কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃত্রিম হলেও এখন প্রায় সব বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। ধর্মীয় প্রশ্ন করা হলেও, খুব সহজেই তথ্যনির্ভর জবাব দিয়ে দেয় এআই। এ নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। নিউইয়র্কে বসবাসরত ইহুদিদের মধ্যে দেখা দিয়েছে দ্বিধা। তারা বলছে এআই এখন তাদের ধর্মীয় গুরু রাব্বাইদের জায়গা দখল করে নিচ্ছে। একটা শ্রেণি একে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। অন্য একটা শ্রেণির কাছে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এ আই। এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইসরাইলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইল। নিউইয়র্ক থেকে ডেভিড পিন্টুর করা ওই প্রতিবেদন অবলম্বনে দেখুন ইনফোজা ভিউজ

ইহুদিদের মধ্যে দুইটা শ্রেণি আছে। একটা গোড়া ইহুদি। এদেরকে বলা হয় হারিদিক বা হাসিদিক। হারিদিকরা মূলত ধর্মকর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের পেছনেও তাদের আগ্রহ নেই। এমনকি ফিলিস্তিনে ইসরাইলের নির্যাতনের প্রতিবাদও করেন তারা। ইহুদিদের অন্য আরেকটা ভাগ আছে, যারা ইহুদিবাদে বিশ্বাসী। ভোগ-বিলাস এবং নিজেদের শ্রেষ্ঠত্য চায় তারা।
ঘুরে আসা যাক নিউইয়র্ক থেকে- ব্রুকলিনের স্যাতমোর সম্প্রদায়ের একটা এলাকায় হারিদিক সম্প্রদায়ের লোকেরা থাকে। ওই এলাকার প্রাণকেন্দ্রে একটি ইলেকট্রনিক্স দোকান। ওই দোকানে ঢুকলেন এক যুবক। টেবিলের ওপর একটা নতুন আইফোন রাখলেন তিনি।
চশমার সরু ফ্রেমের ভেতর থেকে ফোনটি পরীক্ষা করে দেখলেন দোকান ব্যবস্থাপক বারুচ কাহানা। একটি কম্পিউটারের সাথে যুক্ত করে ডিভাইসে টুকটাক কাজ শুরু করলেন তিনি। তিনি তার গ্রাহককে প্রযুক্তির ঝুঁকি থেকে দূরে রাখতে ওই ডিভাইস থেকে কিছু সাইট ও অ্যাপ বন্ধ করে দিলেন। এই সিস্টেমকে বলা হয় ‘কোশার’ করা বা পবিত্র করে নেওয়া। একটা ডিভাইস ব্যবহার করার আগে পবিত্র করে নেয় তারা।
ডিভাইসগুলোকে কোশার করার জন্য হারেদি ইহুদিরা রীতিমতো একটা গ্রুপ তৈরি করে ফেলেছেন। এই গ্রুপের নাম- টেকনোলজি অ্যাওয়ারনেস গ্রুপ বা ‘ট্যাগ’। এই গ্রুপের কাজ হলো ডিভাইসে ফিল্টার বসানো। প্রযুক্তি ব্যবহার করেও যেন ইহুদি মূল্যবোধ ঠিকঠাক থাকে, এর জন্য কাজ করে এই গ্রুপ।
ট্যাগ গ্রুপে দশ বছর ধরে কাজ করছেন কাহানা। এই দশবছরে হাজার হাজার ডিভাইস ‘কোশার’ করেছেন তিন। কিন্তু এখন যে গ্রাহক এসেছে, তার অনুরোধটা একটু অন্যরকম। তিনি কাহানাকে হোয়াটসঅ্যাপ থেকে একটি ‘এআই অ্যাসিট্যান্ট’ সরিয়ে দিতে বললেন। এই কাজটা আগে কখনো করেননি কাহানা।
কাহানা ফোন করলেন ট্যাগের সহকর্মীদের। ইদ্দিশ ভাষায় কথা বলতে শুরু করলেন। তাৎক্ষণিক একটা সমাধানও বের করে আনলেন। তারপর গ্রাহককে এআই-নিয়ন্ত্রিত ফোনটি বুঝিয়ে দিয়ে বিদায় করে দিলেন।
চ্যাটজিপিটির মতো ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ -এর উত্থানে হারিদিক সম্প্রদায়গুলো এখন এআই এবং ধর্মীয় রীতিনীতি রক্ষার পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয় নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। কেউ কেউ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তাৎক্ষণিক উত্তর দিয়ে ফেলাকে— ধর্মের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবেও ভেবে নিচ্ছে। আবার অন্যরা এই নতুন প্রযুক্তিকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করছে।
আবার ইহুদি ধর্মীয় যাজক রাব্বাইদের অনেকে নিজেদের মতো এআই অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করছেন। আবার স্যঅতমোরের মতো রক্ষণশীল ইহুদিদের জন্য ফিল্টার রেখেই ডিভাইস তৈরি করতে হচ্ছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এসব ডিভাইসে যৌনতা, রাজনীতি ও ধর্মীয় সংবেদনশীল বিষয়ে এআই কোনো জবাব দিতে পারে না।
