ইরানের সাথে আমেরিকার যুদ্ধ শুরু হয়েছে মাত্র দুই মাস, কিন্তু এরই মধ্যে এর ধাক্কায় কাঁপছে গোটা বিশ্ব। ইরানের সংবাদ মাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানাচ্ছে, নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক বিশেষ রিপোর্টে উঠে এসেছে যুদ্ধের এই ভয়াবহ অর্থনৈতিক চিত্র। প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা
এশিয়ার টেক্সটাইল কারখানা থেকে শুরু করে ইউরোপের বিমান সংস্থা- সবাই এখন খাদের কিনারে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যে আমেরিকা এই যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়েছে, তাদের অর্থনীতি কিন্তু এখনো বেশ চাঙ্গা। মার্কিন মুলুকে তেলের দাম কিছুটা বাড়লেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় কোনো ধস নামেনি। অথচ তাদের নেওয়া এই যুদ্ধের সিদ্ধান্তের মাশুল দিচ্ছে ভারত, বাংলাদেশ ও আফ্রিকার মতো দেশগুলো।
ভারত আর বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে এখন তালা ঝোলার দশা। কাঁচামাল মিলছে না, আর বিদ্যুতের দাম আকাশ ছোঁয়া। এই সংকটে উৎপাদন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা। অন্যদিকে আয়ারল্যান্ড, পোল্যান্ড আর জার্মানির মতো দেশগুলোতে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল করতে হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া বা ভিয়েতনামের মতো দেশে জ্বালানি বাঁচাতে শুরু হয়েছে রেশনিং। এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো ধনী দেশ, যাদের হাতে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের তহবিল আছে, তারাও এখন আমেরিকার কাছে আর্থিক সাহায্য চাইছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ আর গ্যাসক্ষেত্রে মিসাইল হামলার কারণে তাদের বিশাল অর্থনীতি এখন খাদের মুখে দাঁড়িয়ে।
গরিব দেশগুলোর অবস্থা আরো শোচনীয়। তেলের দাম বাড়ার সাথে সাথে সার আর পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় খাবারের দাম চলে গেছে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, আফ্রিকার দেশগুলোতে এখন চরম খাদ্য সংকট দেখা দিচ্ছে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষ যুদ্ধের কারণে নতুন করে দারিদ্র্যের কবলে পড়তে যাচ্ছে। ভারতের ফিরোজাবাদের শ্রমিক মোহাম্মদ ওয়াসিম যেমন আক্ষেপ করে বলছিলেন, যুদ্ধের কারণে কাজ তো কমছেই, মজুরিও নেমে গেছে তলানিতে। অথচ এই শ্রমিকরাই এক সময় মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করে দেশে টাকা পাঠিয়ে অর্থনীতি সচল রাখতেন। এখন তাদের বিদেশ যাওয়ার পথও বন্ধ।
জাপান বা ভারতের ইস্পাত আর গাড়ি শিল্পেও নেমে এসেছে মন্দা। চাহিদা কমে যাওয়ায় আর খরচ সামলাতে না পেরে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বড় বড় কোম্পানিগুলো। চীনে আবার খেলনা কারখানার শ্রমিকরা রাস্তায় নেমেছেন বিক্ষোভ করতে। হাজার হাজার মানুষ কাজ হারিয়ে এখন দিশেহারা। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ রঘুরাম রাজন হুশিয়ারি দিয়েছেন যে, জ্বালানির এই সংকট দিন দিন আরো বাড়বে এবং সামনে আরো অনেক বড় বড় শিল্পকারখানা চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যুদ্ধের এই দাবানল যত ছড়াবে, বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের হাহাকার ততই দীর্ঘ হবে। অথচ যুদ্ধের কারিগর আমেরিকা নিজের দেশে বসে এখনো তুলনামূলক নিরাপদেই আছে।