২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, ইসরাইলের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন আল আকসা ফ্ল্যাড’ চালায় ফিলিস্তিনী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। এর পর সারা বিশ্বে ইহুদিদের বিরুদ্ধে ‘বিদ্বেষ’ আগের তুলনায় বেড়ে গেছে, এমনটাই মনে করেন ইসরাইলবান্ধব গবেষকরা। চলতি মাসের শুরুর দিকে ইসরাইলের হাইফা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমবেত হয়েছিলেন তারা। ওই অনুষ্ঠান নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইল। ওই প্রতিবেদন থেকে কিছু অংশ ইনফোজা দর্শকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

হাইফা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমবেত হওয়া ইসরাইলবান্ধব গবেষকরা মনে করেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ইহুদিবিদ্বেষ। ইসরাইলবান্ধব গবেষকদের এই সম্মেলনের আয়োজনে ছিলো হাইফা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কম্পার সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব সেমিটিজম অ্যান্ড রেসিজম’। এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জ্যাকব ডালাল জানান, এই সম্মেলনের মাধ্যমে আয়োজকেরা ‘কনটেম্পোরারি অ্যান্টিসেমিটিজম স্টাডিজ অ্যাসোসিয়েশন’ নামে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা উদ্যোগের সূচনা করেছেন। এর মূল উদ্দেশ্য সমসাময়িক ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ে গবেষকদের জন্য পেশাদারি নেটওয়ার্ক তৈরি করা।
বিশ্বব্যাপী ইহুদিবিদ্বেষের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গবেষকেরা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘হর্সশু থিওরি’ বা অশ্বক্ষুরাকৃতি তত্ত্ব। এই থিউরি অনুযায়ী উগ্র-বামপন্থী এবং উগ্য ডানপন্থী চিন্তাগুলো দুই সরলরেখার দুই প্রান্তে না থেকে ঘোড়ার খুরের মতো বাঁকা হয়ে কাছাকাছি চলে আসে। এ কারণে সারাবিশ্বে মুসলমানদের প্রভাব বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
ইসরাইলিরা একই জায়গায় স্থবির হয়ে আছেন বলেও সংশয় প্রকাশ করেছেন কয়েকজন গবেষক।
বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘এনজিও মনিটর’-এর প্রতিষ্ঠাতা জেরাল্ড স্টেইনবার্গ মনে করেন, ইহুদি-বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য সারাবিশ্বে বিপুল অর্থ খরচ করছে বিভিন্ন ইসরাইলবিরোধী প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইহুদিবিদ্বেষ ছড়ানোর ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম বলে দাবি করেছেন স্টেইনবার্গ। তিনি বলেন, ‘৭ অক্টোবরের পর ইহুদিদের বিরুদ্ধে যে ধরনের তৎপরতা দেখা গেছে, তা আকস্মিক বা স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। বিগত অন্তত দুই দশক ধরে গড়ে ওঠা একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা গাইডলাইনের আলোকেই এগুলো সাজানো হয়েছে।”
জাতিসংঘের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন এনজিওর প্রতি অভিযোগ রয়েছে স্টেইনবার্গের। ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’, ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ এবং ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস’-এর নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, “২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এসব সংস্থা সুসংগঠিতভাবে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছিল। মাত্র আড়াই সপ্তাহের মধ্যে বিশাল এই তিনটি সংস্থা বড় বড় প্রতিবেদন প্রকাশ করে। মিডিয়ায় জোর প্রচারণা চালিয়ে দাবি করে- গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরাইল। প্রচুর ফুটনোট ও তথ্যে ভরা এই প্রতিবেদনগুলোকে দেখতে বেশ বিস্তারিত এবং বৈজ্ঞানিক মনে হলেও এগুলো আসলে বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা।”
এই সংস্থাগুলো ইসরাইলের ওপর তাদের সমালোচনাকে ‘ইহুদিবিদ্বেষ’ হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
জেরাল্ড স্টেইনবার্গ মনে করেন, ইসরাইলবিরোধী নেটওয়ার্কগুলোর অর্থ আসে কাতারসহ বেশকিছু মুসলিম দেশ থেকে। তবে অর্থগুলো কখন কীভাবে আসে, সেগুলো চিহ্নিত করা কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ‘ফোর্ড ফাউন্ডেশন’, জর্জ সোরোসের ‘ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনস’ এবং ‘রকফেলার ব্রাদার্স ফান্ড’-এর মতো সংস্থাগুলো পাশ্চাত্যবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর প্রধান অর্থদাতা।
জেপিপিআই-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো ডভ মাইমন মনে করেন, আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালের মে মাসে ফ্রান্সে ইহুদিদের ওপর বড় ধরনের আক্রমণ শুরু হতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নয়, রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করেই এই পূর্বাভাস দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন তিনি। কারণ হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, ফ্রান্সের জনমিতি ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে। মুসলিমদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় ইহুদিদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে দেশটিতে।
মাইমন মনে করেন, সরকারি হিসাবে ফ্রান্সের মোট মুসলিম সংখ্যা বাস্তব সংখ্যার চেয়ে অনেক কম দেখানো হয়। সাধারণ ধারণা অনুযায়ী ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের ফ্রান্সে মুসলিম সংখ্যা ৫০-৬০ লাখ। কিন্তু নবজাতকদের নাম, হালাল খাবারের বিক্রি এবং ধর্মীয় অনুশীলনের জরিপ বিশ্লেষণ করে মাইমন জানান, প্রকৃত সংখ্যাটি প্রায় ৯০ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখের কাছাকাছি এবং তা দ্রুত বাড়ছে।
তিনি জানান, এদের মধ্যে প্রায় ২৮ শতাংশ বা প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ রাজনৈতিক ইসলামের এমন ভাবধারায় বিশ্বাসী যা পশ্চিমা মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা আরও বেশি।
মাইমন মনে করেন, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করবে। রান-অফ নির্বাচনে মেরিন ল পেনের নেতৃত্বাধীন অতি-ডানপন্থীরা জয়ী হলে ইসলামপন্থীরা রাস্তায় নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন তিনি।
বিতর্কিত বই ‘ফেমিনিস্ট অ্যান্টিসেমিটিজম: অ্যান ইন্টেলেকচুয়াল হিস্ট্রি’-র লেখিকা কারা জেসেলার মনে করেন, ইদানীং নারীবাদীদের মাঝেও দেখা দিচ্ছে ইহুদিবিদ্বেষ। কারণ ইহুদিরা এখন যেভাবে ভাবছে, সেটা নারীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে বহু বছর পিছিয়ে দিচ্ছে।
জেসেলা দাবি করেন, ইহুদিরা সুবিধাভোগী পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ বলেই মনে করছেন মার্কিন নারীবাদীরা। ২০২৩ সালে যৌন সহিংসতার পর এই ধারণা আরো তীব্র হয়ে উঠেছে।
৭ অক্টোবর ‘অপারেশন আল আকসা ফ্ল্যাড’ এর পর ইসরাইলি সেনাদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি বন্দি ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর যৌনসহিংসতার একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে এসব অভিযোগ উঠে আসে।
-ইনফোজা ডেস্ক