উপসাগরীয় দেশগুলোকে বাগে পেয়েছে ইরান, জোড়াতালি চাইছে সৌদি, ফেঁসে গেছেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক রাজনীতি মানেই এখন ‘তেল’। আর তেল মানেই হরমুজ প্রণালী। এই প্রণালীতে ঝামেলার অর্থ তেলের সরবরাহে ভজঘট। আর হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে। পেন্টাগন নয়, হরমুজ প্রণালীই নির্ধারণ করছে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার নিয়মকানুন। এই বাস্তবতা এখন বুঝতে পারছে সৌদি আরব। 

পেন্টাগন নয়, হরমুজ প্রণালীই নির্ধারণ করছে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার নিয়মকানুন। ছবি: এআই

হরমুজ এখনো বন্ধ। বাজার সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে যতটুকু তেল ছাড়া হয়েছিলো, সেটুকুও ফুরিয়ে এসেছে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে দাম। এই বাড়তি দামেও তেমন সমস্যা নেই। সমস্যা হলো এর ধারাবাহিক প্রভাব। পেট্রোল-ডিজেল, জাহাজের ভাড়া ও বিমা, কাঁচামাল এবং শেষমেশ এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়া মূল্যস্ফীতি।

হরমুজ যদি আগামীকাল খুলে দেওয়া হয়, তারপরও এই ক্ষতি সহসা মুছে ফেলা যাবে না। কারণ সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা এক নিমেষেই আগের জায়গায় ফিরতে পারে না। পেট্রোকেমিক্যালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে পেতে অনেকটা সময় দরকার হয়।

এই সত্যটা বুঝতে পারছে সৌদিসহ উপসাগরীয় দেশগুলো। কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাতের বুঝ অন্যরকম। তারা এখনো পশ্চিমের দাস হয়েই আছে। পশ্চিমের মতো করে ইরানকে গুড়িয়ে দিতে চায়। অথবা পরিবর্তন করতে চায় দেশটির শাসনব্যবস্থা।

বিষয়টি নিয়ে মিডলইস্ট মনিটরে লিখেছেন তামির আজরামি। তিনি লিখেন, কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, নিরাপত্তার কঠিন হিসাব-নিকাশ করেই ইরানের সাথে আলোচনায় আগ্রহী সৌদি আরব। 

সৌদির চোখের সামনে পুরনো সমীকরণ ভেঙে পড়ছে। মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো তাদেরকে যেভাবে সুরক্ষা দেবে বলে ভাবা হয়েছিলো, সেটাও হয়নি। এখন রাজনীতির চাইতে বড় বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে বাজার।

তবে ওয়াশিংটন এখনো চাইছে- ইরান আত্মসমর্পন করুক। বাস্তবে আত্মসমর্পণ না করলেও কূটনৈতিক ভাষায় মুড়িয়ে কোনোরকম একটা আত্মসমর্পন হলেও তাদের মান থাকে। কিন্তু ইরান কেন এতে রাজি হবে?

রাজি হওয়ার কথা নয়, এক হরমুজ প্রণালী হাতের মুঠোয় থাকায় এখন তাবড় তাবড় মোড়লদের বাগে পেয়ে গেছে দেশটি। এই সুযোগ হাতছাড়া করার মতো বোকা ইরান নয়।

তাহলে কী দাঁড়ালো, ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেঁসে গেছেন। মুখে আবোলতাবোল বকছেন তিনি। কিন্তু অর্থনীতির নিয়ম-কানুন তো আর পাল্টে দিতে পারছেন না। বাজার একবার বেঁকে বসলে সহজে সমঝোতার দিকে এগিয়ে যায় না, সরাসরি আঘাত করে বসে।

এ কারণেই উপসাগরীয় দেশগুলো এখন হাঁটছে দুইটি উপায় সামনে নিয়ে। নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় যার যার মতো চেষ্টা করে যাচ্ছে তারা। আবার ধেয়ে আসা ধাক্কাগুলো সামলাতে তৈরি করতে চাচ্ছে যৌথ কাঠামো। এই কাঠামো গড়ে তুলতে ঘাম ঝরাচ্ছে সৌদি আরব। 

১৯৭০ এর দশকের মাঝামাঝিতে ঠান্ডা লড়াইয়ের সময় যে হেলসিন্কি চুক্তি হয়েছিলো, এর আদলে একটা চুক্তি করতে চাইছে উপসাগরীয় দেশগুলো। এটি কেবল সৌদি-ইরান দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হবে না, বিস্তৃত হতে পারে ইউরোপ পর্যন্ত। আর এই চুক্তিতে কোনো খাদ থাকুক, সেটা চাইছে না সৌদি। এর জন্য দরকার ওয়াশিংটনের সম্মতি। কারণ সবদেশ মিলে একটা চুক্তিতে গেলে আমেরিকা বা ইসরাইলের এক বোমা এসে চুক্তির দলিল পুড়িয়ে দিলে এর আরঅর্থ থাকে না।

তাহলে ওয়াশিংটনকে কি ম্যানেজ করা যাবে?

আপাতত অনেকগুলো দেশের সাথে মিলে কোনো চুক্তি করে নিজেদের হাত-পা বেঁধে ফেলতে চাইছে না আমেরিকা। আর আমেরিকাকে পাওয়া না গেলে ওয়াশিংটনকে বায়ে রেখেই উপসাগরীয় দেশগুলো এগিয়ে যেতে পারে। তারা বলতে পারে- ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক বা গোয়েন্দা তৎপরতায় নিজেদের আকাশ, স্থল ও জলসীমা ব্যবহার করতে দেবে না তারা। তাছাড়া এই অঞ্চলকে অস্থির করে তুলতে পারে, এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতেও অস্বীকৃতি জানাবে উপসাগরীয় দেশগুলো।

এসব চিন্তায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে উচ্চাকাঙ্খী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত। নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের সুরে কথা বলছেন আল নাহিয়ান। বিকল্প পাইপলাইনের মাধ্যমে ‘হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে যাওয়ার’ সমাধানও খুঁজছিলেন আমিরাত-আমেরিকা পক্ষ । কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলক্ষেত্র, বন্দর এবং জ্বালানি অবকাঠামোর প্রতিটি অংশই ইরানের গোলার আওতায় থাকায় এই পরিকল্পনাও টেকানো যাচ্ছে না।

পুরো পরিস্থিতি জোড়াতালি দিয়ে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে সৌদি আরব। কারণ এই সংকটে মার্কিন ইসরাইলি সেনাবাহিনী দেউলিয়া হওয়ার আগেই বাজারকে দেউলিয়া করে ছাড়তে পারে।

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...