
ইমান আফানা
গাজায় চাপা পড়ে আছে অনেক সত্য। যে সত্যগুলোর খোঁজ বাইরের পৃথিবী জানে না। ভেতরের গভীর ক্ষতগুলো ঢেকে রাখার জন্য বাইরের দুনিয়ায় কেবল কিছু গল্প বলা হয়। আমরা, অর্থাৎ গাজার নারীরা এই কথাগুলো কখনো মুখ ফুটে বলতেও পারি না। আসলে গত দুইবছর ধরে আমরা যেসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, সেসব পরিস্থতিই বাধ্য করেছে ভেতরের খবর ভেতরেই চেপে রাখতে। আমাদের ব্যস্ত থাকতে হয়েছে কেবল বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে।
গাজার নারীদের শক্তি আছে, তবে তাদের ওপর যে বোঝা চেপে আছে, তারচাইতেও বেশি শক্তি নেই। অবশ্য গোটা পৃথিবীতে আমাদের সাহসের গল্প ছড়ানো হচ্ছে। তবে এসব গল্পে যেসব নেই, সেই সত্যগুলো হলো- কেবল ধৈর্য্য ধরে থাকা ভালো কিছু নয়, বরং এটি একটি ফাঁদ। সবসময় বেঁচে থাকার মধ্যে বীরত্বও নেই। এর অস্তিত্ব ভাঙা। বেঁচে থাকার মধ্যে আছে বিশ্বাসঘাতকতার মতো ছিদ্র।
আমাদের সৌভাগ্য নেই ‘ন্যায়পরায়ণ নারী” হওয়ার। যুদ্ধের সময় আমরা হয়ে উঠি জীবনের কারখানা। অনুপস্থিতি আর মৃত্যুর বিরুদ্ধে প্রতিদিন ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় আমাদের।
আমি এই শহরের দুইটি রূপ দেখি। একটি জীবনকে আঁকড়ে ধরে: আমি যত্ন করে পোশাক পরি, প্রিয় পারফিউম ছিটাই, যেন কোনো উৎসবে যাচ্ছি। আরেক রূপে ভাঙাচোরা ঘর থেকে বেরিয়ে পা রাখতে হয় অচেনা এক জগতে।
গাজার সড়ক ধরে হাঁটলে চারপাশের ভারটুকু শুষে নেয় শরীর। প্রথমেই গন্ধটা আসে; ধোঁয়া, পয়োনিষ্কাশন, লবণের ঝাঁজ আর গুলির বারুদ- সবকিছুই যেন সাগরের হাওয়ায় ভেসে আসে। তারপর আসে শব্দ: হকারের অসহায় ডাক, শিশুদের খালি পায়ে কাদা এবং ধুলো মাড়িয়ে চলা। উপচেপড়া যাত্রী নিয়ে চলতে থাকা কয়েকডজন গাড়ির হর্ন, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বাতাসে ভেঙে যাওয়া হাসি। মাটিও তখ অস্থির হয়ে উঠে। হাঁটার সময় আমার জুতার নিচ থেকে অদ্ভুত শব্দ হয়। সেই শব্দ আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আমি কোনো সড়ক নয়, বরং এক ধ্বংসস্তূপের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি।
আমার গত দুইটি বছর অদৃশ্য হয়ে গেছে অস্থিরতা আর ছোট হয়ে আসা দিগন্তের শূন্যতার ভেতর। আমি কেবল চাকরি আর ক্যারিয়ারের সম্ভাবনাই হারাইনি, হারিয়ে ফেলেছি খুব সহজ করে চাওয়া স্বপ্নগুলোও। হারিয়েছি একদিন মা হওয়ার স্বপ্নও।
প্রতি সকালে বাসে ওঠার সময় আমি দেখি, ক্লান্ত বাহুতে শিশুদের বহন করছে নারীরা, কয়েকজন মা দুধের বোতল আঁকড়ে ধরে আছেন সন্তানদের জন্য। আগামীকালও এই সন্তানেরা দুধ পাবে কি না, সেটা তাদের মায়েরা জানেন না। আবার কোনো মায়ের হাতে স্কুলব্যাগ। অথচ এই ব্যাগটা যার, সে আর পৃথিবীতে বেঁচে নেই।
এখানে অনেক মায়ের সন্তানদের শৈশবের আগেই ছিনিয়ে নেওয়া হয় তাদের মাতৃত্ব।
একদিন বাসে যাওয়ার পথে, এক তরুণী মা আমাকে অনুরোধ করলেন তার শিশুটিকে একটু ধরে রাখতে, তিনি ব্যাগ থেকে ভাড়া দেওয়ার জন্য কয়েন খুঁজছিলেন। তার শরীর ছিল শুকনো, চোখদু’টো ক্লান্তিতে ভরা। তিনি বললেন, “ওর জন্মের পর থেকে আমি ঘুমাতে পারিনি।” তিনি জানালেন, বাচ্চার কান্নাকাটির জন্য নয়, বরং আকাশে বিমানগুলো থামে না। ঘুমানোর চেষ্টা করলেও প্রতিটি হামলার সময় চমকে জেগে উঠতে হয় আমাকে, চেক করে দেখতে হয় সে এখনো নিঃশ্বাস নিচ্ছে কি না। ওর জন্ম হয়েছিলো একটি ক্লাসরুমে, ওটা তখন আশ্রয়কেন্দ্র ছিলো। প্রসবের সময় ঘরহারা অন্য নারীরা আমাকে সাহায্য করেছিলো। আজ ফ্রি দুধ পাওয়ার আশায় ওকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। ওকে দূষিত পানি খাওয়াচ্ছি, সেটাও ভয়ের ব্যাপার। ওর জন্য ডায়াপার কেনার সামর্থ্য নেই আমার। ওর বাবারও নেই।
