক্ষণ, কতক্ষণ তার জানা নেই, সে মাটির উপর বসে থাকে। সারা গায়ে তার ধূলো-মাটি। তাকে ভূতের মতোই লাগছে।
তার কানে আসে, ঘরের ভিতর থেকে বুড়ো ক্ষীণ কণ্ঠে ডাকছে: অংমালা! অংমালা। আহ! এতো রাইত হইলো! ভাতারখাগী মাগীডা এহনো বাড়িত ফিরে নাই!

আকাশে মেঘ ছিল। ঝড়ো হাওয়া ছিল।
কিন্তু বৃষ্টি ছিল না গরম আরো ভ্যাস-ভ্যাসে হয়ে নানলো।
রঙমালা গরমে ছটফট করছিল। অস্থির হয়ে পুকুরে নেমেছে গোসল করতে।
তখন বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে।
রঙমালা পুকুরের পানিতে উথাল-পাতাল ঝপঝপাঝপ আওয়াজ তুলে সাঁতার কাটছে হাতপা ছড়িয়ে।
চেয়ারম্যান-সেক্রেটারির রাস্তায় মাটি কাটার কাজ আর সে করে না। ইচ্ছে হলে গৃহস্থ বাড়িতে ধান ভানে। না হলে সারা গাঁও ঘুরে গাল-গপ্পের তুফান ছুটায়।
রঙমালা সাঁতরে গোটা পুকুরটাই চক্কর দিয়ে ঘাটে ফিরে আসে। একটা ডুব দিয়ে পাড়ে উঠতে গিয়েই দেখে গাঁয়ের দিকে আকাশে ধূঁয়া আর আগুনের লেলিহান শিখা।
কেউ একজন-তাকে ঘাট থেকে দেখা যাচ্ছে না- চেঁচিয়ে বলছে: তর সব্বোনাশ! সব জ্বইলা যায়!
ভিজে কাপড়েই রঙমালা ছুটতে থাকে।
তার বাড়ির চারপাশে গোটা গ্রাম ভেঙ্গে পড়েছে। দাউ দাউ জ্বলছে আগুন। উঠানে ছড়ানো ছিটানো কিছু জিনিসপত্র। লোকজন হৈচৈ করছে। ছুটোছুটি করছে। কলস বালতি পাতিল ভর্তি পানি এনে দূর থেকে ছুড়ে মারছে আগুনের দিকে। রঙমালা তাকিয়ে দেখছে তার ধ্বংস। লোকজন নানা কথা নানা মন্তব্য বলছে। কিভাবে আগুন লাগল তা কেউ বলতে পারছে না। কে একজন পাশের একজনকে চুপিসারে বলল: আগুন লাগার আগে চেয়ারম্যানের মাইঝলাডারে এই বাড়ির আশপাশ ঘোরাঘুরি করতে দেখা গিয়েছিল।
রঙমালার কানেও কথাটা যায়। সে দাঁতে দাঁত পিষে। অস্ফুটে বলে: হারামজাদাডা এহন তাইলে গাঁওয়েই!
সে আর কোন কথা বলে না। আগুনের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ তার খেয়াল হয়। চেঁচিয়ে ওঠে: আমার বুইড়্যা? আমার বাপধন কই?
সে আগুনের দিকে তেড়ে যায়। তার বড়ো শ্বশুরের ঘর লক্ষ করে। কয়েকজন তাকে ধরে ফেলে আটকায়।
রঙমালা হা-হা করে কাঁদছে। চিৎকার করছে। তাকে ধরে থাকা লোকগুলোর সাথে ধ্বস্তাধ্বস্তি করছে। হাত-পা ছুড়ছে।
ঘরের ভিতর থেকেই গোঙ্গানিটা শোনা গেল। গ্রামবাসীরা সবিস্ময়ে দেখল, বুড়োর ঘরের আগুন-লাগা কপাট ঠেলে বেরিয়ে এলো এক ভৌতিক মানুষ। সম্পূর্ণ দিগম্বর। সারা গা আগুনে পোড়া। চরকির মতো ঘুরতে ঘুরতে সে উঠোনের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। ঠাস করে পড়ে গেল মাটিতে। তার আর কোন সাড়া-শব্দ নেই।
‘আমার বুইড়্যা গো’ বলে বুক-ফাটা আর্তনাদ তুলে জ্ঞান হারালো রঙমালা।
মাটির উপর পড়েছিল রঙমালা। বেজা গা-গতর শাড়ি-কাপড়ের সাথে কাদামাটির মাখামাখি। জ্ঞান ফিরলে সে উঠে বসে। তার পাশে তখন গাঁয়ের কয়েকজন মহিলা। লোকজন জটলা করছে বুড়োকে ঘিরে। ঐদিকে ঘরের আগুনের তেজ কিছুটা কমে আসছে। গ্রামের ছেলেরাও অনবরত পানি ঢেলেই চলেছে।
রঙমালা এবার খুবই শান্ত। আগের মতো কোন চিৎকার আর্তনাদ হাহাকার নাই। আক্ষেপ নাই। চারপাশে তার চোখজোড়া ঘুরে যাচ্ছে। চোখেও কোন ভাষা নেই।
একসময় রঙমালা উঠে দাঁড়ায়। দুই এক পা করে সামনে এগিয়ে আসে। বুড়ো যেখানে পড়ে আছে, তাকে ঘিরে লোকজনের জটলা, তার থেকে সামান্য দূরেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জিনিসপত্রগুলো। রঙমালা সেখানেই এসে দাঁড়ায়। সেখান থেকে উঠোনে পোঁতা বাঁশের খুঁটার কাছে। দা-টি ওখানেই পড়ে আছে। মাঝে মধ্যে সেটা সে ধার দেয়। রঙমালা কোমর হেলিয়ে মাথা নিচু করে কুড়িয়ে নেয় সেটি।
রঙমালা দা উঁচিয়ে ধরে- কার উদ্দেশে কে জানে! কেউ তার কাছে ঘেঁষার সাহস পায় না।
রঙমালার চোখ ঘুরে যাচ্ছে চারদিক। গভীর আগ্রহে ঘৃণায় ও বিতৃষ্ণায় সে যেন কাউকে খুঁজছে। সে তাকায় তার উপর। বাঁশের ডগায় উড়ছে ময়দান সওদাগরের রক্তমাখা শার্ট।
রঙমালার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে। ক্রুদ্ধ চোখদুটো জ্বলজ্বল জ্বলছে।
আগুন ও অগ্নিদগ্ধ ঘর পেছনে রেখে সামনের দিকে পা বাড়ায়।
…সমাপ্ত…