চোখের সামনে তলিয়ে গেল শৈশবের গ্রাম! এক নেপালি সাংবাদিকের অনুভূতি

হড়পা বানের আগে ও পরের ছবিতে নুয়াকোটের বেত্রাবতী বাজার

নেপালের মানচিত্র থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো গোটা একটা জেলা। দেশটির ইংরেজি সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট এর সাংবাদিক অর্জুন পৌডেল তখন তার গ্রাম সোলের লোকদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। স্মার্টফোনের পর্দায় দেখছিলেন খণ্ড খণ্ড কিছু ভিডিও। ফোনকলে পরিচিতজনদের সংযোগও পেয়েছিলেন। কিন্তু অনেকের ফোন ছিলো সাড়াহীন। ইনফোজা প্রতিবেদন থেকে জানুন অর্জুন পৌডেল এর সেই অভিজ্ঞতা।

বুধবার সকাল, কাঠমান্ডুর কান্তিপুর পাবলিকেশন্সের অফিসের দিকে যাচ্ছিলাম। তখনই স্ত্রীর ফোন- ত্রিশূলি নদীতে ভীষণ বন্যা” তার গলায় আতঙ্ক।

“সোলে বাজার আর বেত্রাবতীর নাকি কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই- সবাই বলাবলি করছে। মানুষজন যে যেদিকে পারছে রাস্তায় নেমে এসেছে। দিকবিদিক হারিয়ে ছোটাছুটির কিছু ভিডিও ঘোরাফেরা করছে স্মার্টফোনে।

কথাগুলো বিশ্বাস করতে পারিনি। সোলে যে আমার নিজের গ্রাম! এই গ্রামের অলিগলিতে শৈশব কেটেছে, মাঠে কাজ করেছি, কত বছর ধরে প্রতিদিন সকালে এই পথ ধরেই তো স্কুলে যেতাম। এখানকার ধূলিকণাও আমার চেনা— এমন এক জায়গায় এমন ঘটনা ঘটতে পারে, তা আমার কল্পনার বাইরে ছিল। তাছাড়া খুব অস্বাভাবিক বৃষ্টি হয়েছে বলেও শুনিনি। আর এই নদী এতো উঁচুতে কোনোদিনও ওঠেনি, এমনকি বর্ষার চরম রূপেও না। তাই বিষয়টিতে খুব একটা পাত্তা না দিয়ে বেলা এগারোটার মিটিংয়ের দিকে পা বাড়ালাম।

বেত্রাবতী বাজার আমাদের কেনাকাটার জায়গা, বাস থামার প্রধান সংযোগস্থল— যেখান থেকে সোজা কাঠমান্ডু যাওয়ার বাস পাওয়া যায়। আমার বাড়ি ফেরার প্রতীক্ষায় বাবা-মা সেখানেই এসে দাঁড়িয়ে থাকতেন। জায়গাটি এলাকাটির হূৎপিণ্ড: একটি রাম মন্দির, একটি কৃষ্ণ মন্দির, আর রাম নবমী ও কৃষ্ণ জন্মাষ্টমীতে উপচে পড়া মানুষের ভিড়। প্রাচীন নেওয়ার সম্প্রদায়ের লোকালয় হওয়ায় এখানে ‘গাই যাত্রা’ উৎসব হতো, আর সাম্প্রতিক সময়ে মাঘে সংক্রান্তিতে ষাঁড়ের লড়াই দেখতে কাঠমান্ডু থেকেও লোকজন ছুটে আসতো।

কিন্তু সেসবের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই— খুব শীঘ্রই সেটা জানতে পেলাম।

স্ত্রী যা বলল তা সত্যি কি না যাচাই করতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটি নিউজ সাইট খুললাম। বড় বড় অক্ষরে শিরোনাম: ত্রিশূলি নদীতে ভয়াবহ বন্যা। বুকের ভেতরে একটা মোচড় দিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলাম রঞ্জনকে— সেও সাংবাদিক, সোলে বাজারে তার পরিবার থাকে। বাজার বড় হওয়ার পর তারা গ্রাম থেকে নেমে এসে নদী লাগোয়া এলাকায় বসতি গড়ে। রঞ্জন প্রথম রিংয়েই ফোন ধরল।

“আমিও এইমাত্র শুনলাম দাই। (দাই মানে দাদা)।,” এক নিঃশ্বাসে বলে উঠল সে। “কাউকেই ফোনে পাচ্ছি না। মামি, বুবা (বাবা), কাকা, কাকিমা— কারো ফোনেই রিং হচ্ছে না।”

অফিসে যাওয়ার বাকি পথটুকু আমরা দুজনে একে অপরকে বারবার ফোন করে প্রতিবেশীদের নম্বর ঘুরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। অবশেষে একজনের মোবাইলে সংযোগ মিলল- আমার এক বড় ভাইয়ের বাড়ি, ফোনটি ধরলেন তার স্ত্রী। নিরাসক্ত গলায় বললেন, “গ্রামে আর কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই। অধিকাংশ মানুষ ভেসে গেছে।”

নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সোলে আর তুপচে এলাকা নদীর তলদেশ থেকে প্রায় একশ মিটার উঁচুতে। জীবিত কারো স্মরণে— এমনকি শতাব্দীর ইতিহাসে— এত উঁচুতে পানি ওঠার কোনো নজির নেই। আমার বয়স ৪৪ বছর, জীবনে কোনোদিন এই নদীকে এতো উগ্র হয়ে আমাদের দিকে ধেয়ে আসতে দেখিনি। ওখানে আমার মামাতো ভাইবোন, প্রতিবেশী, শৈশবের বন্ধুরা আছে। নিজের বাড়ির বাইরে যাদের আমি ভালোবেসেছি, তারা সবাই ওই গ্রামের।

এক এক করে সবাইকে ফোন করতে থাকলাম। সুলের মতো জায়গায় সবাই কোনো না কোনোভাবে সবার আত্মীয়। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও বয়সের সূত্রে মানুষ অপরিচিত কাউকেও ‘দাই’ (দাদা) বা ‘দিদি’ বলে ডাকে— এটাই ওখানকার নীতি। গ্রামের সবাই যেন আমার আর আমিও সবার। আস্তে আস্তে আমার ফোনে ভিডিও আর ছবি আসতে শুরু করল। যা দেখলাম, তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।

আমার সবচেয়ে বড় পিসি ভেসে গেছেন। সঙ্গে তার ছেলে— আমার বড় ভাই মধু, আর ভাইয়ের স্ত্রী। পিসতুতো আরেক বোনও নাকি আর নেই। একই স্রোতে তলিয়ে গেছে তার নাতি সিজন ও তার স্ত্রী। তার নিজের ছেলে আর ছেলের বৌয়ের কোনো খোঁজ মেলেনি। আমার মামা সকালে গবাদিপশুর ঘাস কাটতে বের হয়েছিলেন, আর ফেরেননি।

ওয়ার্ড চেয়ারম্যান রবীন্দ্র নেপালকে ফোন করলাম। “ভাই, সকালে মিউনিসিপ্যালিটি অফিসে এসে আটকে পড়েছি,” তিনি বললেন। “গ্রামে আর কিছু বাকি নেই। বাকিটা তুমি নিজেই বুঝে নাও।” প্রতিটি কল পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছিল। তিনি জানালেন, কিছু লোক পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে উঠে কোনোমতে প্রাণ বাঁচিয়েছে— কেবল ভাগ্যজোরে। কাছের স্কুলের এক শিক্ষককে ফোনে পেলাম। কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, “আমার নিজের পরিবারকেই খুঁজে পাচ্ছি না ভাই। বেত্রাবতীর ৯০ শতাংশ বাড়িঘর শেষ। স্কুলের ভ্যানটাও ভেসে গেছে। আমার পাশে একটা ছেলের পা ভেঙে গেছে। আরেকজনেরও পা ভাঙা, চোখে চরম আঘাত পেয়েছে। পারলে একটা হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করে দাও, দয়া করে!”

এরপর নিরাঞ্জনের কাকা ফোন করলেন। নিরাঞ্জনের বাবা, মা, কাকা, কাকিমা এবং তার ছোট বোন হিমানী— সবাইকে গ্রাস করেছে নদী। “আমরা শেষ হয়ে গেলাম অর্জুন,” বলেই তিনি ফোনটা কেটে দিলেন।

বেত্রাবতী কেবল একটা বাজার ছিল না। নেপাল ও তিব্বত যুদ্ধের পর এখানেই ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। সেখানে রয়েছে ‘উত্তর গঙ্গা ধাম’— এমন এক পুণ্যক্ষেত্র যেখানে প্রতি বছর পৌষ অমাবস্যায় হাজার হাজার মানুষ পূর্বপুরুষের তর্পণে আসত। সব—সেই মন্দির, ঐতিহাসিক চুক্তির স্মারক, তীর্থক্ষেত্র—আজ শুধুই ধ্বংসস্তূপ।

কোনো রাস্তা নেই, বিদ্যুৎ নেই, ফোনের সিগন্যাল নেই, ইন্টারনেট বন্ধ। ভাটির দিকে বন্যা ত্রিশূলি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের হেডগেট আর মূল পাওয়ার হাউসটাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। মনে পড়ে, ২০১০-১১ সালের দিকে যখন দেশজুড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হতো, তখনও আমাদের গ্রামে এক মুহূর্তের জন্য বিদ্যুৎ কাটেনি। আর আজ পুরো জেলা অন্ধকারে নিমজ্জিত। বুধবার সন্ধ্যায় বন্ধুদের সাথে জেলা সদরের দিকে যাওয়ার সময় নিজের চোখে দেখলাম— শুধু আমার গ্রাম নয়, পুরো জেলাটাই যেন এক নিকষ অন্ধকারে তলিয়ে গেছে। সকালে যারা কাজে জেলা সদরে এসেছিল, তারা আটকা পড়েছে, ঘরে ফেরার পথ বন্ধ। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা বাড়ি ফিরতে পারছে না। ব্যাটার সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য একটি উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারের পাশে দাঁড়িয়ে আমার এক প্রতিবেশী আঁকুপাঁকু করছিল ওঠার জন্য। অনুনয় করে বলছিল, “আমার কাকু-কাকিমা ভেসে গেছে। তাদের ফোন বন্ধ। আমার নিজের ঘরটার কী অবস্থা, তাও জানি না।”

