
আবদুল মালেকের মন খুব বেজার। দাঁড়িয়ে আছে নয়া সড়কের মোড়ে, জামগাছ তলায়। সামনে একটা চকির ওপর ওর দোকানের মালপত্র গাদা করে রাখা। লণ্ডভণ্ড অবস্থা। পেছনে দোকান ঘরটা খাঁ খাঁ করছে। ওটাই ছিল মালেকের ঘর, তার জান, তার আত্মা। ওই ঘরে বসেই গত দু’বছর ধরে গাধার মতো খেটেছে মালেক। নিজের সন্তানের মতো যত্ন করে তিলে তিলে গড়ে তুলেছে দোকানটা। মালামাল বেড়েছে। বিক্রি বেড়েছে। দু’দশ টাকা জমতেও শুরু করেছিল। ইচ্ছা ছিল ঘরটা আরও বড়ো করবে। অতো ছোট ঘরে, একটামাত্র চকি পেতে সাজানো দোকানে আর চলছে না। আরেকটা চকি কিনবে। একটা আস্ত র্যাক বানিয়ে নেবে কালু সুতারকে ডেকে। একটা ক্যাশবাক্স না হলেও আর মানায় না। ঠিক দোকানদার বলে মনে হয় না নিজেকে। শহরের সব দোকানে একটা করে ক্যাশবাক্স থাকে। তার মধ্যে অনেক খোপ। ভাংতি পয়সা রাখার, ছোট বড়ো নোট রাখার। খুচরা পয়সার খোপটা সরিয়ে নিলে নিচে চোরা কুঠুরিও আছে।
মালেকের খুব ইচ্ছা ওরকম একটা ক্যাশবাক্স কিনবে। কিন্তু সে সব ইচ্ছার গুড়ে বালি। দু’চার টাকা হাতে জমতে না জমতেই শুরু হয় আরেক ভ্যাজাল। বাপে কয়, ট্যাকা দেও, সংসার চলে না। ট্যাকা না দিলে খাবা কি?
মালেক টাকা পয়সা দেয়। দোকান থেকে সদাইপাতি দেয়। বাপটা জয়িফ হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। আগের মতো টুকটাক ব্যবসার ধান্দায় ঘুরতে পারে না। এককালে গাওয়ালী মাতব্বর হিসেবে নামডাক ছিল। সেই মাতব্বরীর কাজেও আজকাল আর খুব বেশি ডাক আসে না। পিস কমিটি আছে, রাজাকার কমান্ডার আছে তারাই সবকিছু দেখাশোনা করে।
এটা এমন এক সময়, সালিশ-ফালিশের ধার ধারে না কেউ। সুতরাং মালেকের বাপ মোহরালি মুন্সী বেকার, অচল। যখন তখন ছোট বউকে পাঠায় দোকানে, ‘যা, ছুডু বউ, মালেইক্কারে ক’, এক সের চাইল দিবনি। আলু আর পিঁয়াজও নিয়া আহিষ্ণু।’
ছোট বউ আসে। নিঃশব্দে দোকানের পাশে দাঁড়ায়। শোলার বেড়ায় খচমচ শব্দ হলে মালেক চোখ তুলে তাকায়।
তখন কথা বলে ছোট বউ, আব্বা, এক সের চাইল, এক পুয়া আলু আর ছটাইক্ খানি হুগ্না মইচ দিবার কইছে। মালেককে আব্বা বলে ডাকে মুন্সীর ছোট বউ। পঁচিশ ছাব্বিশ বছর হতে পারে বয়স। প্রায় সমবয়সী এই নারীকে মালেক কোনও সম্বোধন করে না। নিঃশব্দে চাল, আলু, মরিচ মেপে দেয়।
