লিওনেল মেসি, সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাকে। রাজনীতি নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই তার। কিন্তু মাঝেমধ্যেই রাজনীতির সংবাদের শিরোনামে চলে আসেন তিনি। অভিযোগ তোলা হয়- ইসরাইলে ইহুদিদের বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে অনুদান দেন মেসি।
এই অভিযোগ কতোটা সত্য? চলুন ঘুরে আসা যাক খোদ ইসরাইলের একটি সূত্র থেকে-
ইসরাইলের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইল। গত ১১ জুলাই সংবাদমাধ্যমটিতে প্রকাশ করা হয় ইহুদি ও ইসরাইলিদের সঙ্গে লিওনেল মেসির রসায়ন। তেলআবিব থেকে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন জুয়ান মেলামেদ

টাইমস অব ইসরাইলে তুলে ধরা হয়েছে ২০১৩ সালের এক ঘটনা। তখন ইসরাইলে আয়োজন হচ্ছে ইহুদি অলিম্পিক ‘মাকাবিয়া’। এতে অংশ নিতে আর্জেন্টিনা থেকে রওয়না দিয়েছে ‘মাকাবিয়াহ আর্জেন্টিনা দল’। এর ঠিক আগে আগে আর্জেন্টাইন ইহুদি ওই দলটিকে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছিলেন লিওনেল মেসি।
প্রতি চার বছর পর পর ইসরাইলে মাকাবিয়ার আয়োজন হয়। এতে অংশ নেয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ইহুদি দলগুলো। অর্থাৎ ইসরাইলের বাইরে অন্য যেকোনো দেশ থেকে আসা কেবল ইহুদিরাই এই অলিম্পিকে অংশ নিতে পারে। তবে আয়োজক দেশ হিসেবে ইসরাইলের যেকোনো নাগরিক অর্থাৎ মুসলমান অথবা খৃস্টানরাও অংশ নিতে পারে। প্রাচীন ইহুদি ইতিহাসের যোদ্ধা ও নেতা জুডাস মাকাবির নামে এই প্রতিযোগিতার নাম রাখা হয়।
নিজের দেশের ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতি সমর্থন জানানো এটিই প্রথম ছিলো না মেসির। ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস শহরে আর্জেন্টাইন ইসরাইলি মিউচুয়াল অ্যাসোসিয়েশন বা এএমআইএ ভবনে বোমা হামলা হয়। এতে মৃত্যু হয় ৮৫ জনের। নিহতদের স্মরণে একটি প্রচারে অংশ নিয়েছিলেন লিওনেল মেসি।
এর একমাস পর বার্সেলোনা এফসির সঙ্গে একটি ‘শান্তি সফরে’ ইসরাইল যান তিনি। সেখানে ইহুদিদের পবিত্র প্রার্থনার যায়গা ওয়েস্টার্ন ওয়াল পরিদর্শন করেন। ওয়াস্টার্ন ওয়ালের সামনে ইহুদিদের মতো কিপ্পাহ টুপি মাথায় মেসির ছবিও জুড়ে দেওয়া হয় টাইমস অব ইসরাইলের এই প্রতিবেদনে।
স্পেনিশ ক্লাব বার্সেলোনাতেই ক্যারিয়ারের বেশি সময় কাটিয়েছেন মেসি। ওই সফরের সময় ক্লাবটি ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনি শিশুদের জন্য ফুটবল প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের আয়োজন করে। এছাড়াও জেরুজালেমের মেয়র নির বারকাত, প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজ এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে দেখা করেন মেসি।
২০১৪ সালে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তি প্রচারের উদ্দেশে একটি শান্তি ম্যাচের আয়োজন করেছিলেন পোপ ফ্রান্সিস। রোমে আয়োজিত ওই ম্যাচে খেলার কথা ছিলো লিওনেল মেসির। তবে এর আগে চোট পাওয়ায় খেলতে পারেননি তিনি। শান্তি ম্যাচে খেলেছিলেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনা এবং ইসরাইলি খেলোয়াড় ইয়োসি বেনায়ুনসহ ব্রাজিল, রাশিয়া, ক্যামেরুন, ইতালি ও ফ্রান্স এর তারকারা।
বলে রাখা ভালো, ওই ম্যাচটি একচেটিয়া ইসরাইলের পক্ষে ছিলো না। ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশে এর আয়োজন করা হয়।
২০১৬ সালে মিশরের একটি দাতব্য সংস্থায় নিজের খেলার বুট দান করেছিলেন মেসি। পরে মিশরের কর্মকর্তাদের তোপের মুখে পড়তে হয় তাকে। সেখানে মেসিকে “ইহুদি” এবং “জায়নিস্ট” বলে উল্লেখ করা হয়। মিশরের ফুটবল ফেডারেশনের তখনকার মুখপাত্র আজমি মোজাহেদ একটি লাইভ শোতে ফোন করে মেসির সমালোচনা করে বলেন, “আমি জানি সে একজন ইহুদি, সে ইসরাইলে অনুদান দিয়েছে, ওয়েস্টর্ন ওয়ালে গিয়েছে। তার দেওয়া জুতার দরকার নেই আমাদের।’
২০১৮ সালের জুন মাসে ‘বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাঙ্কশনস’ আন্দোলনে চাপের মুখে ইসরাইলের সঙ্গে একটি প্রীতি ম্যাচ বাতিল করে আর্জেন্টিনা ফুটবল দল। ‘