আমার বড় পিসির বড় ছেলে কাঠমান্ডুতে আটকে আছে, সেখান থেকে কিছু করার উপায় নেই। আর ছোট ছেলেটি সবেমাত্র বিদেশ থেকে কাজ সেরে ফিরেছিল—বাড়িতে পৌঁছার আগেই জল এসে সব কেড়ে নিল। ফোনে শুনলাম, যেসব শিশুরা কোনোমতে প্রাণ হাতে নিয়ে উঁচু টিলায় আশ্রয় নিয়েছে, তাদের নামিয়ে আনার উপায় নেই। যারা হারিয়ে গেছে— মা, ভাই, বৌদি—তাদের জন্য শোক পালন করার আগেই এখন বেঁচে থাকা মানুষগুলোকে উদ্ধার করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

Nepal flash flood 10 hour timeline showing how the flood started
হড়পা বানের টাইমলাইন প্রকাশ করেছে নেপালের গণমাধ্যম দ্যা কাঠমান্ডু পোস্ট

বন্যা শুধু গ্রাম কাড়েনি, কেড়ে নিয়েছে জেলা সদরে যাওয়ার পথ এবং সেই সূত্রে বাকি দেশের সাথে যোগাযোগের শেষ মাধ্যমটিও। যে বাজার থেকে আমাদের রেশনের সংস্থান হতো, তা শেষ—অর্থাৎ কিছু কেনার উপায় নেই। ক্ষেতের ফসল তলিয়ে গেছে। আর যেটুকু শস্য ঘরে জমা আছে, কল বা মিল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তা ভাঙিয়ে চাল বা আটা করারও সুযোগ নেই।

১৯৬৭ সালে (২০২৪ বিক্রম সংবৎ) নির্মিত ধুঙ্গে ও ত্রিশূলি বাজারকে যুক্ত করা ত্রিশূলি নদীর সেই ঐতিহ্যবাহী পুরনো সেতুটি শেষ। কয়েক বছর আগে তৈরি নতুন সেতুটিও নেই। ভৈঁসে সেতুসহ নদীর ওপরের প্রতিটি ঝুলন্ত সেতু ভেঙে চুরমার—ফলে জেলা সদরে পৌঁছানোর কোনো পথ অবশিষ্ট নেই। কাছেই বাগটারের জেলা হাসপাতাল, অথচ সেখানে পৌঁছানো এখন অসম্ভব। দূরের গ্রামগুলো— ভৈরামকোট, সামারি, তোকসার, দেউরালি, কিসপাং, কাউলে, ভালচে, সালমে এবং ধাডিং সীমান্তের ওপারে থার্পু—পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। পুরো রুসুয়া জেলা এখন নেপালের সড়ক যোগাযোগ থেকে আলাদা হয়ে গেছে। যে দৃশ্য চারপাশে ছড়ানো, তাতে এত সহজে এগুলো আবার আগের মতো গড়ে উঠবে বলে মনে হয় না।

“কেউ এখন অসুস্থ হলে ঘরে বসেই মরা ছাড়া উপায় নেই,” গভীর শোকে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসা এক গ্রামবাসী বললেন। “হাসপাতালে নিয়ে যাবে কীভাবে? রাস্তা নেই, সেতু নেই, কোনো গাড়ি চলার উপায় নেই।” সামান্য লবণ কেনারও উপায় নেই কারো। বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত, অসংখ্য মানুষ এখনও নিখোঁজ। যারা বেঁচে রইল, তাদের ভবিষ্যতে কী আছে জানি না। প্রায় দেড় দিন আগে গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলাম, কিন্তু বিদুরের জেলা সদরে এসে আটকে আছি, সামনে এক পা-ও এগোনোর পথ নেই।

নিজের মনকে বারবার প্রশ্ন করছি—কতদিন পর আমার গ্রাম আবার আগের মতো হবে? কারো কাছে এই প্রশ্নের উত্তর নেই। জীবনে কেউ কোনোদিন এমন ধ্বংস দেখেনি— কয়েক মিনিটের ব্যবধানে এমন সবুজ-শ্যামল একটা গ্রাম পুরোপুরি ছাই হয়ে গেল! বয়স্ক মানুষগুলো শূন্য চোখে বার বার একই কথা বলে যাচ্ছেন, যেন বারবার বললে ইতিহাস বদলে যাবে: এই জায়গাটা কি আর কোনোদিন আগের মতো হতে পারবে?

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...