নিউইয়র্ক সিটির ব্রুকলিন বরোর উইলিয়ামসবার্গে বসবাসকারী স্যাতমোর সম্প্রদায়ের জীবনধারা তাদের প্রতিবেশীদের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। এই এলাকার উত্তরাঞ্চলে থাকেন ধনী হারিদিকরা। তারা দক্ষিণের চাইতে একটু কম রক্ষণশিল। আর দক্ষিণের হারিদিকরা ইদ্দিশ ভাষায় কথা বলেন, নিজেদের স্কুলে পড়ালেখা করেন। আর কেবল ‘কোশার’ করা রেস্তোরাঁতেই খেতে যান। দক্ষিণে ধর্মীয় কাউন্সিল এবং সামাজিক রীতিনীতি কড়া। ওই এলাকায় টেলিভিশন, ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত। স্মার্টফোন জনপ্রিয় হওয়ার শুরুর দিক থেকে এলাকার দোকানগুলোতে ‘কোশার ফোন’ বিক্রি শুরু হয়।
এ নিয়ে ২০২৫ সালে একটি গবেষণা করেন নিউ জার্সির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন বিভাগের শিক্ষক ড. সুরিও। সারাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৪০ জন অর্থোডক্স ইহুদির ওপর এআই নিয়ে অনানুষ্ঠানিক জরিপ চালিয়েছেন তিনি। এতে ৯৪ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, সপ্তাহে একবার হলেও এআই ব্যবহার করেন তারা। অর্ধেক উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা ধর্মীয় কোনো বিষয় জানতে এআই ব্যবহার করেন না। বাকিরা স্বীকার করেছেন, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিষয়ও এআইকে জিজ্ঞেস করেন তারা। অথচ ঐতিহ্যগতভাবে এই দায়িত্বটি সংরক্ষিত ছিলো কেবল রাব্বাইদের জন্য।
ইসরাইলি বুদ্ধিজীবী ও ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়াহ হারারির মতো বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এআই এখন রাব্বাইদের কর্তৃত্বকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। লাখ লাখ ব্যবহারকারী এআইকে এখন সবজান্তা হিসেবে মনে করছে। এআই এখন ধর্মীয় বইগুলোতেও পাকা হয়ে উঠেছে।
এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত রাব্বাইরা ২০২৫ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞানী ড. মোশে কপেলের সাথে যোগাযোগ করেন। তারা ধর্মীয় সাহিত্যকে একটি ইহুদি চ্যাটবটে যুক্ত করার কথা বলেন। পরে কপেল ‘রাভ দিকতা’ নামের একটি প্রোগ্রাম তৈরি করে দেন। এই প্রোগ্রামটি ইহুদি ধর্মের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে। রাব্বাইদের সাহিত্য এবং তৌরাতের কোটেশন তুলে ধরে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিতে পারে।
জেরুজালেমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কপেল বলেন, “আমি প্রতিটি গোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ ইহুদি বইকে আমার লাইব্রেরিতে যুক্ত করতে চাই। যাতে যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব হয়।”
কপেল একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী, তৌরাত বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক কর্মী। তিনি দু’টি প্রতিষ্ঠান চালান- যন্ত্র শিক্ষণভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ‘দিকতা’ এবং রক্ষণশীল চিন্তা প্রতিষ্ঠান ‘কোহেলেত’। তিনি ২০২৩ সালে নেতানিয়াহু জোটের বিচার বিভাগীয় সংস্কারের একজন পরিকল্পনাকারী ছিলেন।
সাক্ষাৎকার চলাকালীন কপেল তার ল্যাপটপে ‘রাভ দিকতা’ চালিয়ে দেখান। পেজের ওপরের অংশে স্পষ্ট করে লেখা আছে একটা সতর্কবার্তা- “রাভ দিকতা কোনো মানব রাব্বাইয়ের বিকল্প নয়। এর উত্তরগুলো কেবল অধ্যয়নের জন্য, বাস্তবে প্রয়োগ বা অনুসরণের জন্য নয়।”
‘টাইমস অব ইসরাইল’-এর পক্ষ থেকে ‘রাভ দিকতা’-কে কিছু প্রশ্ন করা হয়েছিল। “ভালো মানুষের সাথে খারাপ কেন ঘটে?”— কঠিন এই প্রশ্নটি করা হলে প্রোগ্রামটি সাত মিনিট ধরে “চিন্তা” করে। তারপর পাঁচ অনুচ্ছেদের একটি জবাব দেয়।
জবাবটি শুরু হয়েছিল এভাবে: “আমাদের কাছে যা ‘খারাপ’ মনে হয়, তা আসলে ঈশ্বরের গোপন ভালোত্ব, যা আমাদের মানবিক সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা বুঝতে পারি না।”
উত্তরটি ছিল যৌক্তিক। শেষের দিকে আধ্যাত্মিক ভাবে পূর্ণ।
এতে বলা হয়, “বিশ্বে পবিত্রতার এমন কিছু স্ফুলিঙ্গ আছে, যেগুলো অন্ধকার স্থানে পতিত হয়েছে এবং কেবল বাধা-বিপত্তি ও পরীক্ষার মাধ্যমেই সেগুলোকে উদ্ধার করা সম্ভব।”