বিপ্লবের পর যেভাবে দেশ গুছিয়েছিলো ইরান, সংস্কার করেছিলো সামরিক বাহিনী

ইতিহাস1 week ago22 Views

জানুয়ারি ১৯৭৮। ইরানের নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনিকে অপমান করে দেশটির জাতীয় পত্রিকায় আর্টিকেল ছাপা হয়। এতে সাধারণ জনগণ ক্ষেপে যায়। তাদের ধর্মীয় নেতার নৈতিকতার ওপর এমন অপমান তারা মেনে নেয়নি। দেশজুড়ে শুরু হয় অস্থিরতা। হাজার হাজার ছাত্র, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী সম্প্রদায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে রাস্তায় নামে।

এরপর অনেক দূর এগিয়ে যায় ইরান। ছবিটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি

সেসময় সেনাবাহিনী দিয়ে প্রতিবাদ দমন করার চেষ্টা করেন ইরানের শাহ। নিহত হয় অনেক শিক্ষার্থী। জনতা জড়িয়ে পড়ে আন্দোলনে। আক্রমণ হয় শাহ এর বিভিন্ন ব্যক্তিগত সম্পত্তি, হোটেল, বার, সিনেমা হলে। ইরানের শাহ সেই বছর সরকারি কর্মচারীদের বেতন কমিয়ে দেন এবং বড় বড় প্রজেক্ট বন্ধ করে দেন। দেখা দেয় খাদ্য ঘাটতি, বাড়ে বেকারত্ব। চাকরির খোঁজে তেহরানে আসা মানুষ জড়িয়ে পড়ে শাহবিরোধী আন্দোলনে। এবারও চলে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন। হত্যা করা হয় বহু মানুষকে।

ডিসেম্বরের শেষে বিশ লাখের বেশি মানুষ জড়ো হয় তেহরানে। এবার সেনাবাহিনী যোগ দেয় জনগণের পক্ষে। শাহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন। কিন্তু প্যারিস থেকে তা প্রত্যাখ্যান করেন খোমেনি। ডাক দেন ইসলামী বিপ্লবের। ১৯৭৯ সালে শাহ চিকিৎসার জন্য দেশ ছেড়ে যান। ইরানের দরজা তার জন্য একেবারে বন্ধ হয়ে যায় তখনি। এর মধ্যেই প্যারিস থেকে ফিরে আসেন নির্বাসিত ধর্মীয় নেতা আয়তুল্লা খোমেনি।

ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখ, অবসান ঘটে পাহলভী বংশের। সেনাবাহিনী চলে যায় নিরপেক্ষ অবস্থানে। প্রতিষ্ঠা হয় ইসলামিক শাসনব্যবস্থা। ফরাসি বিপ্লব এবং বলশেভিক বিপ্লবের পর এটি ছিল তৃতীয় বৃহত্তম বিপ্লব।

এই বিপ্লবের পটভূমি কী?

সেটার জবাব পাওয়া যায় আল জাজিরার এক প্রতিবেদন থেকে। ‘ইরান-নাইনটিন সিক্সটিনাইন অ্যানাটমি অব রেভুলেশন’ শিরোনামে ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে বেশ কিছু বিষয়-

১৯২৫ কাজার শাসন শেষ হয়। সে সময়ে সেনাবাহিনীর কর্নেল রেজা খান জনগণের পক্ষে অংশ নিয়ে অভ্যুত্থান ঘটান নতুন শাসনের। তিনি কাজার বংশের শেষ শাসক আহমেদ শাহকে পদচ্যুত করেন। নিজে হয়ে বসেন ইরানের শাহ। নাম নেন রেজা শাহ পাহলভী। এভাবেই উত্থান ঘটে ইরানের পাহলভী বংশের।

বৃটিশদের দয়ায় ক্ষমতায় এসে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেন স্বৈরশাসক। তিনি ইরানি জনগণের নেতা না হয়ে বিদেশি শক্তির পুতুলে পরিণত হয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রেজা শাহ জার্মানিকে সমর্থন করলে বৃটিশ ও সোভিয়েত বাহিনী মিলে রেজা শাহে&ক পদচ্যুত করেন। ক্ষমতায় বাসায় শাহপুত্র মোহাম্মদ রেজা শাহকে| ইরানিয়ান বিপ্লবের মাধ্যমে উলামা গোষ্ঠী ক্ষমতায় এলে মোহাম্মদ রেজা শাহ এর পতন ঘটে।

