
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু শব্দ মিত্রদের বৈধতা দেয় এবং বিরোধীদের অবৈধ ঘোষণা করে। এই শব্দগুলো কৌশলে ব্যবহার করা হয় গণমাধ্যমে। এই কৌশল কাজে লাগানো হয় জনমত গঠনে। গণমাধ্যমের ভাষাও এ খন যুদ্ধের অস্ত্র। এ বিষয়ে মিডলইস্ট মনিটরে লিখেছেন ইতিহাসবিদ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ সাঈদ মার্কোস তেনোরিও। তিনি ব্রাজিল-প্যালেস্টাইন ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ও সহ-সভাপতি এবং ‘প্যালেস্টাইন: ফ্রম দ্য মিথ অব দ্য প্রমিজড ল্যান্ড টু দ্য ল্যান্ড অব রেজিস্ট্যান্স’ বইয়ের লেখক। তিনি দেখিয়েছেন, আধিপত্যবাদী গণমাধ্যমের ভাষা কীভাবে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে।
সাঈদ মার্কোস তেনোরিও উল্লেখ করেন, কোনো দেশের প্রশাসনকে যখন ‘সরকার’ বলা হয়, তখন এতে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতার ইঙ্গিত থাকে। কিন্তু যখনই ‘রেজিম’ বা ‘শাসনব্যবস্থা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়, তখন সেখানে সন্দেহ ও অবৈধতার ছাপ লাগিয়ে দেওয়া হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘রেজিম’ একটি নিরপেক্ষ ধারণা হলেও গণমাধ্যমে এটি বিচারকের ভূমিকায় থাকে। কোনো দেশের শাসনকে ‘রেজিম’ আখ্যা দেওয়া মানে, তার ওপর আগেভাগেই একটি নেতিবাচক রায় চাপিয়ে দেওয়া। এই রায় মানুষের মনে নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করে।
এই একই প্রক্রিয়া অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়। হিজবুল্লাহ কেবল একটি সশস্ত্র আন্দোলন নয়, লেবাননের রাজনীতিতে তাদের শক্তিশালী সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব আছে। সেইসাথে ব্যাপক সামাজিক সেবা কার্যক্রম রয়েছে তাদের। কিন্তু পশ্চিমা গণমাধ্যমের বয়ানে এই প্রেক্ষাপটগুলো হারিয়ে যায়। বিশেষ করে দখলদারিত্ব, যুদ্ধ এবং জাতীয় অধিকার অস্বীকার করার মতো মৌলিক কারণগুলো আড়াল করে ফেলা হয়। আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের অধিকার স্বীকৃত থাকলেও পশ্চিমা গণমাধ্যম এই বিষয়টিকে অপরাধ হিসেবে চিত্রায়িত করে। সংঘাতকে রাজনীতিমুক্ত করে দেখায়।
এই ভাষাগত বৈষম্য সবচেয়ে প্রকট হয়ে ওঠে ইসরাইলের ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ফিলিস্তিন একটি অধিকৃত ভূখণ্ড। সেখানে বসতি স্থাপন অবৈধ হওয়ার পরও পশ্চিমা গণমাধ্যম খুব কম সময়ই ইসরাইলকে ‘দখলদার শক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করে। এর পরিবর্তে, সেখানে ‘আত্মরক্ষা’ শব্দটিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এতে একটি গভীর অর্থগত বিপর্যয় ঘটে; যেখানে ‘দখলদারিত্ব’ শব্দটাই আলোচনা থেকে মুছে যায় এবং অধিকার আদায়ের প্রতিরোধকে অপরাধী হিসেবে দেখানো হয়। এই বিশেষ বয়ানটি স্নায়ুযুদ্ধ এবং তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর সময় থেকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে।
লেখক মনে করেন, কে ‘সরকার’ আর কে ‘রেজিম’, কিংবা কার কর্মকাণ্ড ‘আত্মরক্ষা’ আর কারটা ‘সন্ত্রাসবাদ’- গণমাধ্যম সেগুলো নির্ধারণ করে দেয়। এতে মূলত সামরিক হস্তক্ষেপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অবরোধের পথ খুলে যায়। এটি বিভিন্ন জাতির মধ্যে অসমতাকে স্বাভাবিক করে তোলে। কিছু মানুষের জীবনকে মূল্যবান মনে করলেও অন্যদের স্থায়ীভাবে সন্দেহভাজন হিসেবে উপস্থাপন করে। এই ভাষাগত আধিপত্য ভাঙতে হলে কেবল ধারণাগত স্বচ্ছতা নয়, বরং সাহসের প্রয়োজন বলে মনে করেন তেনোরিও। কারণ ভাষা এখন যুদ্ধের ময়দানেরই অংশ। আর শব্দগুলো বাস্তব অস্ত্রের মতোই শক্তিশালী ভূমিকা রাখে।
সাঈদ মার্কোস তেনোরিও সতর্ক করে লিখেছেন, যতদিন এই বয়ান তৈরির ক্ষমতা নির্দিষ্ট শক্তির হাতে কুক্ষিগত থাকবে, ততদিন ভাষা ব্যবহার হবে কেবল শাসন ও আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে। তাই জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের স্বার্থে এই চাপিয়ে দেওয়া শব্দভাণ্ডার ভেঙে ফেলা দরকার। কোনো জাতিকেই এমন কোনো তকমায় সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়, যা তাকে শাস্তি দেওয়ার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার হয়। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রথম লড়াই অস্ত্র দিয়ে নয়, শুরু হয় শব্দ দিয়ে।
ইনফোজা ডেস্ক