২০২১ সালের ১৪ নভেম্বর। আকাশ ছিলো পরিষ্কার, বাতাসও শান্ত- স্কাইডাইভিংয়ের জন্য একেবারে আদর্শ দিন। আমেরিকার ভার্জিনিয়া বিচের এক নবীন স্কাইডাইভার জর্ডান হ্যাটমেকার। তিনি মাত্র ১৪ বার ডাইভ দিয়েছেন। এখনো লাইসেন্স পাননি। সেদিনও প্রস্তুত ছিলেন আকাশে ঝাঁপ দিতে। ভয় ছিলো, তবে সেই ভয়ই তাকে আকর্ষণ করতো। ঝুঁকির সঙ্গে লড়াই করার এক অদ্ভু টানই তাকে স্কাইডাইভিংয়ে নিয়ে আসে।
সাফোকের একটি হ্যাঙ্গারে পৌঁছে দুপুর দেড়টার দিকে তিনি আরো ১৫ জনের সঙ্গে প্রথম ডাইভ দেন। প্রশিক্ষকের সঙ্গে নিয়ম মেনে নিরাপত্তা যাচাই শেষে ১৩ হাজার ৫০০ ফুট উচ্চতা থেকে ঝাঁপ। ঘণ্টায় প্রায় ১২৫ মাইল বেগে পতনের সেই অভিজ্ঞতা ছিলো রোমাঞ্চকর ও ভয়ঙ্কর।
প্রথম ডাইভ সফলভাবে শেষ হয়। কিন্তু দ্বিতীয়বার ঝাঁপ দেওয়ার সময়ই ঘটে বিপত্তি।
আকাশেই বিপর্যয়
দ্বিতীয় ঝাঁপের সময় প্রায় ৫,৫০০ ফুট উচ্চতায় সহকর্মী থেকে দূরে সরে গিয়ে তিনি প্যারাস্যুট খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু উচ্চতা কমে আসছিলো দ্রুত। নির্ধারিত ৪,০০০ ফুটে প্যারাস্যুট খোলার বদলে তাড়াহুড়ো করে সেটি খুলতে গিয়ে তিনি ভুল করেন।
ফলাফল- পাইলট প্যারাস্যুটটি বাতাসে ভেসে যায়। খুলে না গিয়ে তার ডান পায়ে জড়িয়ে যায়। প্রধান প্যারাস্যুটটি ব্যাগেই থেকে যায়। কয়েক সেকেন্ডের চেষ্টায়ও নিজেকে মুক্ত করতে পারেননি তিনি।
নিচের মাটি তখন দ্রুত এগিয়ে আসছে।
পতন ও উদ্ধার
নিজেকে শক্ত করে সম্ভাব্য আঘাতের জন্য প্রস্তুত করেন তিনি। ঠিক তখনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিজার্ভ প্যারাস্যুট খুলে যায়। কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়ে তিনি ঘাসের ওপর নামার চেষ্টা করেন।
কিন্তু নতুন বিপত্তি ঘটে- প্রধান প্যারাস্যুটও হঠাৎ খুলে যায়। দুটি প্যারাস্যুট বিপরীত দিকে টানতে শুরু করলে তার পতনের গতি আরো বেড়ে যায়।
অবশেষে মাটিতে আছড়ে পড়েন তিনি। তীব্র যন্ত্রণায় বুঝতে পারেন, কোমরের নিচের দিকের শরীর নড়াচড়া করতে পারছেন না। সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে থাকেন। প্রার্থনা করেন।
কয়েক মিনিটের মধ্যে সহকর্মীরা ছুটে এলেও ঝুঁকির কারণে তাকে নাড়ানো যায়নি। প্রায় আধা ঘণ্টা পর প্যারামেডিক দল এসে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
লড়াই করে ফিরে আসা
দুর্ঘটনায় তার গোড়ালি চূর্ণ, পায়ের হাড় ভাঙা এবং মেরুদণ্ডে আঘাত লেগে জটিল অবস্থা তৈরি হয়। চিকিৎসকরা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তিনি আবার হাঁটতে পারবেন কি না।
কিন্তু দৃঢ় মনোবল হারাননি তিনি। দুর্ঘটনার মাত্র তিন মাস পর, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবারের মতো আবার হাঁটেন। দীর্ঘ পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেন।
এরও বেশি বিস্ময়কর হলো- দুর্ঘটনার এক বছরের মাথায় তিনি মাউন্ট এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছান।
আরো অবাক করা বিষয়, তিনি আবার স্কাইডাইভিং করার পরিকল্পনাও করছেন- যদিও বিষয়টি এখনো তার বাবা-মাকে জানাননি।
এই গল্পটি মনে করিয়ে দেয়, কখনো কখনো সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতেও মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও সাহস তাকে বাঁচিয়ে রাখে।