ইরানের শাহ পরিবার ছিল আমেরিকার পোষা শাসক। ১৯৫২ সালে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ড. মোসাদ্দেক সরকারকে ভেঙে দিতে চাইলে বিক্ষোভ শুরু হয়। শাহ পালিয়ে যান এবং মোসাদ্দেক সরকার তেল শিল্প জাতীয় করেন। যা পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা সিআইয়ের সহযোগিতায় দেশটিতে একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়| পতন ঘটে মোসাদ্দেক সরকারের| শাহ ফিরে আসেন পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে। সামরিক অভ্যুত্থানের পর শাহ& শুরু করেন ‘হোয়াইট রেভুলেশন’ বা ‘শ্বেত বিপ্লব’। এ ধরনের সংস্কারের ফলে দেশটির সংস্কৃতিতে পশ্চিমা সংস্কৃতি মিশ্রন ঘটে| এছাড়া এই সংস্কারের সুবিধা পাচ্ছিল শুধুমাত্র মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণি। কিন্তু তারাও আবার পর্যাপ্ত চাকরির অভাবে বেকার থাকায় একসময় শাহের বিরুদ্ধে চলে যায়।

শাহ এর আধুনিকায়নের ফলে ইরানে শুধুই বিদেশি কোম্পানিলোর লাভ হচ্ছিল। দেশীয় কোম্পানিগুলো দেখছিল লাল বাতি। এর ফলে গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্য বেড়ে যায়।

ইরানের বড়সংখ্যক মানুষ থাকে গ্রামে। আধুনিকায়নের ফলে একটি বিশাল অংশকে জীবিকার আশায় চলে অসতে হয় শহরে।| ইরানের সবচেয়ে বড় রাজস্বের আয় আসে তেল থেকে। কিন্তু এই রাজস্বের যথাযথ ব্যবহার রেজা শাহ করতে পারেননি। ১৯৭৬ সালে তিনি ইসলামিক ক্যালেন্ডার পরিবর্তন করে খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডার গ্রহণ করলে ইরানের শিয়া জনগোষ্ঠী তা একদমই ভালোভাবে নেয়নি। এছাড়াও স্বৈরাচারীরর বিরুদ্ধে কথা বললে নেমে আসত অভিশাপ। ঠিক একই কারণে আয়তুল্লাহ খোমেইনিকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেন। শাহ ইরানে ইসলামী সংস্কৃতি দূষণ এবং উলামা শ্রেণির বিরোধিতা করে জনগণের অসন্তোষ ছাড়া আর কিছুই অর্জন করতে পারেননি। এই সবগুলো কারণ মিলিয়েই বিপ্লব চলে আসে ইরানে। ক্ষোভে ফেটে পড়ে সাধারণ জনগণ। সর্বস্তরের মানুষ নেমে আসে রাস্তায়। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন উলামা গোষ্ঠী।

শাহ সরকার যত বেশি রস্বৈরাচারের পক্ষ ত্যাগ করে জনতার পক্ষ নেয়ক্ত ঝরাচ্ছিল জনগণ আরো বেশি উত্তাল হয়ে উঠছিল। অবশেষে সেনাবাহিনী । ফলে চিকিৎসা নেওয়ার নাম করে শাহ ১৯৭৮ সালে ইরান ছেড়ে পালিয়ে যান। আর ক্ষমতায় চলে আসেন উলামা গোষ্ঠী। প্রতিষ্ঠা হয় ইসলামের শাসন। এরপর অনেক দূর এগিয়ে যায় ইরান।

সে সময় মোহাম্মদ রেজা শাহ আমেরিকার আশ্রয়ে ছিলেন। পরে আমেরিকা-ব্রিটেন, কোনো দেশই আশ্রয় দেয়নি তাকে। শেষে তাকে আশ্রয় নিতে হয় ডিভোর্স হওয়া স্ত্রী ফাউজিয়া ফুয়াদের দেশ মিশরে।

