বিশ্বকাপে আমি কার ! সরস রচনা

অনেক বছর পরপর পৃথিবীতে কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। ধূমকেতু আসে, সূর্যগ্রহণ হয়, রাজনৈতিক নেতারা জনগণের কথা মনে করে। আর ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হয়। বিশ্বকাপ নিয়ে সরস রচনা লিখেছেন মো. ইয়াছিন আরাফাত রাফি

বিশ্বকাপে আমি যে কার সেটা ঠাওর করতে পারি না আমি। ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

পৃথিবীর যে প্রান্তেই ভ্যেনু হোক বিশ্বকাপ শুরু হয় বাংলাদেশ থেকে। প্রায় দুইভাগে ভাগ হয়ে যায় বাংলাদেশের জনতা। একভাগ ব্রাজিল, আরেকটা আর্জেন্টিনা। উন্নত রুচির দাবিদার কেউ কেউ আবার জার্মানির সাপোর্ট করেন। কেউ ফ্রান্স, পর্তুগাল।

এসব গাল-গল্পে আমি নেই। বিশ্বকাপে আমি যে কার সেটা ঠাওর করতে পারি না আমি। কথা শুনে অনেকেই অবাক হয়। কেউ কেউ সন্দেহ করে, যেন আমি নিজের নাম লিখতে গিয়েই ভুল করে ফেলেছি! 

তুমি ব্রাজিল না আর্জেন্টিনা? প্রশ্নটা এমনভাবে করা হয়, যেন পৃথিবীতে আর কোনো সম্ভাবনা নেই, আর কোন অপশন নেই। আমি বলি, কোনোটাই না। তখন তারা এমন মুখ করে, যেন আমি এখনো ভাত খেতে শিখিনি।

সত্যি কথা হলো, আমি ফুটবলের তেমন কিছু জানি না। কোনো দলের পাঁচজন খেলোয়াড়ের নামও ঠিকমতো বলতে পারব না। অফসাইড- অনসাইড খায় না, মাথায় দেয় সেটাও জানা নেই। 

আমার জানা নেই, তবে অন্যদের জানা আছে। চারপাশের লোকেরা দেখি সবকিছু জানে। খেলোয়াড়দের ফর্ম নিয়ে হই-রই বাঁধিয়ে দেয়। কোন কোচ ভালো, কোনটা মাঝারি এসব কঠিন কঠিন বিষয় নিয়ে আলাপ করে। মিডফিল্ড, রক্ষণভাগ নিয়ে মাঠকেও ভাগাভাগি করে ফেলে।

আমি বেচারা….!

সভ্যতার বাইরে কোনো দ্বীপ থেকে সদ্য উদ্ধার হয়ে এসেছি।

সেই দিন থেকেই আমি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রাজিল সমর্থক। অন্যদের চোখে। আমার নিজের চোখে অবশ্য বিষয়টা এত সহজ ছিল না। কারণ ব্রাজিল দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে আমি শুধু নেইমারের নাম জানতাম। 

ম্যাচ চলাকালে কেউ যদি জিজ্ঞেস করত,

-ওই যে বল পেল, ও কে?

আমি বলতাম, 

-নেইমার না হলে নেইমারের পরিচিত কেউ। 

একজন মানুষ সারা জীবন বাংলাদেশের বাইরে কোথাও যায়নি। পর্তুগিজ ভাষার একটি শব্দও জানে না। কিন্তু পর্তুগাল গোল দিলে সে এমনভাবে লাফিয়ে ওঠে, যেন লিসবনের কোনো হাসপাতালে তার জন্ম হয়েছিল। আর তার পাশের সিটেই জন্ম হয়েছিলো রোনালদোর।

