
আনন্দে টইটম্বুর এক মাঠ। এক মাস রোজা রাখার পর সমবেত হন মুসল্লিরা। এখানে কয়েক লাখ মুসল্লি একসঙ্গে আদায় করেন ঈদের নামাজ। এদের কেউ স্থানীয়, কেউ আসেন দূর থেকে।
মাঠের নাম ‘শোলাকিয়া’, উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদগাহ। ঈদের সময় সারা দেশ থেকে মুসল্লিরা আসেন নামাজ পড়তে।
শোলাকিয়া ঈদগাহ কিশোরগঞ্জ শহরে। ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই অতিথিদের সমাগমে সরগরম হয় শহরের হোটেল। স্থানীয়দের বাড়িতে আসেন দূরের আত্মীয়রা।
শহরের মোড়ে মোড়ে তৈরি হয় তোরণ। মাঠের পাশে বসে পণ্যের মেলা।
একটা সময় দূর থেকে আসা অনেক মুসল্লি থাকতেন মাঠের মিম্বরের নিচে। দু’তলা এই মিম্বরে ঈদের নামাজ ছাড়াও দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হয়।
কিন্তু হাল আমলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কড়াকড়িতে ওখানে থাকার সুযোগ নেই। মাঠের গোড়ার দিকে, দূর থেকে আসা মুসল্লিদের জন্য তৈরি করা হয়েছিলো একটি মুসাফিরখানা। শোলাকিয়া মাঠ শহরের পূবদিকে। আর মুসাফিরখানাটি পশ্চিমে, হয়বতনগর জমিদারবাড়িতে। এখন মুসাফিরখানা নেই।
শোলাকিয়া ঈদগাহের বয়স প্রায় দুইশ বছর। তবে হয়বতনগর জমিদারবাড়ির নথির ভিত্তিতে এর বয়স আড়াইশো বছরেরও বেশি।
তখন এলাকাটির নাম ছিলো রাজবাড়িয়া। এর বুক কেটে বয়ে যেতো নরসুন্দা নদী। ওই নদীতে ছিলো একটি ঘাট। ঘাটের পাশে বসতো হাট। আর ওই হাটের নাম ছিলো ইচ্ছাগঞ্জ।
তখন বার ভূঁইয়ার একজন ইশা খাঁর একটি দুর্গ ছিলো কিশোরগঞ্জ থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে জঙ্গলবাড়িতে। তাঁর সময় ইয়েমেন থেকে রাজবাড়িয়ায় আসেন সৈয়দ আহাম্মাদ নামের এক সাধক। ১৮২৮ সালে তিনি এই মাঠের জন্য জমি দান করেন। ধারণা করা হয় ওই বছরই শোলাকিয়ায় প্রথম ঈদের জামাত হয়। তবে অন্য একটি হিসাব বলছে ঈদগাহের শুরুটা হয়েছে ১৭৫০ সালে। তখন দুই ঈদে দুইটি জামাত হয়েছিলো।
মূলত সাধক সৈয়দ আহাম্মাদ ও হয়বতনগরের জমিদার মান্নান দাদ খানের দান করা জমিতেই বর্তমান শোলাকিয়া ঈদগাহ গড়ে উঠেছে।
মাঠের সীমানাপ্রাচীরের ভেতরের আয়তন ছয় দশমিক ছয় এক একর। আর প্রাচীরের বাইরে ওজুখানা, পুকুর ও টয়লেটের স্থান মিলিয়ে সাত একর। মাঠে সারি আছে ২৬৫টি। প্রতি সারিতে লোক দাঁড়াতে পারেন ৫০০ জন। সে হিসাবে মাঠের ভেতরে মুসল্লির সংখ্যা হয় সোয়া লাখের কিছু বেশি।
কিন্তু প্রায় প্রতিবছরই মাঠ উপচে লোক হয়। ভেতরে যত লোক, বাইরেও তত। অনেকে সড়কে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েন। মরা নদী নরসুন্দার ওপারেও কাতার দাঁড়ায়। আশপাশের বাড়ির উঠোন, ছাদ হয়ে যায় জামাতের অংশ।
সব মিলিয়ে শোলাকিয়া ঈদগাহে লোকের সমাগম হয় তিন লাখের কাছাকাছি।
ধারণা করা হয়, প্রথম জামাতে সোয়া লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিলো। এ কারণে মাঠের নাম হয় ‘সোয়ালাখিয়া’। পরে বিকৃত হয়ে ‘শোলাকিয়া’। আরো একটি মত বলছে, এই মাঠে যেন একটা সময় সোয়া লাখ লোক হয়, প্রথম জামাতে এমন দোয়া করা হয়েছিলো।
যখন শব্দযন্ত্র ছিলো না, তখন বিশাল এই সমাগম কিভাবে সামলানো হতো!
জামাত শুরু হওয়ার আগে কামান দেগে মুসল্লিদের সতর্ক করা হতো। জমিদাররা চালু করেছিলেন কামানের গোলা ছুঁড়ার রেওয়াজ।
নামাজ শুরু হওয়ার পাঁচ মিনিট আগে তিনটি গোলা ছুঁড়া হতো। তিন মিনিট আগে দুইটি। এবং এক মিনিট আগে একটি। শেষ গোলার আওয়াজ শুনেই মুসল্লিরা কাতার সোজা করে দাঁড়াতেন।
সেই রেওয়াজ এখনো ধরে রাখা হয়েছে। তবে এখন কামান নয়, শর্টগান দিয়ে আকাশে ফাঁকা গুলি করা হয়।
গুলির শব্দ যখন বাতাসে ছড়ায়, মুসল্লিদের ভেতর খেলে যায় খুশির ঢেউ।
হ্যাঁ, এতোদিন শোলাকিয়া ঈদগাহে গুলি মানে ছিলো আনন্দ। কিন্তু ২০১৬ সালটা ছিলো ভয়ঙ্কর। ওই বছর ৭ জুলাই ছিলো ঈদুল ফিতর।
একদিকে মাঠে নামাজ শুরু হয়েছে, অন্যদিকে একটু দূরেই চলছে গুলি। ওই গুলির শব্দ কাঁপিয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে।
২০১৬ সালের জঙ্গি হামলায় ঝর্না রানী ভৌমিক নামের এক নারীর মৃত্যু হয়। মারা যান দুই পুলিশ কনস্টেবল আনছারুল হক ও জহিরুল ইসলাম। মৃত্যু হয় আবির হোসেন নামের একজনের ।
শোলাকিয়া অ্যাটাকের পর প্রতি বছরই নিহতদের স্মরণ করা হয়। থাকে পুলিশের বিশেষ কর্মসূচি।
আর ঈদ এলে শোলাকিয়া ঈদগাহে থাকে কড়া নিরাপত্তা। ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই সারা শহরে চলে গোয়েন্দা নজরদারি। নিরাপত্তায় থাকে বিপুল র্যাপ, বিজিবি এবং পুলিশ। কয়েক দফায় তল্লাশি হয় মুসল্লিদের শরীর।
ইনফোজা প্রতিবেদন