এর দুই মাস পর, মেসিকে হুমকি দেওয়া হয়েছে, এই অজুহাত দেখিয়ে ফিলিস্তিনি ফুটবল সংস্থার প্রধানকে বরখাস্ত করে ফিফা। এর আগে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা জিবরিল রাজৌব ইসরাইলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন ফিফাকে। বাতিল হওয়া প্রীতি ম্যাচটিতে মেসি বা আর্জেন্টিনা দল অংশ নিলে সমর্থকদের কাছে মেসির ছবি ও জার্সি পুড়িয়ে ফেলার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।
আগের বছর ম্যাচ বাতিল হওয়ায় ২০১৯ সালের নভেম্বরে তেল আবিবে উরুগুয়ের বিরুদ্ধে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলার ঘোষণা দেয় আর্জেন্টিনা জাতীয় দল। এতে বিক্ষোভকারীরা মেবার্সেলোনায় আর্জেন্টিনার অনুশীলন ক্যাম্পের বাইরে বিক্ষোভ দেখায়।সিকে এই ম্যাচে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানায়। তবে সব বিরোধিতা উপেক্ষা করে ম্যাচটি পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়। ব্লুমফিল্ড স্টেডিয়ামে উনত্রিশ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে একটি গোল করেন মেসি। দর্শকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইসরাইলের তখনকার প্রেসিডেন্ট রেউভেন রিভলিন।
পরে ২০২২ সালে প্যারিস সেইন্ট জার্মেইর হয়ে মেসি আরো দুইবার ইসরাইল সফর করেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের দুটি ম্যাচে মাকাবি হাইফাকে পরাজিত করেন।
২০২০ সালে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ডিভাইস প্রস্তুতকারী ইসরাইলি প্রতিষ্ঠান ‘অরক্যাম’-এর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে তিন বছরের চুক্তি সই করেন মেসি। এর আগে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তেল আবিবভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘সিরিন ল্যাবস’ তাকে গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নিযুক্ত করেছিল।
বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার ৩-০ ব্যবধানের জয়ে মেসি হ্যাটট্রিক করেন। পরে আলজেরিয়ার ব্রডকাস্টার মুস্তফা মাজৌজি পেনাল্টির সিদ্ধান্ত না দেওয়ার পেছনে “ইহুদি লবি”কে দায়ী করেন। পেনাল্টি হলে সিদ্ধান্ত মেসির বিরুদ্ধে যেতে পারতো বলে মন্তব্য করেন তিনি। মাজৌজি বলেন, “মেসিকে ইহুদি লবি রক্ষা করছে। এই লবি পুরো বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে, তারা মাফিয়ার মতো যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে বিশ্ব চালায়।
তিনি বলেন, “পশ্চিম সাহারা এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান আছে, তাই তারা চায় না আমরা ভালো কিছু করি।”
ফিলিস্তিনের এক টিকটক কনন্টেন্ট ক্রিয়েটর দাবি করেন, ইসরাইলের সঙ্গে মেসির সম্পর্ক থাকায় বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হেরে যাওয়া উচিত।” টিকটকে ওই ক্রিয়েটরের সাড়ে তিন লাখ ফলোয়ার আছে।
২০২০ সালে মেসির নামের সাথেও হিব্রু একটি শব্দের মিল খুঁজে বের করে ওয়ার্ল্ড জায়নিস্ট অর্গানাইজেশন। সংস্থাটি ব্যাখ্যা দিয়েছে, হিব্রু শব্দ “মেসিবাহ” অর্থ “পার্টি”। একে স্প্যানিশ ভাষায় বলা হয় “ফিয়েস্তা”। স্প্যানিশ উচ্চারণে একে অনেকটা “মেসি ভা”-এর মতো শোনায়। এই ‘মেসি ভা’ শব্দের অর্থ হচ্ছে “মেসি যাচ্ছে”। আরো সহজভাবে বলা যায় মেসি যদি যেতে থাকে, তাহলে সেটাই একটা পার্টি।
মেসির নামের অর্থ যাই হোক, ইনফোজা দর্শকদের মূল প্রশ্ন হলো- তিনি কি ইসরাইলের বন্ধু?
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইলে প্রকাশ হওয়া এই তথ্যগুলো জানার পর আপনার কী মনে হচ্ছে?
কমেন্টে নিজেদের মতামত জানাতে পারেন।
তবে টাইমস অব ইসরাইলের ওই প্রতিবেদনের শিরোনামেই সরাসরি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে- লিওনেল মেসি কিন্তু ইহুদি অথবা জায়নিস্ট নন। তিনি একজন ক্যাথলিক খৃস্টান।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, খেলার মাঠে গোল করার পর আকাশের দিকে তাকিয়ে উদযাপন করেন মেসি। তিনি মনে করেন, তার নানু সেলিয়া আকাশ থেকে তার খেলা দেখছেন। মেসি যখন ছোট ছিলেন, তখন এই নানুই তাকে অনুশীলন করতে মাঠে নিয়ে যেতেন। তার বয়স যখন ১১, তখন নানু সেলিয়ার মৃত্যু হয়।