
প্রতি মাসে সরকারি বেতন পান ৪৫ হাজার টাকা। কিন্তু জীবনযাপন শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতিদের মতো। সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে উঠেছে দুর্নীতি, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রলীগ করতেন।
বিপরীত জীবনযাপন
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাকরিজীবনের মাত্র কয়েক বছরে জাকির হোসেন নিজের জেলা টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের ১ বিঘা জমি, ছয়তলা আলিশান বাড়ি এবং একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি গড়েছেন। এছাড়া শ্বশুরবাড়ি এলাকায় ৩ একর জমিতে মাছের ঘের এবং স্ত্রী ও শ্বশুর-শাশুড়ির নামে কয়েক একর জমি কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ২,৫০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটে বসবাস করা এই কর্মকর্তার মিরপুরেও নির্মাণাধীন রয়েছে সাততলা ভবন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, জাকির ও তার স্ত্রী মনিরা সুলতানার ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১২ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য রয়েছে।
প্রশাসনিক জালিয়াতি ও ক্ষমতার দাপট
জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ- দলিল রেজিস্ট্রির সময় জমির শ্রেণী পরিবর্তন করে সরকারকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত করা। অভিযোগ আছে, উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সাভারের বিলামালিয়া ও বড়বরদেশী মৌজার জমি মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে গোপনে রেজিস্ট্রি করছেন তিনি। এমনকি পে-অর্ডার জালিয়াতি ও ভুয়া দাতা সাজিয়ে দলিল করার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে ‘ভোল পাল্টে’ ভিন্ন মতাদর্শের অনুসারী দাবি করলেও, দপ্তরে তার সিন্ডিকেট বাণিজ্য আগের মতোই সক্রিয়। দম্ভোক্তি করে তিনি বলেন, “৫ কোটি টাকা দিয়ে সাভারে বদলি হয়ে এসেছি, কেউ কিছু করতে পারবে না।” এমনকি চাহিদামতো টাকা না দিলে দলিল লেখকদের লাইসেন্স বাতিলের হুমকিও দেন তিনি।
আইজিআর দপ্তরের ‘প্রভাব’ ও সিন্ডিকেট
সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি হয়ে আসার পর ‘আপেল’ নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিবন্ধন পরিদর্শক জেনারেলের (আইজিআর) দপ্তরের প্রভাব খাটিয়ে আপেল ও জাকির হোসেন মিলে প্রতিটি দলিলের ক্ষেত্রে নিয়ম-বহির্ভূতভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও তাদের দাপটে তটস্থ।
ধরাছোঁয়ার বাইরে
কর্মকর্তাদের দাবি, প্রতিদিন অফিস শেষে জাকির হোসেন ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়ে বাসায় ফেরেন। এমনকি অফিস চলাকালীন মাদক সেবন ও সহকর্মীদের সাথে অসদাচরণের অভিযোগ তুলে তার ডোপ টেস্টের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে গণমাধ্যম কর্মীরা জানতে চাইলে সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেন ও তার সহযোগী আপেল সদুত্তর দিতে পারেননি। সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়ে ‘পিঠের চামড়া তুলে নেওয়া’র মতো হুমকি দেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর ও আইন মন্ত্রণালয়ে একাধিক অভিযোগ জমা পড়লেও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে তদন্ত থমকে আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দ্রুত স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে এই কর্মকর্তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।-সাভার প্রতিনিধি