১৯৭৯ সালে বিপ্লবের পর বিশ্ব তাকিয়ে ছিলো ইরানের দিকে| রাজতন্ত্র থেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রে রূপান্তর হওয়ার শুরুর দিকে অস্থির সময় নামে ইরানে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রতিবিপ্লবের শঙ্কার মধ্য দিয়ে কাটাতে হয় বিপ্লবোত্তর নীতিনির্ধারকদের। তখন ভেঙে পড়েছিলো দেশটির অর্থনীতি। কাজ করছিলো না প্রশাসন যন্ত্র। দীর্ঘদিন জনতার ওপর পুলিশের পীড়নে এই বাহিনীটির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে মানুষ। এতে বিপ্লবের পর পুলিশ লাইনে আশ্রয় নিতে হয়েছিলো তাদের।

বিপ্লবোত্তর ইরানেও ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতে। পাল্টে দিতে হয় সামরিক বাহিনীর খোল-নলচে। দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশটির কলকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে পরিবর্তন আনা হয়। বামপন্থী ও বিপ্লব বিরোধীদেরকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়ার কাজটিও করতে হয়েছিলো দ্রুত সময়ের মধ্যে| এরপর পতিত সরকারের অপরাধের সাথে যুক্ত সরকারি কর্মকর্তা এবং সেনাদের বিচারের ব্যবস্থা করা হয়। এতে মৃত্যুদণ্ড হয় অনেক বিপ্লব-বিরোধীর।

১৯৭৯ সালে খুজিস্তান, কুর্দিস্তান এবং গনবাদ-ই কাবুসে ইসলামপন্থী শক্তির বিরুদ্ধে শুরু হয় মার্কসবাদী গেরিলাদের বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ দমন করতে এক বছরেরও বেশি সময় লেগেছিলো।

১৯৮১ সালের জুন থেকে ১৯৮২ সালের মার্চের মধ্যে ব্যাপক অস্থির সময় সামাল পার করতে হয় ইরানকে। ওই সময় কমিউনিস্ট, সমাজতন্ত্রী, সামাজিক গণতন্ত্রী, রাজতন্ত্রবাদী এবং বাহাই ধর্মের অনুসারীদের অনেকে বিপ্লবের বিরুদ্ধে তৎপর হয়ে উঠে। পশ্চিমা এক গবেষণা সংস্থার হিসাবে ওই সময় ৮৫টি শহরে সাড়ে তিনহাজারের বেশি মৃত্যুদণ্ডের নথি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

অস্থিরতা কাটিয়ে বিপ্লব সংহত করতে সময় গড়িয়ে যায় ১৯৮৩ সালের পঞ্জিতে। ইরানে বিপ্লবের পর বিভিন্ন মুসলিম দেশে তরুণরা ইসলামী বিপ্লবের চেতনায় উজ্জ্বীবিত হতে থাকে। এতে আতঙ্কিত হয়ে উঠে মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর শাসকেরা| ইরান-বিরোধীতায় পশ্চিমাদের সাথে এক হয় সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশ। মূলত ইরানের বিরুদ্ধে আরব দেশগুলোর সামরিক শক্তি ব্যবহারের নীতি গ্রহণ করেছিল ওয়াশিংটন। আর এ কারণে ইরাক ও সৌদিকে উসকে দিয়েছিলো আমেরিকা। এ বিষয়ে কথা বলেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রেজনস্কি। তিনি বলেন, ‘মার্কিন সরকারের উৎসাহ পেয়েই রাজতান্ত্রিক আরব দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ইরাকের সাদ্দাম সরকারকে অর্থ সাহায্য দিতো। মার্কিন সরকারের উৎসাহ পেয়েই সৌদি সরকার তেলের দাম কমিয়ে দিতো, যাতে ইরানের তেলের দামও কমে যায়। এতে যুদ্ধের খরচ যোগাতে ব্যর্থ হয় তেহরান।’ 

মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সাথে মিলে পশ্চিমাদের এই ষড়যন্ত্র ধ্বংস করতে পারেনি দেশটির বিপ্লবকে। এর পেছনে কাজ করেছে ইরানি জাতির প্রতিরোধ। আর প্রতিরোধের পেছনে আছে বিপ্লবের শক্তি।

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...