হাদির মৃত্যুর খবর, একজন জুমা এবং অনেক গল্প

শরিফ ওসমান হাদিকে নিয়ে আলাপ যখন চলছিলো, তখন তিনি মহান আল্লাহর কাছে চলে গেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিওন।

ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর পাওয়ার আগে তৈরি করা আলাপটুকু নিচে দেওয়া হলো-

অবাক না হয়ে আর টিকে থাকা যাচ্ছে না! গুজবের শক্তি আছে। কিন্তু এতোটা শক্তি, সেটা কল্পনার বাইরে ছিলো।
এখন অনেক ভালো ভালো মানুষকেও দেখছি, তারা গুজব বিশ্বাস করছেন এবং পবিত্র দায়িত্ব মনে করে গুজব প্রচার করছেন।
আপনারা হয়তো বলবেন, ভালো মানুষ গুজব প্রচার করতে পারে না। যারা গুজব ছড়ায় তারা অবশ্যই বাজে মানুষ।
হ্যাঁ, এটা ঠিক। কিন্তু গুজবে ভর করা ভালো মানুষদের ব্যক্তিত্ত্বও যে ধীরে ধীরে হালকা হতে থাকে, এবং জেদের বশে একটা সময় ওই ভালো মানুষটাও পরিণত হতে পারে বাজে মানুষে. আলাপের শেষের দিকে এই বিষয়টা সহজ করে বলবো।

তার আগে চলুন ঘুরে আসি জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কীভাবে বিকৃত করে ছড়ালো প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলো।
বিজয় দিবসের এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গ টেনে কিছু কথা বলেছিলেন ডা. শফিক।
দর্শক, আপনারা ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের কথা মনে করার চেষ্টা করুন। তখন নির্বাচনী প্রচারের মাইকিংয়ে কী বলেছিলো আওয়ামী লীগ?
তখন মাইকিং করে ওরা বলেছিলো- ‘ভুল-ত্রুটি ক্ষমা চাই, নৌকা মার্কায় ভোট চাই’।
সেই প্রসঙ্গ টেনে, জামায়াত আমির বলেছিলেন, ৯৬ সালের ক্ষমতায় আসার আগে হাত জোড় করে তারা জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েছে।’
তারপর আওয়ামী লীগের ভাষা কোট করে তিনি বলেছেন, ‘অতীতে আমাদের দল বাংলাদেশের মানুষের সাথে যে অন্যায় আচরণ করেছে, যে জুলুম করেছে, আমরা বিনা শর্তে মাফ চাই। একটিবারের জন্য আমাদেরকে ক্ষমতায় নিন। আমরা ভালো হয়ে গেছি। এখন দেশের জন্য ভালো কিছু করতে চাই।’
পরে আওয়ামী লীগ বিষয়ে ডা. শফিক বলেন, ‘হাতে তসবি ছিল। মাথায় ঘোমটা ছিল। (মানুষ) সহজ সরলভাবে ধারণা করেছিল তাদের মানসিকতা পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তা না, যখনই তারা মসনদে বসলেন তারা আপন রূপে আত্মপ্রকাশ করলেন।’
এই বক্তব্যকে বিকৃত করে প্রকাশ করে দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি গণমাধ্যম। এর মধ্যে রয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ডিবিসি টেলিভিশন এবং দেশ টিভি।
ফ্যাক্ট চেক প্রতিষ্ঠান ‘দ্য ডিসেন্ট’ জানিয়েছে, জামায়াত আমিরের বক্তব্যর একটা অংশ বেছে নিয়ে ‘দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’ পত্রিকা শিরোনাম করেছে, ‘আমরা ভালো হয়ে গেছি, এখন দেশের জন্য ভালো কিছু করতে চাই: নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে জামায়াত আমির’।
পত্রিকাটি এই ঘটনায় একটি প্রতিবেদনের পাশাপাশি তাদের ফেসবুক পেইজে ভিডিও এবং একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করেছে। সবখানেই উদ্ধৃতিটিকে বিকৃত করে প্রকাশ করেছে।
পরে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা শুরু হলে সবগুলো প্রতিবেদন ও পোস্ট সরিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছে পত্রিকাটি।
এই ঘটনায় বিভ্রান্তিকর শিরোনাম করেছে বিডিনিউজ এভাবে, ‘আমরা ভালো হয়ে গেছি: জামায়াতের আমির’।
পরে বিডিনিউজ প্রতিবেদনটির শিরোনাম ও ফেসবুকের ফটোকার্ড সংশোধন করলেও দুঃখ প্রকাশ করেনি।
ডিবিসি টিভি এই বিভ্রান্তিকর শিরোনাম করেছে, ‘বিনা শর্তে মাফ চাই, আমরা ভালো হয়ে গেছি।’ ডিবিসি পরে সংশোধন ও দুঃখ প্রকাশ করেছে।
এছাড়া দেশ টিভি একইরকম শিরোনাম করে। পরে দুঃখ প্রকাশ ছাড়াই সংশোধন করেছে।

