জ্বালানি সংকট: ইউরোপের আকাশ কি অচল হয়ে যাবে?

‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ করে, নলখাগড়ার প্রাণ মরে’—বহু পুরনো এই বাংলা প্রবাদটি আজ এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নিষ্ঠুর বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছে। কোনো উসকানি ছাড়াই আমেরিকা ও ইসরাইল তাদের সর্বশক্তি নিয়ে ইরানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পর যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা হয়, তার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে এখন সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে মহাবিপদে পড়েছে ইউরোপের যাত্রীবাহী বিমান বহর। যুদ্ধের উত্তাপ আর রণদামামার মাঝে এখন প্রশ্ন উঠেছে, জেট ফুয়েল বা বিমান জ্বালানির তীব্র সংকটে ইউরোপের আকাশ কি তবে অচল হয়ে যাবে? প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা

রাজায় রাজায় যুদ্ধ করে, নলখাগড়ার প্রাণ মরে

আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ও আমেরিকা-ইসরাইল যুদ্ধের প্রভাবে গত সাত সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ প্রায় স্থবির হয়ে ছিল। শত শত ফ্লাইট বাতিল আর রুট পরিবর্তনের ধকল কাটিয়ে যখন আকাশপথ কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে, তখনই নতুন এক বিপদ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আর সেটি হলো বিমানের জ্বালানি বা জেট ফুয়েলের ভয়াবহ ঘাটতি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-এর প্রধান ফাতিহ বিরল উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ইউরোপের হাতে বড়জোর আর মাত্র ছয় সপ্তাহের জেট ফুয়েল মজুদ আছে। যদি দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়, তবে খুব শীঘ্রই ইউরোপের এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ার ফ্লাইটগুলো একের পর এক বাতিল হতে শুরু করবে।
এই সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী। যুদ্ধের কারণে বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ পানিপথটি অবরুদ্ধ হয়ে আছে। বিশ্ববাজারের মোট তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের শুরুতে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ৬৬ ডলার থেকে একলাফে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাজ্যসহ ৪০টি দেশ এই প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার চেষ্টা করছে, যদিও সেখানে আমেরিকার কোনো অংশগ্রহণ নেই। ইউরোপের জন্য এই সংকট আরো বেশি ভয়াবহ কারণ তাদের ব্যবহৃত জেট ফুয়েলের ৭৫ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
বর্তমানে ইউরোপের পর্যটন মৌসুম শুরু হওয়ার কথা। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৭৪ কোটি ৭০ লাখ পর্যটক এই সময়ে ইউরোপ ভ্রমণ করেন। কিন্তু জেট ফুয়েলের অভাবে এই বিশাল শিল্প এখন হুমকির মুখে। জেট ফুয়েল মূলত কেরোসিন ভিত্তিক এক বিশেষ জ্বালানি, যা চীন, মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকার শোধনাগারগুলোতে তৈরি হয়। গত ১৮ মার্চ ইউরোপে প্রতি টন জেট ফুয়েলের দাম রেকর্ড ১৮০০ ডলারে পৌঁছেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে জার্মান এয়ারলাইন্স লুফথানসা ইতোমধ্যেই তাদের আঞ্চলিক ইউনিট ‘সিটি লাইন’ বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। কোম্পানিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জ্বালানির অস্বাভাবিক দাম আর সরবরাহের অনিশ্চয়তায় তারা আর লোকসান গুণতে রাজি নয়। সরবরাহকারীরা এখন এক মাসের বেশি সময়ের জন্য কোনো জ্বালানির নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ কেবল দুটি ভূখণ্ডের লড়াই হয়ে থাকেনি, বরং জ্বালানি সংকটকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে এটি বিশ্ব অর্থনীতি ও মানুষের স্বাভাবিক চলাচলকে বন্দি করে ফেলেছে। যদি দ্রুত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ শুরু না হয়, তবে বাংলা প্রবাদের সেই ‘নলখাগড়া’র মতোই সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি আর বিশ্ব পর্যটন শিল্পের বিপর্যয় ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

Leave a reply

    Join Us
    • Facebook
    • Youtube
    Deal Of The Month
      Categories

      Advertisement

      Loading Next Post...
      Follow
      Search Trending
      Popular Now
      Loading

      Signing-in 3 seconds...

      Signing-up 3 seconds...