গত একমাসেরও বেশি সময় ধরে নয়া দিল্লিতে অবস্থান করছে ‘তেলাপোকারা’। একটার পর একটা প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি করছে তারা।
জেন-জি (Gen Z) তরুণদের নেতৃত্বে এই আন্দোলনে লাঠিচার্জ করছে পুলিশ। ছুঁড়া হচ্ছে টিয়ারগ্যাস। হিন্দু সংখ্যাগুরুবাদের প্রবক্তা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির টানা তৃতীয় মেয়াদের শাসনে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জনবিক্ষোভ। অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে বিক্ষোভ বা অসন্তোষের মুখে মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে দেখা যায়। কিন্তু ভারতে তেলাপোকাদের এই বিক্ষোভের মুখেও বহাল তবিয়েতেই আছেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরের শাসনে কাউকে বরখাস্ত করা হয়নি। পদত্যাগ বা বরখাস্তের ক্ষেত্রে মোদি সরকারের ইতিহাস কী? ঘুরে আসা যাক আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে

২০১৪ সালের গ্রীষ্মে মোদি ক্ষমতায় আসার এক বছর পর, উত্তরপ্রদেশের দাদরির ৫০ বছর বয়সী এক মুসলিম কামার, মোহাম্মদ আখলাককে বাড়ি থেকে টেনে বের করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। অভিযোগ ছিল, তিনি গরু চুরি করে তার রেফ্রিজারেটরে মাংস মজুত করেছিলেন। অধিকাংশ হিন্দুর কাছে গরু পবিত্র এবং ভারতের বেশিরভাগ রাজ্যে গোহত্যা নিষিদ্ধ।
২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে উত্তরপ্রদেশের শিল্প এলাকা দাদরির বিশাহড়া গ্রামে আখলাকের এই হত্যাকাণ্ড ছিল হিন্দু উগ্রবাদীদের হাতে গো-সংক্রান্ত গণপিটুনির প্রথম ঘটনা, যা পরবর্তীতে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের জন্ম দেয়।
তবে তখনকার সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রী মহেশ শর্মা—যার সংসদীয় আসন গৌতম বুদ্ধ নগরের অধীনেই দাদরি পড়ে—এই হত্যাকাণ্ডকে স্রেফ একটি ‘দুর্ঘটনা’ বলে অভিহিত করেন। এর প্রতিবাদে মুসলিম সংগঠন ও বিরোধী দলগুলো তার পদত্যাগের দাবি তোলে। কিন্তু তিনি পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানান এবং মোদির মন্ত্রিসভায় বহাল থাকেন।
এর এক বছর পর, আখলাক হত্যাকাণ্ডের ১৮ জন আসামির একজন রবি সিসোদিয়া কিডনি ও শ্বাসযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেলে মহেশ শর্মা বিশাহড়া গ্রামে তার পরিবারের সাথে দেখা করতে যান। সেখানে সিসোদিয়ার কফিনে ভারতের জাতীয় পতাকা জড়ানো অবস্থায় শর্মাকে মাথা নোয়াতে দেখা যায়। এই ছবি পুরো দেশকে হতবাক করে এবং তাকে বরখাস্তের দাবি আবার জোরালো হয়ে ওঠে।
একাধিক হাসপাতালের মালিক মহেশ শর্মাকে অবশেষে ২০১৯ সালে মোদি দ্বিতীয় মেয়াদে জয়ী হওয়ার পর মন্ত্রিসভায় নেননি। তবে তিনি এখনও বিজেপির তৃতীয় মেয়াদের একজন সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল আছেন।
আখলাককে পিটিয়ে হত্যার কয়েক মাস পর, ২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল রুম থেকে ২৬ বছর বয়সী এক গবেষক শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ভারতের সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীভুক্ত ছিলেন।
তার ঠিক এক মাস আগে, মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির অনুসারী ও উগ্র-ডানপন্থী মতাদর্শিক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সমর্থিত এক ছাত্রনেতাকে মারধরের অভিযোগে রোহিত চক্রবর্তী ভেমুলা এবং আরও চার শিক্ষার্থীকে হোস্টেল থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং তাদের মাসিক বৃত্তি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এই পাঁচ শিক্ষার্থীই ছিলেন দলিত সম্প্রদায়ের—যাদের পূর্বে ‘অস্পৃশ্য’ বলা হতো। ভারতের বর্ণপ্রথার সর্বনিম্নে অবস্থান করায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উচ্চবর্ণের বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে এই জনগোষ্ঠী।
ব্যক্তিগতভাবে বাসা ভাড়া নেওয়ার আর্থিক সামর্থ্য না থাকায়, ওই পাঁচ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেই একটি তাঁবু টানিয়ে অনশন শুরু করেন। তারা অভিযোগ তোলেন, তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি ও বান্দারু দত্তাত্রেয়ের একের পর এক চিঠির প্রভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের হোস্টেল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, তখন ভেমুলা তার এক বন্ধুর রুমে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তিনি একটি সুইসাইড নোট রেখে যান, যা দেশজুড়ে ছাত্রবিক্ষোভকে উসকে দেয় এবং ইরানি ও দত্তাত্রেয়ের পদত্যাগের দাবি তোলে। সাবেক টিভি অভিনেত্রী স্মৃতি ইরানি সংসদে ভেমুলার মৃত্যুর কারণ নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সাফাই গাওয়ার অভিযোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভের মুখে পড়েন। কিন্তু তারপরও দুইজন মন্ত্রীই মোদির মন্ত্রিসভায় বহাল থাকেন।
২০১৬ সালের জুলাইয়ে স্মৃতি ইরানিকে বস্ত্র মন্ত্রণালয়ে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং পরের বছর তাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে দত্তাত্রেয় শ্রমমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলেও, পরবর্তীতে ২০১৯ সালে হিমাচল প্রদেশ এবং ২০২১ সালে হরিয়ানা রাজ্যের রাজ্যপাল হিসেবে তাকে পুরস্কৃত করা হয়।
একইভাবে ২০২১ সালে, উত্তরপ্রদেশের লখিমপুর খেরিতে মোদি সরকারের বিতর্কিত কৃষি আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত কৃষকদের ওপর গাড়ি চালিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অজয় মিশ্র টেনির ছেলে আশিস মিশ্রের বিরুদ্ধে। এতে চারজন কৃষক ও একজন সাংবাদিক নিহত হন। পরবর্তী সহিংসতায় তিন বিজেপি কর্মী ও মিশ্রের এক গাড়ি চালক পিটুনিতে প্রাণ হারান।
এই ঘটনার পর টেনির পদত্যাগের বিশাল দাবি উঠলেও, ২০২৪ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত দীর্ঘ তিন বছর তিনি তার পদে বহাল ছিলেন।
জনগণের জবাবদিহিতার দাবিতে মোদি সরকারের কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগের একমাত্র ঘটনাটি দেখা গিয়েছিল করোনা মহামারির পরপরই।
২০২১ সালে যখন কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ে ভারত বিপর্যস্ত এবং সরকারের অব্যবস্থাপনা নিয়ে কড়া সমালোচনা চলছিল, তখনকার স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষ বর্ধন (যিনি নিজে একজন পেশাদার চিকিৎসক) পদত্যাগ করেন। এরপর ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি তাকে প্রার্থী না করায় তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন।

এখন কি তাহলে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করবেন? নাকি তাকে বরখাস্ত করা হবে?
এই প্রশ্নর সহজ জবাব কী হতে পারে?