দর্শক,
এবার বুঝুন, গণমাধ্যমগুলোর এই অবস্থা হলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হবে?
কিছু কিছু ক্ষেত্রে গুজব উৎপাদন করছে গণমাধ্যমগুলো। আর কিছু ক্ষেত্রে এসব আসছে রাজনৈতিক প্লাটফর্ম থেকে।
আগে গুজব ছড়াতো সিআরআই এর মতো আওয়ামী গুজবের কারখানা থেকে। এখন দেখছি ওই সময় গুজবের শিকারদের মাধ্য থেকেও গুজব আসছে। একটা প্ল্যাটফর্মের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে জেনে-বুঝে গুজব প্রচার করা হচ্ছে। তাদের তৃণমূলের কর্মীরা সাথে সাথে এগুলো বিশ্বাস করছে। গুজবের ওপর ভর করে এরা চায়ের স্টলে, অফিস-আদালতে মানুষের সাথে তর্কও করছে। কিন্তু দেখা গেলো, সকালে ছড়ানো গুজব দুপুরের আগেই ‘মিথ্যা’ বা ‘গুজব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। তখন ওই দলের তৃণমূলের কর্মীদের অবস্থাটা কী হয়?
সকাল থেকে তিনি যাদের সাথে তর্ক করে আসছিলেন, তাদের কাছে মুখ দেখানোর ব্যবস্থা থাকে না।
এই লোকটার হয়তো সমাজে ব্যক্তিত্ত্ব আছে। কিন্তু দলের উচ্চ পর্যায় থেকে আসা গুজবে বিশ্বাস করে তিনি যখন গুজব ছড়িয়ে যাচ্ছেন, তখন ধীরে ধীরে তার ব্যক্তিত্ব কমে আসছে। অন্য লোকেরা তার থেকে দূরত্ব রেখে চলছে।
এতে দলের লাভ হচ্ছে, নাকি ক্ষতি?
বিষয়টা ভেবে দেখবেন।

এবার আসি শরিফ ওসমান হাদি প্রসঙ্গে।
আলাপ শুরু করার একটু আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখলাম, কিছু লোক মিছিল করছে- ‘হাদির ওপর হামলা কেন, সাদিক কায়েম জবাব চাই?’
এই লোকগুলো কারা ঘেঁটে দেখার সুযোগ হয়নি। তবে এদের উদ্দেশ্য কী, সেটা বুঝতে কি আপনাদের বাকি আছে?

