মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির জন্য চারটা প্রস্তাব দিয়েছে চীন। মঙ্গলবার দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বৈঠক করেছেন আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সাথে। এই বৈঠকেই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনার জন্য প্রস্তাবগুলো দিয়েছেন তিনি।
কী কী প্রস্তাব?
এক নাম্বার- শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। অর্থাৎ প্রতিবেশীরা কেউ কারো সাথে মারামারি করবে না। আর এক দেশ অন্য দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হবে না। বরং দেশগুলো মিলে একটা নিরাপত্তা কাঠামো গঠন করবে।
প্রস্তাব নাম্বার দুই- এক দেশ যেন অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে শ্রদ্ধা করে।
তিন নাম্বার প্রস্তাব- আন্তর্জাতিক আইনগুলো যেন সবাই মেনে চলে।
শেষ প্রস্তাব- সব দেশকেই উন্নয়ন এবং নিরাপত্তায় ভারসাম্য রাখতে হবে।
পাঠক, একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন প্রস্তাবগুলো নিয়ে। ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের আরাম-আয়েশে থাকা সরকারগুলো যখন একচেটিয়াভাবে আমেরিকা ও ইসরাইলকে সমর্থন করে যাচ্ছিলো, ঠিক তখনি মধ্যপ্রাচ্য সফরে গিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট। হরমুজ প্রণালীকে নিয়ে আমেরিকার পাগলামী আর ইরান যুদ্ধপরিস্থিতির বাস্তবতায় আমেরিকার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছেন আরব নেতারা। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগাতে চাচ্ছে চীন। পশ্চিমের প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের আস্থায় যখন ফাঁটল ধরেছে, তখনি বাস্তব কিছু কথা নিয়ে হাজির হয়েছেন শি। তাদেরকে বোঝাতে চাচ্ছেন- শুধু শুধু ইরানের সাথে বৈরিতা করে লাভ নেই। বরং তোমরা মিলেমিশে থাকো। আদতে পশ্চিম তোমাদের কারো বন্ধু না।

তাহলে চীন কি মধ্যপ্রাচ্যের বন্ধু?
ভবিষ্যতে বন্ধু থাকে কি না, সেটা নির্ভর করবে ভূ-রাজনীতির খেলার ওপর। তবে এখন তো বেইজিং তেহরানকে সমর্থন করছে। তলে তলে তেহরানকে সহযোগীতাও করে যাচ্ছে। সেইসাথে মধ্যপ্রাচ্যের মোড়লিপনা নেওয়ারও একটা ইচ্ছা চীনের আছে।
মোড়ল হওয়ার এই সুযোগটা চীনকে মূলত তৈরি করে দিয়েছে আমেরিকা। পাগলা ট্রাম্প ইরান নিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। এতে দুর্বল হয়ে উঠেছে আমেরিকার আধিপত্য। আরব শেখরাও দেখছেন, এতোদিন তারা যাদের চামচামি করে আসছেন, তারা এখন তাদেরকে রক্ষা করতে পারছে না। অনেকটাই ভেঙে পড়েছে বৈশ্বিক ব্যবস্থা। সেই ভেঙে পড়া ব্যবস্থার মধ্যেই নতুন স্বপ্নের ফেরি করতে গিয়েছে চীন। শি বলছেন সবার সমান অধিকারের কথা, সম্মিলিত অংশীদারিত্বের কথা।
বর্তমান সংকটে দেখা যাচ্ছে, মার্কিন-ইসরাইল সামরিক তৎপরতা এবং ইরানের পাল্টা ব্যবস্থা গোটা অঞ্চলকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চীনের মতো বড় আমদানিকারক দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। এই অবস্থায় চীন চাইছে এমন একটি আঞ্চলিক কাঠামো যেখানে দেশগুলো একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে অভিন্ন নিরাপত্তার স্বার্থে কাজ করবে। মধ্যপ্রাচ্যের আগামীর রাজনীতিতে চীনের এই কৌশলী অবস্থান তাকে ‘সৎ মধ্যস্থতাকারী’ বা অনেস্ট ব্রোকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি দেখাচ্ছে, চীন জোর দিচ্ছে কূটনৈতিক স্থিতিশীলতায়। দ্বিতীয় প্রস্তাব হিসেবে সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার কথা বলে চীন মূলত মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ উসকে দিয়েছে। পশ্চিমারা বিভিন্ন দেশের সীমানা বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ চেষ্টা চালায়। চীন এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজস্ব সত্তার নিশ্চয়তা দিচ্ছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো এবং ইরানের জন্যও স্বস্তির। সার্বভৌমত্বের এই নীতির আড়ালে চীন আসলে মার্কিন আধিপত্যবাদকে চ্যালেঞ্জ করছে।
