
খুলনা বিভাগের কয়েকটি জেলায় আমন খেতে মাজরা পোকার আক্রমণ হয়েছে, ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে- এই খবর আমরা পত্রিকার মাধ্যমে সহজেই পেয়ে যাই। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে- এই খবরটি কিন্তু পত্রিকায় আসে না। ‘চালের দাম বেড়েছে’ এই খবরটি পত্রিকায় তিনকলামে প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হলেও ‘চালের দাম কমেছে’ এই খবরটি শেষের পৃষ্ঠায় সিঙ্গেল কলাম হয়ে যায়। আমরা অর্জনের খবর পাই না- বর্জনের খবরে পত্রিকার পৃষ্ঠা ভরে থাক। কেন এমনটি করা হয়?

এই প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিকতার শিক্ষক কিংবা সিনিয়র সাংবাদিকরা গম্ভীরস্বরে বলবেন, ‘আরে তুমি তো সাংবাদিকতার আসল বিষয়টিই এখনো শেখনি। সব সময় মনে রাখবে, ব্যাড নিউজ ইজ দ্য গুড নিউজ।’
কিন্তু এই ধারণাটি যে অনেক আগেই পুরনো এবং বাসি হয়ে গেছে তা আমাদের দেশের মিডিয়া কর্মীদের অনেকেরই জানা নেই। জানা থাকলেও হয়তো মানতে চান না। গুড নিউজও যে নিউজ, এরও যে বিশাল সংবাদমূল্য আছে- তা সংবাদকর্মীদের অনেকের মাথায় ঢুকানো একটি কঠিনতর কাজ। আর এ কারণেই আমাদের দেশের সংবাদপত্রগুলোর পৃষ্ঠায় নেগেটিভ খবরেরই একচ্ছত্র প্রাধান্য।
ব্যাড নিউজ কত ফলাও করে প্রচার করা যায় সে ব্যাপারে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমেছে পত্রিকাগুলো। একবার একটি দৈনিক পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার নিউজের হিসাব করে দেখা গেলো তিনভাগের দুই ভাগই নেগেটিভ নিউজ। এসব ব্যাড নিউজের শিরোনাম ও পরিবেশনা দেখলে যে কেউ আঁতকে উঠতে বাধ্য। মানুষকে আতঙ্কের মধ্যে রাখাই কি মিডিয়ার কাজ?
কিছু কিছু সংবাদ পরিবেশনার স্টাইল ও ভাষার ব্যবহার দেখলে ধারণা হয় এটিও যেন এক ধরনের ‘ক্যাডারগিরি’। সংবাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্ব যে রুচিশীলতা- তা যেন কিছু সংবাদকর্মী জীবনে শোনেইনি।
সমাজে অনাকাঙ্খিত অনাচার কতই তো ঘটে- তার সবকিছুই সংবাদ হবে?
সংবাদমূল্যের বিষয়টি কি সংবাদকর্মীরা জানেন না? কোনো কোনো পত্রিকা ধর্ষণের খবর এমনভাবে পরিবেশন করে যে মনে হয় ঘটনার সময় তিনি সামনে ছিলেন। ঘটনার খুঁটিনাটি বর্ণনার এতই ব্যাপ্তি থাকে যে, তা রসময়গুপ্তকেও হার মানায়। এই ধরনের সংবাদ পরিবেশনে ধর্ষণের শিকার মানুষটির প্রতি মমত্ববোধের প্রকাশ ঘটালে সংবাদমূল্যের কি ঘাটতি পড়ে?
পত্রিকার পাতা উল্টালে মনে হয়, বাংলাদেশের মানুষের জন্য ভালো কোনো খবর নেই। দেশটির কোথাও কোনো কিছু ভালো নেই। ভালো ঘটনা নেই। ভালো মানুষ নেই। আশা নেই। ভবিষ্যৎ নেই। চারদিকে হতাশা, অন্ধকার। ‘সাংবাদিকরা জাতির বিবেক’ সম্ভবত বাংলাদেশে এই কথাটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়। কিন্তু ‘বিবেকগণ’ জাতির সামনে প্রতিদিন যদি ব্যাড নিউজের অন্ধকার মেঘ এনে হাজির করেন তাহলে পাঠকরা বিবেকদের ভিলেন ভাবলে অবাক হবার কিছু থাকবে না। ইতোমধ্যেই সাংবাদিকদের কিন্তু ‘সাংঘাতিক’ বলেও অনেকে সম্বোধন করে।
১৯৬৭ সালে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ‘উন্নয়ন সাংবাদিকতা’ টার্মটি চালু হলেও এর প্রভাব বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ওপর পড়েনি। মাঝে মধ্যে দু’একটি পত্রিকা ‘ব্যক্তির সাফল্যে’র দু’চারটি খবর পরিবেশন করছে। মানুষ এই ধরনের খবরকে দারুণ আগ্রহের সাথে গ্রহণ করে এবং অনুপ্রাণিত হয়। এই প্রসঙ্গে বিটিভি’র ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানটির কথা বলা যায়।
কারো অর্জন ও সাফল্যের খবর দিতে পত্রিকাগুলোর কৃপণতার শেষ নেই। কৃপণের রাজা কারুনও এক্ষেত্রে ফেল। কারো ভালো খবর দিতে পত্রিকাগুলো যেন কষ্ট পায়। ঘুষখোরের খবর ছাপা হয় তার বিত্ত বৈভবের বর্ণনা দিয়ে। সৎ, ঘুষ খান না- তিনি কীভাবে সংসার চালান তার খবর পাঠকরা পান না।
সকালবেলা পত্রিকার পাতা খুলে গলাকাটা রক্তাক্ত লাশ, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক, ঘুষঘোর আমলার খবরে পাঠকরা আর উৎসাহী নয়। সন্ত্রাসীদের হিরো বানিয়ে পত্রিকায় পরিবেশিত রঙিন খবরে পাঠকরা হতাশ এবং বিরক্ত। পত্রিকার লোকজন কেন ভুলে যান- তাদের চেয়ে সচেতন পাঠক আছেন।

সরদার ফরিদ আহমদ: সিনিয়র সাংবাদিক। তাঁর বই ‘প্রেস প্যাকেজ’ থেকে লেখাটা নেওয়া হয়েছে।