হিজলদানবদের বন এবং দিল্লির আখড়া, হাওরে গা ছমছম কাহিনি

হাওরে দ্বীপের মতো একটা ‘কান্দা’ ছিলো। চারপাশে উত্তাল নদী। কান্দার মাঝখানে ঝোপ-জঙ্গল। ওখানে কেউ থাকতো না। এমনকি নৌকা নিয়ে যেতেও পারতো না। ওই কান্দা ঘিরে ছিলো গা ছমছমে রহস্য। এর আশপাশ দিয়ে কোনো নৌকা গেলেই পানিতে ডুবে যেতো। কোনো এক অদৃশ্য শক্তি এসে ডুবিয়ে দিতো। এমনকি স্থানীয়রা এর আশপাশ দিয়ে কোষা নৌকাও বাইতে পারতো না।

একবার দিল্লির সম্রাট মালামাল বোঝাই করে বিশাল এক নৌকা পাঠিয়েছিলেন। ওটাও এসে নিখোঁজ হয়ে গেলো ওই মরণফাঁদে। আরোহীরা প্রাণপণ চেষ্টা করলেন, কিন্তু নৌকা উদ্ধার হলো না। উল্টো একটা সাপ এসে দংশে গেলো তাদের একজনকে।

গা ছমছমে ওই দ্বীপ নিয়ে ছড়িয়ে গিয়েছিলো ভয়। অসহায় হয়ে পড়েছিলো মানুষেরা। কারণ দূরের হাটে যেতে হলে এই জলপথের বিকল্প নেই। শেষে ডাক পড়লো এক সাধকের। নাম তার নারায়ণ গোস্বামী। গুরু রামকৃষ্ণ গোস্বামীর আদেশে তিনি পা রাখলেন সেই অভিশপ্ত দ্বীপে। নদীর তীরে বসে শুরু করলেন ঘোর তপস্যা।

কিন্তু তার জন্যও ওত পেতে ছিলো বিপদ। অদৃশ্য কেউ এসে গোস্বামীর হাত-পা বেঁধে ফেলে। তারপর নদীতে ফেলে দেয়। তপস্বার জোরে ফিরে আসেন গোস্বামী। বারবার তার সাথে এই ঘটনা ঘটতে থাকে।

টানা সাত দিন চললো অদৃশ্য লড়াই। অষ্টম দিনে আকাশ কাঁপিয়ে কেউ একজন বললো- এটা আমাদের রাজ্য। এখান থেকে চলে যাও গোস্বামী।

সাধক অভয় দিলেন। ঠিক আছে, নাহয় চলেই গেলাম। কিন্তু তোমরা কারা, দেখা দাও।

সাথে সাথেই তার সামনে দাঁড়িয়ে গেলো হাজার হাজার বীভৎস দানব!

গা শিউরে ওঠা দানবদের দেখে নারায়ণ গোস্বামী ভয় পেলেন না। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিলেন। তিনি বললেন- মানুষের ক্ষতি করা চলবে না। এখানে যদি থাকতে চাও, তাহলে তোমাদেরকে বৃক্ষরূপ ধারণ করে থাকতে হবে।

জবাবে দানবেরা আর কি বলবে, তার আগেই গাছ হয়ে গেলো সবাই। তাদের বিশাল বিশাল শরীর একেকটা হিজল গাছ হয়ে গেলো।

ওই গাছগুলো এখনো আছে, দাঁড়িয়ে আছে দানবের মতো করেই। অবশ্য আগের মতো হাজার হাজার গাছ নেই, অনেকগুলো নাই হয়ে গেছে।

অদৃশ্য কেউ এসে গোস্বামীর হাত-পা বেঁধে ফেলে। তারপর নদীতে ফেলে দেয়। তপস্বার জোরে ফিরে আসেন গোস্বামী। বারবার তার সাথে এই ঘটনা ঘটতে থাকে। ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার দিল্লির আখড়া নিয়ে এই মিথ প্রচলিত আছে। কেউ কেউ বলেন, দানবদের বশ করার পর সাধক নারায়ণ গোস্বামী নাকি দিল্লির সম্রাটের ডুবে যাওয়া নৌকাটি উদ্ধার করেছিলেন। সাপের দংশনে মরে যাওয়া লোকটিকেও প্রাণ দিয়েছিলেন। এই  খবরে মুগ্ধ হয়ে দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীর ১২১২ বঙ্গাব্দে অথবা ১৬শ শতাব্দীতে ৪০০ একর জমি সাধকের নামে লিখে দিয়েছিলেন। এ কারণেই ভারতের দিল্লির সাথে ভৌগোলিক সম্পর্ক না থাকলেও, এলাকাটার নাম দিল্লির আখড়া।

আজকের দিল্লির আখড়া ধর্মীয় তীর্থস্থান। সেইসাথে পর্যটন গন্তব্য। হাওরে বর্ষা এলে থৈ থৈ পানিতে দাঁড়িয়ে থাকে হিজলবন। ভিডিওতে যে বন দেখা যাচ্ছে, সেটা শুকনা সময়ের। হাওরে সাধারণত পর্যটকেরা যান বর্ষায়। এ কারণে শুকনার ছবি তাদের কাছে অপরিচিত। বর্ষায় দিল্লির আখড়া একরকম পানির ওপর ভেসে থাকে। আর শুকনায় এই আখড়াকে ঘিরে রাখে বৃক্ষ হয়ে যাওয়া সেই হিজলদানবগুলো।

আখড়ার প্রাচীন দেয়ালের ভেতর আছে নাটমন্দির, অতিথিশালা আর গঙ্গারাম গোস্বামীর সমাধি। 

প্রতিবছর চৈত্র মাসের আট তারিখ মেলা বসে। মানুষের কোলাহলে মুখর হয় আখড়া।

দিল্লির আখড়া আর হিজলবন দেখতে হাওরে যেতে পারেন বর্ষায়। অথবা শুকনার খোলা হাওরও দেখে আসতে পারেন। ছুঁয়ে আসতে পারেন হিজলদানবগুলোর শরীর।

লেখা: শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

চিত্র: মশিউর রহমান কায়েস

ধারা বর্ণনা: রিফাত ইসলাম

প্রযোজনা: সজল ফকির

Leave a reply

    Join Us
    • Facebook
    • Youtube
    Deal Of The Month
      Categories

      Advertisement

      Loading Next Post...
      Follow
      Search Trending
      Popular Now
      Loading

      Signing-in 3 seconds...

      Signing-up 3 seconds...