বরফ ও যুদ্ধের পাহাড়, বুলেটের চেয়েও ভয়ানক প্রকৃতি

বিদেশফিচার1 month ago19 Views

পাহাড়টি আদতে যুদ্ধের পাহাড়। তবে স্থানীয়রা ডাকেন ‘বুনো গোলাপের ভূমি’। কারাকোরাম পর্বতমালায় সিয়াচেন হিমবাহ। ২০১৫ সালের মে মাসে এখানে হয়েছিলো পাক-ভারত ক্ষেপণাস্ত্রের লড়াই, ড্রোনের লড়াই। এরপর যুদ্ধবিরতি হয়। কিন্তু সিয়াচেনের বরফের চূড়া এখনো শান্ত হয়নি। এখনো এখানে সেনারা থাকে। আর প্রতিকূল আবহাওয়ার মুখে পরে বেঘোরে প্রাণ হারায়।

আল জাজিরায় প্রকাশ হওয়া সাংবাদিক আবিদ হোসাইন এর এক প্রতিবেদনে এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মানবিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক সংকটের চিত্র উঠে এসেছে

১৯৮৪ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাতের কারণে, প্রায় ৮,০০০ মিটার উচ্চতায় সিয়াচেনকে বিশ্বের সর্বোচ্চ যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ছবি: বেহলুল চেতিনকায়া, আনাদোলু এজেন্সি

বুলেটের চেয়েও ভয়ানক প্রকৃতি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮৪ সাল থেকে শুরু হওয়া এই লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত দুই দেশের ২,০০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তবে অবাক করার মতো তথ্য হলো, সিয়াচেনে নিহত সৈনিকদের মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ মারা গেছেন সরাসরি শত্রুর গুলিতে। বাকি ৯৭ শতাংশ মৃত্যুর কারণ মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, তুষারঝড়, অক্সিজেনের অভাব এবং ধেয়ে আসা হিমবাহ।

আবিদ হোসাইন ২০১৬ সালের এক ঘটনার উল্লেখ করেন। সে বছর সোনম পোস্টে তুষারধসের নিচে চাপা পড়েন ১০ ভারতীয় সৈনিক। পাঁচ দিন পর সেখান থেকে অলৌকিকভাবে ল্যান্স নায়েক হনুমানথাপ্পা কোপ্পাডকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। পুরো ভারত তখন প্রার্থনায় ছিল। কিন্তু তিন দিন পর তিনিও মারা যান। ২০১২ সালের আরেক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পাকিস্তানের গায়ারি সেক্টরে ১৩১ জন সেনা ও বেসামরিক মানুষ বরফের নিচে  চাপা পড়েন। প্রকৃতি এখানে পাকিস্তান আর ভারতকে আলাদা করে চেনে না। ছাড় দেয় না কোনো পক্ষকেই।

বিপুল আর্থিক ও পরিবেশগত ক্ষতি

এই যুদ্ধ টিকিয়ে রাখতে দুই দেশকেই বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। ২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, দুর্গম এই পাহাড়ে সেনা মোতায়েন রাখতে ভারতের বার্ষিক খরচ ছিল প্রায় ৫০ কোটি ডলার। পাকিস্তানের খরচ হতো ৫ থেকে ৬ কোটি ডলার। বর্তমান মূল্যস্ফীতিতে এই খরচের পরিমাণ আরো বেড়েছে। অথচ দুই দেশেই  কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে।

সেনাদের উপস্থিতিতে সিয়াচেনের পরিবেশও বিপন্ন হচ্ছে। প্রতিদিন সেখানে প্রায় ৯০০ কেজি মানববর্জ্য ফেলা হচ্ছে। গোলার্ধের বিষাক্ত ধাতু মিশছে পানিতে। এসব সিন্ধু নদের অববাহিকা দূষিত করছে। এমনকি গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে হিমবাহটিও হারিয়ে যেতে বসেছে।

মানচিত্রের ভুল এবং অধরা সমাধান

লড়াই শুরু হয়েছিলো ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ভুল থেকে। ১৯৪৯ সালে করাচি চুক্তিতে দুই দেশের সীমানা ‘এনজে ৯৮৪২’ পয়েন্ট পর্যন্ত নির্ধারণ করে বাকি অংশকে ‘উত্তরের হিমবাহের দিকে’ বলে অস্পষ্ট রেখে দেওয়া হয়। এই অস্পষ্টতার সুযোগেই ১৯৮৪ সালে ভারত ‘অপারেশন মেঘদূত’ পরিচালনা করে সিয়াচেনের গুরুত্বপূর্ণ গিরিপথগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর জবাবে পাকিস্তানও সেনা মোতায়েন করে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক দশকে অন্তত ১৩ বার দুই দেশের মধ্যে সিয়াচেন সংকট নিয়ে বৈঠক হয়েছে। ১৯৮৯ এবং ২০০৬ সালে দুই দেশ একদম চুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু ভারতের সামরিক ও রাজনৈতিক মহলের অনীহা এবং দুই দেশের মধ্যকার তীব্র অনাস্থার কারণে শেষ মুহূর্তে চুক্তিগুলো ভেস্তে যায়।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সিয়াচেন এখন এমন এক ‘অচল অবস্থা’ যেখানে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নেই। আবার ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও সম্মানের লড়াইয়ের কারণে কেউ পিছু হটতেও রাজি নয়। 

-ইনফোজা ডেস্ক

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...