
মিডিয়ার ব্যবসা আর দশটা ব্যবসার মতো নয়। এখানের কাজের ধরন ভিন্ন। আর চরিত্র তো একেবারেই আলাদা। সাংবাদিকরাই মিডিয়ার প্রাণ। তারাই প্রধান চরিত্র। মূল ভার্ব। বাকিরা অক্সিলারি।
এই বিষয়টি যে মালিকরা বুঝেন, তারা মিডিয়াতে সফল হন। সফল মালিকদের নীতি হলো, ‘টাকা দিলাম, সব কিছু আপনারা করবেন। কীভাবে করবেন, তা আমি জানি না। তবে ইতিবাচক ফলাফল চাই।’ এই অবস্থায় সাংবাদিকদের দায়িত্ব বেড়ে যায়। তারা সেভাবেই কাজে নামেন এবং সফলতার মুখ দেখেন।

মালিকের কারণে মিডিয়া ডুবছে, আবার মালিকের কারণেই মিডিয়া সফল হয়েছে- আমাদের দেশে এর ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে।
নব্বইয়ের দশকে আল মুজাদ্দেদ নামে একটি দৈনিক বাজারে এসে হইচই ফেলে দিয়েছিল। বাংলাদেশের প্রথম রঙিন বাংলা দৈনিক। পৃষ্ঠাও বেশি। তখন আট পৃষ্ঠার বেশি কোনো দৈনিক দেশে ছিল না। মুজাদ্দেদ ১৬ পৃষ্ঠা নিয়ে বাজারে আসে।
পত্রিকাটির মালিক ছিলেন আটরশীর পীর। পত্রিকায় পীরতন্ত্র বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দ্রুত ডুবে যায়। এক সময় আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। এখন আর নেই-ই। টাকার অভাব ছিল না। কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়েছিল। কিন্তু ওই যে, মালিকের পীরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কোশেস সবকিছুকেই ভণ্ডুল করে দেয়। হারিয়ে যায় একটি সম্ভাবনাময় মিডিয়া হাউজ।
দলীয় মিডিয়াও একই কারণে চলে না। সেখানে দলের সরব উপস্থিতি থাকায় সাংবাদিকরা হয়ে যান তিন নম্বর নাগরিক। আর মূল ভার্বকে পেছনে রেখে অক্সিলারি ভার্বের অগ্রগতি যে হয় না- তা সবাই জানে। দলীয় পত্রিকা টিকে থাকে, তবে টিমটিম করে। আলো ছড়াতে পারে না। আলো-আঁধারিতে বসবাস করতে হয়। ছিটকে পড়ে মিডিয়ার মেইনস্ট্রিম থেকে।
প্রথম আলো-ডেইলি স্টারকে সফল মিডিয়া হাউজ বলতে নিশ্চয়ই কারো আপত্তি নেই। এ দুটো পত্রিকার পলিসির ব্যাপারে অনেকের আপত্তি থাকতেই পারে। এর মালিকরা কোন নিউজ কিভাবে যাবে তার কোনো খোঁজ রাখেন না। পলিসি নির্ধারণ করেন সম্পাদক। মালিকরা বছরে একবার, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সাংবাদিক- কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সামনে হাজির হন। কিন্তু তারা পত্রিকার প্রভাব প্রতিপত্তি ঠিকই ব্যবহার করেন। আর আর্থিকভাবে লাভবান তো হচ্ছেনই।
সাংবাদিকতা পেশায় আসার পর মানুষের ব্যক্তিচরিত্রের কিছু পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনকে নেতিবাচক বা ইতিবাচক দু’ভাবেই ধরা যেতে পারে। সাংবাদিকরা অসাংবাদিকদের থেকে মিডিয়ার ব্যাপারে জ্ঞান নিতে একেবারেই অনাগ্রহী। বিরক্ত হন। কিন্তু তার নিজের পেশার অন্য একজন ভুল ধরিয়ে দিয়ে বকা-ঝকা করলেও তারা মনে কিছু করেন না। অসাংবাদিক কেউ ভালো কথা বললেও ক্ষেপে যান। এটাকে কেউ ‘বিচিত্র আচরণ’ বললেও বলতে পারেন।
এসব কথার মানে আবার এটা নয় যে, মালিক তার মিডিয়া হাউজের ব্যাপারে কোনো খোঁজ-খবরই নেবেন না। তার দেয়া অর্থ কিভাবে কোথায় খরচ হচ্ছে সেই হিসাবটি তাকে অবশ্যই জানতে হবে। আয়-ব্যয়ের হিসাবটি অবশ্যই তার নখদর্পনে থাকবে। তা না হলে দুর্নীতি হতে পারে। তখন মিডিয়া হাউজটি অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়বে। পত্রিকা ভালো, আয়ও ভালো। কিন্তু অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা না থাকার কারণে সেটি সঙ্কটে পরেছে এমন উদাহরণও আছে। আসলে মিডিয়ায় যার যা কাজ তার বাইরে গেলেই বিপত্তি।
সরদার ফরিদ আহমদ: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন