
পোপকে ব্যক্তিগত আক্রমণ, নিজেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে যিশু খ্রিস্টের আদলে উপস্থাপন এবং ইরানের পক্ষ থেকে ছড়িয়ে পড়া একটি বিতর্কিত ভিডিও নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে এখন বিধ্বংসী টর্নেডো বইছে। ইরানের সংবাদ মাধ্যম তাসনিম নিউজ এবং আরটি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ধর্মীয় উসকানি ও নিজেকে ঈশ্বরতুল্য প্রমাণের চেষ্টা তার কট্টর সমর্থকগোষ্ঠীর হৃদয়ে বড় ধরনের আঘাত দিয়েছে। প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা
একদিকে পোপ লিও চতুর্দশকে ‘দুর্বল’ বলে আক্রমণ করা, অন্যদিকে ইরানের এআই ভিডিওতে যিশুর হাতে ট্রাম্পের মৃত্যুর দৃশ্য—সব মিলিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রভাবশালী বিশ্লেষক তাক্কার কার্লসন তো সরাসরি দাবি করেছেন যে, ট্রাম্পের আসল ধর্ম খ্রিস্টধর্ম নয় বরং ‘ইসরাইলবাদ’। এই ত্রিমুখী সংকটে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন ঘোর কালিমায় আচ্ছন্ন।
ইরানের ভিডিও এবং পেন্টাগনের স্নায়ুচাপ
ইরানের সংবাদ মাধ্যম তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, সাইবার জগতে ইরানি দূতাবাসগুলোর তৎপরতা মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব বা ওয়ার সেক্রেটারিকে বেশ বিচলিত করে তুলেছে। সম্প্রতি একটি সংবাদ সম্মেলনে প্রতিরক্ষা সচিব হেক্সটকে প্রশ্ন করা হয় যে, ইরানি দূতাবাসগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি একটি ভিডিও প্রচার করছে যেখানে দেখা যাচ্ছে যিশু খ্রিস্ট স্বয়ং ট্রাম্পকে হত্যা করছেন। এই ভিডিওর বিষয়ে পেন্টাগনের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে হেক্সট অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি বিষয়টিকে ‘ঘৃণ্য’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন যে, ইরানি প্রশাসন যা কিছু প্রকাশ করে তার পুরোটাই মিথ্যা এবং প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এই ঘটনা মার্কিন সামরিক প্রশাসনের ভেতরে ইরানের ক্রমবর্ধমান সাইবার সক্ষমতা নিয়ে এক ধরনের স্নায়ুচাপ তৈরি করেছে।
ট্রাম্পের ধর্মীয় দুর্গে ফাটল ও পোপের সঙ্গে সংঘাত
মার্কিন রাজনীতিতে ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল রক্ষণশীল খ্রিস্টান ভোটব্যাংক, কিন্তু সেই দুর্গে এখন ফাটল ধরেছে। পলিটিকো ও তাসনিম নিউজের তথ্য মতে, ক্যাথলিকদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপ লিও ট্রাম্পের ইরান নীতি এবং যুদ্ধংদেহী মনোভাবের সমালোচনা করায় ট্রাম্প তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেছেন। পোপ বলেছিলেন, যারা যুদ্ধ উসকে দেয় ঈশ্বর তাদের প্রার্থনা শোনেন না। এর জবাবে ট্রাম্প পোপকে ‘পররাষ্ট্রনীতির জন্য ভয়াবহ’ বলে অভিহিত করেন। শুধু তাই নয়, ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই দিয়ে তৈরি নিজের একটি ছবি শেয়ার করেন যেখানে তাকে যিশুর মতো অলৌকিক বেশে দেখা যায়। যদিও সমালোচনার মুখে তিনি ছবিটি ডিলিট করে দিয়ে দাবি করেন যে তিনি আসলে রেড ক্রসের সেবকের ভূমিকা বোঝাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এই খোঁড়া যুক্তিতে ধর্মপ্রাণ ভোটাররা শান্ত হননি। সিবিএস নিউজ ও ইউগভের জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন ৩৯ শতাংশে নেমে এসেছে।
ট্রাম্পের ধর্ম ‘ইসরাইলবাদ’
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম আরটি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জনপ্রিয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক তাক্কার কার্লসন ট্রাম্পের এই কর্মকাণ্ডকে ‘ধর্মদ্রোহিতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। কার্লসন সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো সুসংগত ধর্মতত্ত্ব নেই; তার যাবতীয় নীতি আসলে ইসরাইলকে রক্ষা করার এক অন্ধ নাগরিক ধর্মে পরিণত হয়েছে, যাকে তিনি ‘ইসরাইলবাদ’ বলছেন। কার্লসনের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে মূলত ইসরাইলের প্ররোচনায়। এমনকি মার্কিন কংগ্রেসওম্যান মার্জরি টেইলর গ্রিনও ট্রাম্পের এই আচরণকে ‘অ্যান্টিক্রাইস্ট’ বা যিশু-বিরোধী মানসিকতা বলে উল্লেখ করেছেন। মার্কিন প্রশাসনের অন্দরেও এখন এ নিয়ে তীব্র মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ট্রাম্পের পক্ষে সাফাই গাইলেও প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ইরানের বিরুদ্ধে এই লড়াইকে প্রায় ‘ধর্মযুদ্ধে’র রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি আগামী নির্বাচনে ট্রাম্পের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।