সাদা পালকের মতো মেয়েটা

বই9 months ago114 Views

বারবণিতাদের গল্প। সংগ্রহ, ভূমিকা ও সম্পাদনা : মনি হায়দার। ইলাস্ট্রেশনটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি।

শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

মেয়েটা দেখতে সাদা পালকের মতো। সাদার ওপর নীল প্রলেপ। হঠাৎ এসে দাঁড়ালো। সড়ক ছেড়ে নেমে এলো লেকের পাশে।
আমি ছিলাম ওখানে। একটু দূরে। পালকের মতো শান্ত মেয়েটাকে খেয়াল করলাম। সম্ভবত গায়ে বাতাস নিতে এসেছে।
লেকের জলে তোলপাড় বাতাস, কয়েকটা গাছ নুই-নুই করছে। অন্ধকার ফুঁড়ে জ্বলছে সড়কবাতি। মেয়েটা বাতির কাছাকাছি, আমি অন্ধকারে। দু’জন-ই বাতাস নিচ্ছি।
আমি মন দিলাম লেকের জলে। মেয়েটাকে ভুলে গেলাম। বাতাস কমলো। মেঘ স্থির হলো। এবং ফোঁটায় ফোঁটায় নামতেও শুরু করলো। আমি ফিরতে চাইলাম।
কিন্তু আবারও সেই মেয়ে। এখনও যায়নি। দাঁড়িয়ে, ঠিক ওখানটাতেই। অবাক হলাম। সেইসঙ্গে বিব্রতও।
কাছেপিঠে কেউ নেই, বৃষ্টির তাড়া খেয়ে চলে গেছে। আমিও যাচ্ছি। কিন্তু ওই মেয়ে যাচ্ছে না!
সম্ভবত বৃষ্টিবিলাস করবে। তা করুকগে। আমি পা বাড়িয়েছি সড়কের দিকে। তাকে পাশ কাটিয়েই যেতে হবে। কিন্তু ওখানে ঘটলো বিপত্তি।
নরম এবং ‘পবিত্র’ মেয়েটা আমার দিকে ঝুঁকে এলো। ভাবলাম, কিছু একটা জানতে চাইবে। মুখে হাসি টেনে তাকে সম্মান জানালাম। এমন বালিকাদের ব্যক্তিত্ব উঁচু থাকে। এদের অকাতরে শ্রদ্ধা করা যায়।
বালিকা কিছু একটা বললো। স্পষ্ট শুনতে না পেলেও অর্থ ধরতে পেলাম। এবং নিজেকে বোকা মনে হলো। ভেতর থেকে কুঁকড়ে গেলেও বাইরে থেকে হাসি ধরে রাখলাম। জবাবে বললাম- না, ধন্যবাদ আপনাকে।
মেয়েটা হাসলো। বিব্রতও হলো। আমি পাশ কাটিয়ে গেলাম। পেছন থেকে শেষবার চেষ্টা করলো। বললো- নিরাপদ রুম আছে।
এবার আমার কান ভুল করেনি। তাহলে কি চোখ ভুল করেছে?
এতোদিন ধারণা ছিলো, আমি যা দেখেছি এর সব ভুল। আলো, অন্ধকার ও বাতাসের ধাঁধায় উগ্র শরীরকেও মনে হয়েছে কোমল। কড়া লিপস্টিক, বুনো পোশাক আমার চোখে ধরা দিয়েছে শুভ্র এবং নীল হয়ে।
কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে, আমার ওই ‘ধারণা’-ই ছিলো ভুল। আর সেই ভুল ভেঙে দিয়েছে জাহানারা।
জাহানারা, একজন বারবণিতা। থাকে বারবণিতাদের পাড়ায়। পাড়ার নাম কি, সেটা জানাননি মনি হায়াদার। তার মাধ্যমেই আমি জাহানারাকে চিনেছি।
মনি হায়দার একজন লেখক। গল্প লেখেন। ঠিক করলেন বারবণিতাদের নিয়ে গল্প সংকলন করবেন। এর জন্য গল্প পড়া শুরু করলেন। কয়েক বছর ধরে পড়লেন। জমা রাখলেন। এবং বই প্রকাশের জন্য প্রস্তুত হলেন।