আহারে মানুষ,
মৃত্যুর সাথে যে লোকটা লড়াই করছে, তাকে নিয়ে মশকরা করতেও আপনারা ছাড়েন না?
আপনারা কি মনে করেন, বাংলাদেশের মানুষ সব ভোদাই? আপনারা কিছু আজগুবি ন্যারেটিভ দাঁড় করাবেন, আর মানুষ ওই আজগুবিকেই মাথা পেতে নেবে?
দেখুন, হাদি যতদিন সক্রিয় ছিলো, তাকে একইভাবে আক্রমণ করেছে এই লোকগুলো। প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে, হাদি কোনো মানুষের কাতারে পরেন না।
এরপর হাদি যখন হামলার শিকার হলন, ওরা প্রাথমিকভাবে একে নাটক বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো। তারপর উপায় খুঁজে না পেয়ে হাদির সমব্যথী হওয়ার ভান করলো।
এতেই ক্ষান্ত হলো না, হাদির হামলার পেছনে তার সতীর্থদেরকে দায়ী করে সেই বয়ান প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করলো।
এই চেষ্টা এখনো চালু আছে। এখন আক্রমণ করা হচ্ছে ইনকিলাব মঞ্চ ও ডাকসু নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমাকে। তাকে তুলনা করা হচ্ছে মিন্নির সাথে। অদ্ভুত অদ্ভুত গল্প ফাঁদা হচ্ছে।
এগুলো স্ক্রিনে দেখানোও পাপ, তারপরও কয়েকটা উদাহরণ না দেখালে বোঝা কঠিন হবে, ওরা কতোটা জঘণ্য।
এসব জঘণ্য প্রোপাগান্ডা করছে আওয়ামী লীগের রুচিহীন লোকেরা। এর সাথে যোগ দিয়েছে জিয়ার অনুসারী দাবিদার কিছু লোকও।
এখন প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, হাদি ভালো ছিলো। কিন্তু তার বন্ধুরা খারাপ। বিশেষ করে জুমা সবচাইতে বেশি খারাপ!
জুমাকে অমানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা আরকি। যেন হাদির জন্য কথা বলা ছেড়ে দেয় এই মেয়েটা।
জানি না, জুমার কপালে আরো কি আছে!
এভাবে ন্যারেটিভ চলতে থাকলে একটা সময় হয়তো ভালো মানুষেরাও বিশ্বাস করতে শুরু করবেন, আসলেই জুমা মেয়েটা ভালো না।

মানুষ গুজবে প্রভাবিত হয়, এটা মানুষের স্বভাবেরই একটা দিক। কারণ গুজব আবেগ, ভয় ও সামাজিক চাপের মধ্যে কাজ করে।
একটা ভালো মানুষ যখন ভাবতে শুরু করে ‘কিছু একটা ভুল হচ্ছে’ তখন আবেগ জেঁকে বসে, সাময়িকভাবে বিচারবুদ্ধি হারিয়ে যায় তার।
গুজব আসে পরিচিত মানুষ, সহকর্মী, আত্মীয় বা বিশ্বস্ত কারো থেকে। এতে সাত-পাঁচ ভাবতে না চাওয়া মানুষেরা এগুলোকে সত্য বলেই ধরে নেয়।
আর এই ধরে নেওয়ার মাধ্যমেই গুজবে শক্তি আসে।
তাছাড়া চারপাশের অনেক মানুষ যখন মিথ্যা তথ্য ছড়াতে থাকে, তখন এর বিপরীতে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে যায় ভালো মানুষদের। একটা সময় তিনিও মিথ্যাটাকে বিশ্বাস করতে শুরু করেন।
অনেকসময় কিছু মানুষকে দেখা যায়, তারা নিজেদেরকে ‘সচেতন’ হিসেবে প্রমাণ করতে চান। এই লোকগুলো তাদের ব্যাপারে এমন ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চান, যেন মানুষ ভাবে তিনি সবকিছুর খোঁজ-খবর রাখেন। আগে-ভাগেই অনেক কথা জানিয়ে দিতে পারেন। তাদের অনেকে নিজেদের মান-সম্নান ঠিক রাখতে আগেভাগে তথ্য জানিয়ে দেওয়ার নামে ‘গুজব’ প্রচার করেন। অনেকসময় অসম্পূর্ণ তথ্য প্রচার করেন। এরপর সেই তথ্য মিথ্যা প্রমাণ হলেও, ইনিয়ে-বিনিয়ে সেটার পক্ষেই যুক্তি দাঁড় করাতে চান।
সুতরাং একটা কিছু শুনে বা দেখেই প্রতিক্রিয়া দেখানো চলবে না।
আবেগ সামলে রাখুন। সাথে সাথে শেয়ার না করে কয়েকটি নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করুন। তারপর কথা বলুন।
সকালে একটা রাজনৈতিক দলের কোনো কথা শুনলে অন্তত দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।

আলাপ: শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

প্রযোজনা: সজল ফকির

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...