চারপাশ থেকে যখন ফিলিস্তিনকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, তখন কীভাবে নতুন করে গড়ে তোলা হবে? আমার কাছে অসম্ভব মনে হয়।
ওই তরুণী মা আমাকে বললেন আরেক নারী উম্মে মোহাম্মেদের কথা- তিনি প্রতিদিন যেসব কাজ করেন, তা কল্পনারও বাইরে। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই জেগে ওঠেন এই নারী। তারপর রুটি বানান। এই রুটিগুলো কেবল পরিবারের সদস্যদের জন্যই নয়। তার ঘর হয়ে উঠেছে প্রতিবেশি ও ঘরহারাদের জন্য স্থায়ী বেকারি। দিনে বারো ঘণ্টা কাজ করেন। এর বিনিময়ে কিছুই পান না। কখনো কখনো আস্ত একটি রুটি নিজের জন্য থাকে। কখনো এক টুকরো রুটিতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। সাথে থাকে মিষ্টি। আবার সেই খাবারগুলোও অনেকসময় ক্ষুধার্ত সন্তানদের দিয়ে দিতে হয়।
আমরা, গাজার নারীরা এখন নিজেদের যন্ত্রণার কথা ব্যাখ্যা করতে করতে ক্লান্ত। আমরা ক্লান্ত ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ২৪ মাস ধরে গণহত্যার চিত্র তুলে ধরতে ধরতে। এই লড়াই যেন আমরা নিজেরাই বেছে নিয়েছি। আমরা ক্লান্ত হয়ে গেছি হৃদয়হীন দুনিয়াকে গল্প শুনিয়ে। এই দুনিয়া বধির নয়, কান দিয়ে শোনে। কিন্তু হৃদয় দিয়ে নয়। কখনো কখনো নীরবতাই আমাদের একমাত্র আশ্রয়।
আমাদের কাঁধে আর ভার বহন করার শক্তি নেই, এই সত্যটা গণমাধ্যমের সংক্ষিপ্ত খবরগুলোতে খুব কম জানানো হয়। আমরা চাই কোনোরকম আশঙ্কা ছাড়াই শুরু হোক প্রতিটা সকাল। যে সকালে পানি আর রুটি ফুরিয়ে যাওয়ার ভয় থাকবে না। পরের বিমান হামলায় সব শেষ হয়ে যাবে, এমন ভয়টাও দূর হয়ে যাবে। আমরা চাই এমন এক স্বাধীনতা, যেখানে আমরা পাবো সাধারণ মায়ের মতো জীবন। আমরা হবো সাধারণ কর্মজীবী, সাধারণ নারী- যাদের মৃত্যুর ভয় থাকবে না। তুচ্ছ বিষয়ে নিয়েও হেসে উঠতে পারবো আমরা।
নারীবাদ বলতে আমি এটাই বুঝি। কিন্তু গাজার নারীরা তো বিশ্বের অন্য নারীদের মতো নয়! এখানকার নারীদের নিয়ে এমন করে কথা বলার কেউ নেই। আমরাও তো মানুষ, পৃথিবীর অন্য সব নারীরা যেমন অধিকার দাবি করে, আমরা সেই অধিকারটাই চাই। আমরা ভয় নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই না। আমরা চাই বেঁচে থাকার নিরাপদ অধিকার, সন্তানদের নিরাপদে বড় করার অধিকার। আমাদের শ্রমের মর্যাদা পাওয়ার অধিকার; আমাদের সিদ্ধান্তগুলোকে সম্মান করার অধিকার। আমরা চাই আনন্দের অধিকার, বিশ্রামের অধিকার এবং লজ্জা ছাড়াই নিজের দুর্বল আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের অধিকার।
যদি কখনো এই ভূমির ইতিহাস লেখা হয়, তাহলে সেখানে উঠে আসুক গাজার নারীদের অসীম সহ্যশক্তি আর যন্ত্রণার সত্য।
নিজেকে ব্যতিক্রম হিসেবে উপস্থাপনের জন্য আমি আমাদের বাস্তবতা নিয়ে লিখি না। বরং আমাদের ওপর কী চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই খবর জানার অধিকার আছে বিশ্বের। আমি বিশ্বকে জানাতে চাই, যুদ্ধবিরতির খবরগুলো পশ্চিমা গণমাধ্যমে এমনভাবে প্রকাশ করছে, যেন গত দুই বছরের ট্রমা হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেছে। এই গণহত্যা সম্পূর্ণভাবে পাল্টে দিয়েছে আমাদের জীবন। আমাদের থেকে কেড়ে নিয়ে গেছে স্বপ্ন দেখার বিলাসিতা।

ইমান আফানা: গাজার একজন লেখক। পেশায় তিনি শিক্ষক। গাজার শিশু ও সার্ভাইভরসদের অভিজ্ঞতা ডকুমেন্টেশন করতে ‘উইটনেস অ্যান্ড মোমোরি’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন ইমান। তার এই লেখাটা দ্যা নিউ আরব থেকে অনুবাদ করেছে ইনফোজা ডেস্ক।