শি জিনপিং বলেছেন, আইনের শাসন যখন সুবিধাজনক তখন ব্যবহার করা হবে আর অসুবিধা হলে ফেলে দেওয়া হবে- এমন দ্বিচারিতা চলতে পারে না। এটি সরাসরি ওয়াশিংটনের গালে থাপ্পড় মারার মতো।
চীনের এই অবস্থানের কারণে সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো এখন আর কেবল ওয়াশিংটনের দিকে তাকিয়ে থাকবে না। বেইজিংকে নিরাপত্তার বিকল্প গ্যারান্টার হিসেবে ভাবতে শুরু করতে পারে দেশগুলো।
চীন বারবার ফিলিস্তিনে ইসরাইলি নিপীড়নকে অবৈধ বলে সমালোচনা করে আসছে। এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আইন মূলত পশ্চিমা স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার। চীন সেই একই আইনকে ব্যবহার করে ইসরাইল ও আমেরিকার সামরিক কার্যক্রমের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল করে দিতে চাইছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট- উন্নয়নের সাথে নিরাপত্তার ভারসাম্য রক্ষা করা। চীনের দর্শন হলো—যদি কোনো অঞ্চলে উন্নয়ন না থাকে, তবে সেখানে নিরাপত্তা টেকসই হবে না। দারিদ্র্য আর অস্থিতিশীলতা চরমপন্থা সৃষ্টি করে। এ কারণেই চীন ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই প্রকল্পের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যকে বিশাল অর্থনৈতিক করিডোরে রূপান্তর করতে চাইছে।
আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্সের সাথে আলোচনার মূল কথাই ছিল জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থায় পারস্পরিক বিনিয়োগ। চীন হাইড্রোজেন এনার্জি, নতুন এনার্জি ভেহিকেল এবং ডিজিটাল লাইফ সায়েন্সের মতো ভবিষ্যৎমুখী খাতে বিনিয়োগ করতে চায়। চীনের এই পদক্ষেপের প্রভাব হরমুজ প্রণালীর সংকটের ওপরও পড়বে। চীনের জাহাজগুলো হরমুজে আটকা পড়ায় দেশটির তেল ও গ্যাস আমদানি রেকর্ড পরিমাণে কমে গেছে। এ কারণে তারা কেবল নীরব দর্শক হয়েই থাকতে চাইছে না।
আগামী মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথেও বৈঠক হতে পারে শি জিনপিংয়ের। সেখানেও এই চারটা প্রস্তাব দিতে পারে দেশটি। মোটকথা শান্তি আর ব্যবসার ফেরি করতে নেমেছে চীন। আর ফেরি করতে করতেই মোড়ল হতে চাইছে দেশটি। তারা চায় না জঙ্গলের আইন ফিরে আসুক। আর এই দর্শনে আকৃষ্ট হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। ইতোমধ্যে চীনে বিমান নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করেছে আরব আমিরাত। প্রস্তুতি চলছে ‘চীন-আরব শীর্ষ সম্মেলন’ এর। এসব লক্ষণ বলছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ধীরে ধীরে হোয়াইট হাউস থেকে সরে যাচ্ছে গ্রেট হলের দিকে।
তাছাড়া জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হলে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রভাব আরো বেড়ে যাবে।
চীন মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। এই স্বপ্ন একুশ শতকের ক্ষমতার ভারসাম্যে নিয়ে আসতে পারে ঐতিহাসিক পরিবর্তন। চার দফা প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে মধ্যপ্রাচ্য পরাশক্তিগুলোর খেলার মাঠ হিসেবে থাকবে না, হয়ে উঠবে অর্থনীতির শক্তিশালী অংশীদার।