বিএনপি যেভাবে বড় করে তুলেছে জামায়াতকে

বিশ্লেষণ4 months ago61 Views

শুরুর দিকে অতোটা আশা করেনি জামায়াত। তখন বিরোধীদলে নিজেদের অবস্থান সংহত করতে মরিয়া ছিলো দলটি। কিন্তু এখন ভোটের মাঠে লড়াই করে যাচ্ছে সরকার গঠনের টার্গেট নিয়ে। জামায়াত কেন টার্গেট বদল করলো?

এর পেছনে মূলত দায়ী করা হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ব্যর্থতাকে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতের আগাম পরিকল্পনা ও কল্যাণমুখী কিছু কাজের মাধ্যমে বিএনপির সাথে ব্যবধান অনেকটাই কমিয়ে আনতে পেরেছে দলটি। এখন বলা হচ্ছে, ইসলামী ও সমমনা দলগুলোর সাথে জোট করে নির্বাচন করলে হাড্ডাহাড্ডি লড়তে হবে বিএনপিমুখী শিবিরকে।

ডাকসুসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রসংসদের নির্বাচনের পর থেকে এই সম্ভাবনা আরো ঘন হয়ে উঠেছে। কমতে শুরু করেছে বিএনপির আত্মবিশ্বাস। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই দলটির অবস্থানে ধস নামিয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

শেখ হাসিনার সময় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন দুই দলের নেতাকর্মীরাই। তবে নতুন বাংলাদেশে অনেকটা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে দেখা গেছে বিএনপিকে। স্পষ্ট হয়ে উঠে দলটির অনেক নেতাকর্মীর ভারতমুখীতা। এতে ‘নয়া ভারতপন্থী’ হিসেবে তকমার শিকার হতে হয় দলটিকে।

অন্যদিকে ‘রাজাকার’ তকমা নিয়ে দীর্ঘদিন বঞ্চনায় থাকা জামায়াত ঘুরে দাঁড়িয়েছে চব্বিশের পর। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগেই নিষিদ্ধ করা হয় দলটিকে। এর আগেই বেশ কয়েকবার নিষিদ্ধ ও নির্যাতনের ধকল সামলাতে হয়েছে জামায়াতকে। বাংলাদেশ অধ্যায়ের শুরুতেই হোঁচট খেতে হয় জামায়াতকে।

১৯৭১ সালে ভারতীয় আধিপত্যবাদের শঙ্কায় খোলাখুলিভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করে জামায়াতে ইসলামী। ভারতের সহযোগিতা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া ঠিক নয় বলে মনে করেছিলেন অধ্যাপক গোলাম আজম। যুদ্ধাপরাধের নামে প্রহসনের বিচারের মুখোমুখি হয়ে কারাগারে যাওয়ার আগে এক বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, ‘ভারতের সাহায্য না নিয়ে যদি স্বাধীনতা যুদ্ধ করা হতো, তাহলে আমরা অবশ্যই সে যুদ্ধে যোগদান করতাম।’

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়ে যায় জামায়াত। পরে ১৯৭৬ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। তখন কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল মিলে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ বা আই.ডি.এল নামে দাঁড় করানো হয় রাজনৈতিক প্লাটফর্ম। জামায়াতে ইসলামী আই.ডি.এল এর ব্যানার থেকে নির্বাচন করে ছয়টি আসন পায়।

১৯৭৯ সালে ঢাকায় এক সম্মেলনের মাধ্যমে ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ গঠন হয়। সেখানে অধ্যাপক গোলাম আজমকে আমির করে আব্বাস আলী খানকে ভারপ্রাপ্ত আমির ঘোষণা করা হয়।

ওই বছর থেকে প্রকাশ্যে কাজ করতে থাকে জামায়াত। পরে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখে দলটি। ওইসময় কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিলেন ভারপ্রাপ্ত আমির আব্বাস আলী খান।

এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসন পায়। পরে সরকার গঠনের জন্য সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপিকে সমর্থন দেয়। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করে জামায়াত। ওই নির্বাচনে তিনটি সংসদীয় আসন পায় দলটি। ২০০১ সালের অষ্টম জতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট হয়। নির্বাচনে অংশ নিয়ে ১৭ আসন পায় জামায়াত। সেইসাথে তখনকার আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদকে মন্ত্রীত্ব দেওয়া হয়।

২০০৮ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোটে জামায়াতে ইসলামী অংশগ্রহণ করে দুইটি আসন পায়। এই নির্বাচন এবং এক এগারোর প্রেক্ষাপটের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের সূচনা হয় বাংলাদেশে। সরকারের ফ্যাসিবাদি আচরণের অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশন থেকে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করা হয় ২০১৩ সালে। এতে নির্বাচনের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হয় দলটিকে।

পরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের নামে প্রহসনের মাধ্যমে দলটির ওপর নেমে আসে খড়গ। এতে ফাঁসি হয় শীর্ষনেতাদের অনেকের। এই বিচারকে কেন্দ্র করে শাহবাগ থেকে উত্থান হয় ভারতপন্থীদের। পরে জামায়াতে ইসলামী ও এর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের ওপর শুরু হয় দমন-পীড়ন। শিবির ও জামায়াত ট্যাগ ব্যবহার করে বৈধতা দেওয়া হয় মানুষ হত্যা।

এতে বাংলাদেশ তলিয়ে যায় অন্ধকারের গভীরে। আগস্টের পাঁচ তারিখ থেকে কেটে যেতে শুরু করেছে সেই অন্ধকার।

জুলাই-আগস্টের লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলো বিএনপি ও জামায়াতসহ ফ্যাসিবাদ-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। এই আন্দোলনের পেছনে জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের বড় ভূমিকা ছিলো বলে মনে করা হয়।

বিপ্লব সফল হওয়ার পর বাধাহীন কাজ করার সুযোগ পায় জামায়াতে ইসলামী। এতে এই দলটির নেতা-কর্মীদের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গণমাধ্যম।

নতুন স্বপ্নের কথা সামনে নিয়ে আসেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। দলের এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে বিএনপির নাম উল্লেখ না করে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বলেন তিনি। এরপর বড় দুই-দলের মধ্যে শুরু হয় কাঁদা ছুঁড়াছুঁড়ি।

জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব প্রকট হয়ে উঠে মূলত ২০২২ সালে। ওই বছর বিশ-দলীয় জোট ভেঙে দেয় বিএনপি। পরে জোটে থাকা অন্য দলগুলোকে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলন করলেও জামায়াতের সঙ্গে প্রকাশ্য সম্পর্ক দেখায়নি বিএনপি।

সেই অভিমান থেকেই সুদিনে বিএনপিকে ছাড়াই একা চলতে শুরু করে জামায়াত। অন্যদিকে বিএনপি নেয় জামায়াত-বিরোধীতার নীতি। নতুন করে তুলে আনা হয় শেখ হাসিনার ফেলে যাওয়া স্লোগান। এতে সমালোচনার মুখে পড়ে দলটি। ভারত ও আওয়ামী লীগকে নিয়ে ইতিবাচকভাবে সরব হয়ে উঠতে দেখা যায় বিএনপির অনেক নেতাকে। এসব বিতর্কই ভোটের মাঠে খোদ বিএনপিই জামায়াতকে বড় করে তুলেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

তারা মনে করেন, জামায়াতের সফলতা নয় বরং বিএনপির ব্যর্থতাই অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে জামায়াতকে। সেইসাথে বিএনপি নেতাকর্মীদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসও কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে দলটির জন্য। অন্যদিকে বিএনপির এই দুর্বলতায় বিরোধীদলে যাওয়ার টার্গেট বদলে ফেলেছে জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলো। আগামী নির্বাচনে সরকার গঠনের আশা নিয়েই মাঠ গরম রাখছে তারা।

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...