আমাদের বাসার পাশে এক চাচাকে দেখেছিলাম ব্রাজিলের পতাকা টানাতে। পতাকার আকার এতো বড় ছিল যে, দূর থেকে মনে হচ্ছিল নেইমার সম্ভবত আমাদের ইউনিয়ন পরিষদের নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। আবার একজন বিশ ফুটের পতাকা টানালে আরেকজন পঁচিশ ফুটের পতাকা টানায়। তৃতীয়জন ত্রিশ ফুট। শেষ পর্যন্ত মনে হয়, তারা ফুটবল সমর্থন করছে না; বাঁশের দৈর্ঘ্য নিয়ে গবেষণা করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবস্থা আরও ভয়াবহ। যারা সারা বছর বিড়ালের ছবি পোস্ট করে, তারাও বিশ্বকাপ এলেই আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিশ্লেষক হয়ে যান। ম্যাচের আগে দীর্ঘ স্ট্যাটাস। ম্যাচ চলাকালে লাইভ আপডেট। ম্যাচ শেষে বিশ্লেষণ। পরদিন আবার ভবিষ্যদ্বাণী।

একবার বন্ধুর দেয়া সেই ব্রাজিলের জার্সি পরে আর্জেন্টিনার খেলা দেখছি। হঠাৎ সবাই একসঙ্গে চিৎকার শুরু করল। আমি পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই লাফিয়ে উঠে চেঁচিয়ে বললাম, গোওওওওওল! সবাই আনন্দে আত্মহারা। আমিও আত্মহারা। পাঁচ সেকেন্ড পরে বুঝলাম গোলটা দিয়েছে মেসি। তবে ততক্ষণে আমার উল্লাস ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে।

বিশ্বকাপ আমাকে একটা জিনিস শিখিয়েছে। অনেক সময় জ্ঞানের চেয়ে আবেগ দ্রুত কাজ করে। এ কারণেই সম্ভবত আমি ফুটবল না বুঝেও বিশ্বকাপ উপভোগ করি। আমি খেলা দেখি। মানুষ দেখি। তর্ক দেখি। বন্ধুত্ব ভাঙতে দেখি। আবার খেলা শেষে সেই বন্ধুদের একসঙ্গে চা খেতেও দেখি। বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর দিক সম্ভবত এটাই। এটি মানুষকে সাময়িকভাবে শিশু বানিয়ে দেয়। একটি গোলের জন্য মানুষ লাফিয়ে ওঠে। একটি মিসের জন্য মাথায় হাত দেয়। একটি হারের জন্য মন খারাপ করে। একটি জয়ের জন্য রাতভর আনন্দ করে। যে পৃথিবীতে প্রতিদিন যুদ্ধ, সংকট, উদ্বেগ আর ব্যস্ততা বাড়ছে, সেখানে কয়েক সপ্তাহের জন্য কোটি কোটি মানুষ একই বলের পেছনে দৌড়ানো কয়েকজন মানুষকে দেখে আনন্দ খুঁজে পায়। এটাও কম বিস্ময়ের নয়।

এখনো যখন কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি আসলে কোন দলের? আমি স্পষ্ট উত্তর দিতে পারি না। আমার আলমারিতে ব্রাজিলের জার্সি আছে। মেসির গোলে আমি চিৎকার করি। রোনালদোর ভিডিওতে হাততালি দিই। ফাইনালে ভালো খেললে যে কাউকে সমর্থন করি। আর ম্যাচ শেষে বিজয়ী দলের সমর্থক সেজে ছবি তুলতেও আপত্তি নেই। তাই বিশ্বকাপ এলে আমার পরিচয় খুব সহজ। 

আমি ব্রাজিলের জার্সি পরা, মেসির গোলে চিৎকার করা, ফুটবলের নিয়ম পুরোপুরি না বোঝা, এবং ম্যাচ শেষে বিজয়ী দলের আজীবন সমর্থক দাবি করা এক নিরপেক্ষ দর্শক। আর হয়তো এ কারণেই বিশ্বকাপকে আমি অন্যদের চেয়ে একটু বেশি উপভোগ করি। কারণ আমার কোনো দল হারলে হৃদয় ভাঙে না। কোনো দল জিতলে অহংকার বাড়ে না। আমি শুধু বসে বসে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসবটা দেখি।

Leave a reply

Join Us
  • Facebook
  • Youtube
Categories

Advertisement

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...