
একটি দেশের জনসংখ্যা সংকট কোনো আকস্মিক বিস্ফোরণ বা হঠাৎ ঘটে যাওয়া দুর্যোগের মতো আসে না। এটি আসে অত্যন্ত নিস্তব্ধে, অলক্ষ্যে। তবে এর শেষ পরিণতি হয় মারাত্মক—জন্মহারের ধারাবাহিক পতন, বুড়িয়ে যাওয়া সমাজ, শূন্য শ্রেণীকক্ষ, সংকুচিত কর্মবাহিনী আর বিপুলসংখ্যক প্রবীণ মানুষের চাপ, যা সামলানোর ক্ষমতা সমাজের আর থাকে না। বিশ্বের অনেক দেশ যখন এই সংকটের গভীরতা টের পায়, ততক্ষণে তা পুষিয়ে নেওয়ার সময় পার হয়ে গেছে। ইউরোপের বহু দেশ আজ এমন এক ‘জনসংখ্যার ফাঁদ’ বা ‘ব্ল্যাক হোল’-এর মুখোমুখি, যেখানে জন্মহারের পতন একটি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। সেখান থেকে ফিরে আসা যেমন কঠিন, তেমনি ব্যয়বহুল। লিখেছেন সৈয়দ মূসা রেজা
ইরান এখন তার জনসংখ্যার এই রকম একটি বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইরানের সংবাদ মাধ্যম তাসনিম আজ আরো বলেছে, জাতীয় জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে দেশটির শিশু জন্মদানের হার কমে যাওয়ার কারণগুলো খতিয়ে দেখা হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, আগের দশকগুলোর তুলনায় ইরানে এখন বিয়ে ও সন্তান জন্মদানের মধ্যবর্তী সময় বেড়েছে, বিয়ের বয়স পিছিয়েছে এবং প্রজনন হার ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে অর্থাৎ ১.৪-এর নিচে নেমে গেছে। এই ধারা চলতে থাকলে আগামী দুই দশকে ইরানের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শূন্য এবং পরবর্তীতে মাইনাস বা ঋণাত্মক হয়ে যাবে।
দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুব জনসংখ্যা, পরিবার স্বাস্থ্য ও বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রধান রেজা সাইদি এই পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি তাসনিমকে জানান, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে ইরানের জনসংখ্যা বৃদ্ধি শূন্যে পৌঁছাবে। বিগত বছরগুলোতে জন্মহার কমতে কমতে এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার মাত্র শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশে এসে ঠেকেছে। যদি পরিস্থিতির বড় কোনো পরিবর্তন না হয়, তবে ১৪২০ সালের (ইরানি বর্ষপঞ্জি, এখন চলছে ১৪০৫ সাল) দিকে ইরান এক ভয়াবহ জনসংখ্যার কৃষ্ণগহ্বরে প্রবেশ করবে, যার শিকার এখন ইতালি বা পোল্যান্ডের মতো দেশগুলো।
সরকারি পরিসংখ্যানের তথ্য দিয়ে রেজা সাইদি জানান, ১৪০৪ সালে ইরানে যেখানে জন্ম হয়েছে প্রায় ৮ লাখ ৯২ হাজার শিশুর, সেখানে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার। ফলে নিট জনসংখ্যা বেড়েছে মাত্র সাড়ে চার লাখের মতো। অথচ আগের দশকগুলোতে ইরানের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ৩ থেকে ৪ শতাংশের বেশি এবং তারা অঞ্চলের অন্যতম তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনসংখ্যার ভারসাম্য ধরে রাখতে প্রতি নারীর গড় প্রজনন হার (টিএফআর) অন্তত ২.১ হওয়া জরুরি, যাকে প্রতিস্থাপনযোগ্য স্তর বলা হয়। ইরানের ক্ষেত্রে এটি ১.৪-এ নেমে আসায় প্রতি প্রজন্ম তার আগের প্রজন্মের চেয়ে আকারে ছোট হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশ এখন এই প্রবীণ জনমিতির সংকটের সাথে লড়াই করছে। ফ্রান্স বা সুইডেনের মতো কিছু দেশ টেকসই কল্যাণমুখী নীতি ও পারিবারিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিয়ে এই হার ১.৭ বা ১.৮-এ তুলতে পারলেও বেশিরভাগ দেশই ব্যর্থ হয়েছে।
ইরানে এই জন্মহার হ্রাসের পেছনে কাজ করছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক এক জটিল সমীকরণ।
রেজা সাইদি তাসনিমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, প্রথমত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতির কারণে শিশু মৃত্যুর হার কমে যাওয়ায় মানুষ কম সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দ্বিতীয়ত ও সবচেয়ে বড় কারণ হলো সাংস্কৃতিক রূপান্তর। নতুন প্রজন্মের কাছে এখন বিয়ে বা সন্তান নেওয়া আগের মতো সামাজিক কর্তব্য বা নিয়ম হিসেবে গণ্য হচ্ছে না। উপরন্তু, মূল্যস্ফীতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো অর্থনৈতিক সংকট পরিবারগুলোকে সন্তান না নিতে বাধ্য করছে।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিয়ের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া। ইরানে বর্তমানে ২০ বছরের বেশি বয়সী প্রায় ১ কোটি তরুণ-তরুণী অবিবাহিত রয়ে গেছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ১০ লাখ মানুষের বয়স ৪৫ পার হয়ে গেছে এবং তাদের বিয়ে করার সম্ভাবনা এখন একেবারেই ক্ষীণ। ১৪০৩ সালে যেখানে ৪ লাখ ৭০ হাজার বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছিল, পরের বছরই তা কমে ৪ লাখ ৩১ হাজারে নেমে আসে। পাঁচ দশক আগে যেখানে গড় বিয়ের বয়স ছিল ১৮ থেকে ১৯ বছর, আজ তা ২৮ থেকে ৩২ বছরে গিয়ে ঠেকেছে। বিয়ের পর প্রথম সন্তান নেওয়ার সময়কালও ২ বছর থেকে বেড়ে এখন সাড়ে ৪ বছর হয়েছে। এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭০ শতাংশ ইরানি দম্পতি এখন মাত্র একটি বা দুটি সন্তান চান।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৪০০ সালে ইরানে ‘যুব জনসংখ্যা আইন’ পাস করা হয়েছিল, যার অধীনে বিয়ে ও সন্তান জন্মদানের জন্য ঋণ, আবাসন ও গাড়ি দেয়ার মতো নানা প্রণোদনা রাখা হয়। কিন্তু অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে ইরানের সংসদ মজলিশ শুরার জনসংখ্যা উপ কমিটির প্রধান নিজেই স্বীকার করেছেন যে, এই আইনের মাত্র ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। এখনো প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ মানুষ বিয়ের ও আবাসনের ঋণের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। ছাত্র-দম্পতিদের জন্য হোস্টেলের মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও তৈরি করা যায়নি।
ইরানের এই দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়ার সংকট কেবল জন্মহারের সংখ্যাগত পতন নয়, এটি দেশটির সামগ্রিক কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য এক বড় হুমকি। তরুণ জনগোষ্ঠী কমে গেলে উৎপাদনশীলতা, খাদ্য নিরাপত্তা, বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সরাসরি ধাক্কা খায়। ইরানের সামনে সংস্কারের যে সীমিত সুযোগ বা জনমিতির জানালা উন্মুক্ত ছিল, তা দ্রুত বন্ধ হয়ে আসছে। এই সংকটের ছায়া শুধু পরিবারের ওপর নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ওপরও এক দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকার তৈরি করতে যাচ্ছে।