কিন্তু বইতে সংকলকের একটা ভূমিকা চাই। সেটা লিখতে হলে চাই বারবণিতাদের সঙ্গে সরাসরি আলাপ। যোগাযোগ করলেন এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে। তিনি মনি হায়দারকে নিয়ে গেলেন ‘পাড়ায়’। সেখানেই তার জাহানারার সঙ্গে দেখা। আর সেই দেখার অভিজ্ঞতা যখন বইয়ের পাতায় এলো, তখন জাহানারাকে আমিও চিনলাম।
বইয়ের নাম ‘বারবণিতাদের গল্প’। এখানে অসংখ্য বারবণিতাদের সঙ্গে ছোট্ট এক জাহানারার গল্পও আছে। যার সঙ্গে সাদা পালকের মতো দেখতে ওই মেয়েটা মিলে যায়।
জাহানারা আমাকে বিশ্বাস করাতে বাধ্য করেছে, চোখের দেখাতেই শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে হয় যে নারীকে, সেও বারবণিতা হতে পারে।
মনি হায়দারের ভূমিকা পড়ছিলাম, আর বাস্তবকে অবিশ্বাস করছিলাম-
জাহানারা (পাড়ার বেশ্যা) কী করে প্রমিত ভাষায় কথা বলে!
জাহানারা (পাড়ার বেশ্যা) কী করে দার্শনিকের মতো ভাবে!
শেষ দিকে এসে ভাবনাগুলো উল্টোদিকে মোড় নিলো, যখন জাহানারা নিজের গল্প বলতে শুরু করলো।
হ্যাঁ, জাহানারা ছিলো স্বচ্ছল পরিবারের মেয়ে, পড়াশুনা জানা। বাবার অঢেল সম্পদ ছিলো। কিন্তু বাবা মারা যান। মা বিয়ে করেন অন্য পুরুষকে। নতুন বাবা জাহানারাকে সহ্য করতে চাইতো না। সেই সংসারে মায়েরও মৃত্যু হয়। জাহানারা ঘর ছাড়ে। খালার বাড়িতে মাথা গুঁজে। বোনের মেয়ের কদর ছিলো সেখানে। কিন্তু এক রাতে সব পাল্টে যায়। মধ্যরাতে তার বিছানায় আসেন খালু। জাহানারা রক্তাক্ত হয়। এর পর প্রায় প্রতি রাতেই আসতে থাকেন তিনি। এক রাতে খালার কাছে হাতেনাতে ধরাও পড়েন।
তারপর খালুকে জুতাপেটা করেন খালা। আর জাহানারাকে ঘর থেকে বের করে দেন। মধ্যরাতে বের হয়ে সে সড়কের পাশে দাঁড়ায়। সড়কটা ছিলো ঢাকা শহরের অভিজাত এলাকায়। জাহানারার সামনে একটা গাড়ি থামে। জিজ্ঞেস করে, যাবে?
যাব, জাহানারা ঘাড় কাত করে।
কত নেবে?
পাঁচ হাজার।
পাঁচ হাজার! আঁতকে ওঠে লোকটি। জাহানারার দিকে ভালো করে তাকায়, দেখে পছন্দ হয়। বলে- ঠিক আছে, গাড়িতে ওঠো।
সেই যে ‘গাড়ি’তে উঠলো, এখনো নামতে পারেনি।
জাহানারার ‘গাড়িতে ওঠা’র গল্প যদি এমন হতে পারে, তবে সাদাবালিকা বিষয়ে আমার চোখকে অবিশ্বাস করার কিছু থাকে না। ওই বালিকাও দাঁড়িয়েছিলো রাজধানীর অভিজাত সড়কের পাশে। হয়তো জাহানারার মতো কোনো রাতেই পথে নেমেছিলো। এখন পুরোদস্তুর বারবণিতা।
আর এই বারবণিতাদের নিয়েই আগ্রহ দেখিয়েছেন মনি হায়দার। দুঃসাহসিক আগ্রহ। সংগ্রহ করেছেন পঞ্চাশটি গল্প। সেই শরৎচন্দ্র থেকে শুরু করে তুলে এনেছেন হাল আমলের কলম। কালিতে আঁকা কিছু কঠিন বাস্তব। সময়ে সময়ে বাস্তবতা পাল্টায়। তবে জীবন থেকে যায় এক-ইরকম। আলোঝলমল খোলসের ভেতর তরল কান্না।
