
ছয় সপ্তাহের অব্যাহত মার্কিন ও ইসরাইল অভিযানে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা এবং সামরিক সক্ষমতা বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। তারপরও প্রায় ৫০ বছরের অভিজ্ঞতায় গড়ে তোলা ইরানের রক্ষণাত্মক ও আক্রমণাত্মক শক্তি এখনো পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি। গত কয়েক দশকে অবরোধের মুখে পড়ে ইরান একদিকে যেমন মান্ধাতা আমলের মার্কিন ও সোভিয়েত প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করেছে, অন্যদিকে তেমনি নিজস্ব উদ্ভাবনী শক্তিতে ড্রোন ও সাইবার যুদ্ধের মতো সস্তা কিন্তু কার্যকর মারণাস্ত্র তৈরি করেছে। এই দুয়ের যোগফলে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব ধরে রেখেছে আজকের ইরান। প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা
বর্তমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরানের এই মিশ্র সামরিক কাঠামো এবং তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামরিক বিবর্তন ও দেশীয় অস্ত্রের উত্থান ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগে ইরানের সামরিক বাহিনী ছিল মূলত মার্কিন প্রযুক্তিনির্ভর। কিন্তু আশির দশকে ইরাকের সাথে দীর্ঘ যুদ্ধের সময় ইরান যখন বিশ্ব থেকে একঘরে হয়ে পড়ে। তারা বাধ্য হয়েই নিজেদের অস্ত্র শিল্প গড়ে তোলে। বর্তমানে ইরানের অধিকাংশ সামরিক সরঞ্জাম পুরনো মার্কিন বা সোভিয়েত অস্ত্রের অনুকরণে তৈরি । কিন্তু ১৯৯০ সালের পর থেকে তারা ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে ব্যাপক উন্নতি করেছে। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার মতো দেশ থেকে প্রযুক্তি এনে তারা নিজস্ব শক্তিশালী মিসাইল সিস্টেম এবং দূরপাল্লার ‘ওয়ান-ওয়ে’ অ্যাটাক ড্রোন তৈরি করেছে। এই ব্যবস্থা অনেক কম খরচে দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হানতে পারে। এই আঘাতে দুশমনের পিলেই কেবল চমকায় না। হৃদযন্ত্র প্রায় থমকে যেতে যেতে এ যাত্রা হয়ত রেহাই পায়।
দুই বাহিনীর সমান্তরাল শক্তি ও ছায়াযুদ্ধ ইরানের সামরিক কাঠামো মূলত দুই ভাগে বিভক্ত- একটি সাধারণ সেনাবাহিনী বা ‘আরতেশ’। আরতেশ দেশের সীমান্ত রক্ষায় কাজ করে। অন্যটি হলো ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি। আইআরজিসি মূলত ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রধান কারিগর। এই আইআরজিসির কুদস ফোর্স লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং গাজার হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে একটি শক্তিশালী প্রক্সি নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও হ্যাকিং এবং সাইবার হামলার মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোর বিদ্যুৎ গ্রিড বা সরকারি নেটওয়ার্কে অস্থিরতা তৈরি করা ইরানের কৌশলের অন্যতম অংশ।
পারমাণবিক লড়াই ও বর্তমান সংঘাত ইরান বরাবরই তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করছে। এরপরও ২০১৫ সালের চুক্তির ভাঙন এবং পরবর্তী কয়েক বছরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে উত্তজনা বেড়েই চলেছে। ২০২৫ সালের জুন মাসে মার্কিন ও ইহুদিবাদী ইসরাইলি বাহিনী বিনা উসকানিতে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের বিমান হামলা চালায়। এই যুদ্ধের নাম দেয়া হয় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। ইরান এর জবাবে শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়লেও তার অধিকাংশ মাঝপথে ধ্বংস করা হয়। বর্তমানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার গতি কিছুটা কমে এলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান এখনো বড় কোনো হামলার জন্য তাদের তুরুপের তাসগুলো জমিয়ে রেখেছে।
সূত্র: কনভারসেশন