শরৎচন্দ্রের গল্পের নায়ক জমিদারপুত্র সত্য। নায়িকা বিজলী। ¯œানের ঘাটে দেখা। চোখাচুখি। প্রেম। বিজলী আদতে বারবণিতা। একদিন সত্যকে বাড়িতে ডেকে খোলস ছাড়ে বিজলী। সত্য পাথরের মতো কঠিন হয়। আকাশে বিজলী চমকায়। সত্য মুখ ফেরায়। বিজলীর কাছে ফিরে যায় না। বিজলীরা প্রেমের জোরে পেশা ছেড়ে দিলেও সত্যদের অভিমান ভাঙে না।
আর জলবেশ্যারা?
হ্যাঁ, আল মাহমুদের জলবেশ্যা ছলনার ফাঁদ। নদীর অন্ধকার চোখের মতো জ্বলে উঠে আবিদ বেপারির ডাকে। মায়াবী ডাক এড়ানো যায় না। এ যে গঙ্গাদেবীর ডাক। মেঘনাদেবীর মোহ। নৌকার ভেতর ‘দেবী’রা হয়ে উঠে ‘বেউলা সুন্দরী’।
বেউলা সুন্দরী খলখল হাসে। নিগূঢ় হাসি সংক্রমিত হয় বেপারির ঠোঁটে। পিতলের তস্তরিতে খুশ্বাই জর্দার পান এগিয়ে দেয়। পান খেয়ে বেপারি উতলা হয়। বেউলা সুন্দরী সাপের ঠোকর বসায়।
তারপর বেপারির কোমর থেকে টাকার খুতি বের করে। লগির বাঁধন খুলে নাও ভাসায়।
অথচ হুমায়ূন আহমেদের মনোয়ারা ছলনার ধার ধারে না। ডেরায় অবশ স্বামী কুদ্দুস মিয়া, অবুঝ ছেলে মজিদ। খিদেয় এরা অস্থির হয়। মনোয়ারার হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনোয়ারা রাতে হাজির হয় নওশার মতো এক লোক নিয়ে। কুদ্দুসের দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত গলায় বলে, আফনে মজিদরে লইয়া একটু ঘুইরা আহেন। কুদ্দুস মজিদকে কোলে তুলে নেয়। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে মনোয়ারা।
বারবণিতাদের মাথা নিচু করেই থাকতে হয়। তবে সবার নয়। হাল আমলে যারা কর্পোরেট বারবণিতা, তাদের মাথা উঁচু রেখেই চলা নিয়ম।
ম্যারিনা নাসরিনের গল্পে দুই রকমের বারবণিতা আছে। একরকম ‘ভাসমান পতিতা’। অন্যরকম ‘কর্পোরেট বারবণিতা’।
ভাসমান পতিতা কমলা। হিন্দু পোলাকে বিয়ে করে ঢাকায় বস্তিতে উঠে। একদিন সেই পোলা তাকে ইংলিশ রোডে বিক্রি করে দেয়। কমলা টাকার জন্য বারবণিতা।
আর কর্পোরেট বারবণিতা হয় শখের জন্য। এরা শখের মোহে যায় আধুনিক খুপড়িতে। গায়ে পশ্চিমা পোশাক। হাতে স্বচ্ছ কাচের গ্যাস। রঙিন পানীয়। বরফের টুকরো। ঢুলুঢুলু চোখ। সঙ্গে আদিমতা। কেউ যায় শখে। কেউ টাকা আয় করতে।
হ্যাঁ, ওখানেও শরীরের ব্যবসা চলে। কয়েক ঘণ্টার দর কম করে হলেও দশহাজার টাকা। কম সময়ে বেশি আয়। সুবোধ পরিবারের অনেক মেয়েও এই আবেদন হাতছাড়া করতে চায় না। এরা বনে যায় কর্পোরেট বারবণিতা।
আচ্ছা, সাদা পালকের মতো মেয়েটা কি কর্পোরেট ছিলো, নাকি স্রেফ ভাসমান?

Leave a reply

    Join Us
    • Facebook
    • Youtube
    Deal Of The Month
      Categories

      Advertisement

      Loading Next Post...
      Follow
      Search Trending
      Popular Now
      Loading

      Signing-in 3 seconds...

      Signing-up 3 seconds...