দু’বছর আগে এই ছোটবউকে বিয়ে করার সময়ই মালেককে দোকান ঘরটা তৈরী করে দিয়েছিল মোহরালি মুন্সী। হয়ত ছেলের মুখ বন্ধ করার জন্যই। কে জানে! মালেক কিছু বলেনি। বুড়োর ভীমরতি দেখে ঘেন্না ধরেছিল তার। সে বাড়িতে থাকাই ছেড়ে দেয়। শুধু খাবার সময় চারটে খেয়ে দোকানে চলে আসে। ওর ভাত বেড়ে দেয় বড়ো বউ। তাকেই সে মা বলে ডাকে। মা’র সঙ্গেই দু’চারটা কথাবার্তা বলে। আর কারো সঙ্গে নয়।
তাছাড়া বাড়ির যা অবস্থা, তিষ্ঠানোই দায়। দুই বউ দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্ভবত ২০ ঘণ্টাই কাইজ্জা করে। বাড়ি মাথায় তুলে রাখে একেবারে। বুড়ো মোহরালির জান কাবা কাবা। মাঝে মাঝে নিজের চুল নিজেই টেনে ছেঁড়ে।
হয়তো দ্রুত বুড়িয়ে যাবার কারণও এই অশান্তি। ট্যাকা পয়সার টানাটানি তো আছেই। তার মধ্যে তাকে নিয়েও যখন দুই বউয়ের টানাটানি পড়ে তখন আর দিশকুল পায় না বুড়া। তার কঠোর ধমক ধামকে প্রথম দিকে দু’চার দিন কাজ হলেও এখন হয় না। মুরোদ বুঝে ফেলেছে বউরা।
তাই দাপট কমেছে। মাটিতে ঠেকে গেছে পাছা। উঠে বসতে পারে না। সংসারে মন নেই। কোনও কিছুর অভাব হলেই পাঠায় দোকানে। হুকুম দিয়ে দেয়, যা মালেকরে ক’-
মালেককে সবাই মোহরালি মুন্সীর ছেলে বলেই জানে। আসলে সে মুন্সীর নিজের ছেলে নয়। বড়ো বউয়ের পোলাপান হয়নি। তখন বউ’র প্রতি মায়া মহব্বত ছিল। মুন্সী দ্বিতীয়বার বিয়ে করেনি। পাশের গেরামের দুঃখি ছমেরন বেওয়ার কোলের ছেলেটাকে পালক এনেছিল আকালের সময়। মায়ের দেওয়া আকালু নামটা পাল্টে রেখেছিল আবদুল মালেক। আবদুল মালেক আদর-যত্নে মানুষ হয়েছে। মুন্সীর পোলা বলে পরিচিত হয়েছে। সবাই ভুলেই গেছে, মালেক আসলে মুন্সীর ছেলে নয়।
অনেক সময় মালেক নিজেও মনে করতে পারে না, এরা তার বাবা মা নয়। নিজের বাবা মারা গেছে তার জন্মের বছরই। মা থেকেও না থাকার মতো। পেটের ছেলেকে নিজে মানুষ করতে পারেনি। অনেকটা সেই জন্যেই কিনা জানে না মালেক, মা তাকে দেখতে আসে খুব কম| এসব কথা তার প্রায় মনেই পড়ে না। কিন্তু এখন পড়ছে। জামগাছ তলায় চকির ওপর দোকানের মালামালের দুরবস্থা দেখতে দেখতে তার আবার বাবা-মা’র কথা মনে পড়ে। তার মুখটা খুব বেজার। বুকের ভেতর একটা যন্ত্রণার ঢেউ দুমড়ে মুচড়ে বার বার উঠে যাচ্ছে উপর দিকে। তার দোকান কেড়ে নিয়েছে মোহরালি মুন্সী।
ঘটনার সূত্রপাত দিন তিনেক আগে। সেদিন ভর সন্ধ্যায় ছোটবউ এসে বলল, ‘আব্বা, ঘরে তো কিছু নাই, রাইতে কি খাবাইন?’ মালেক প্রথমে জবাব দেয় না। কারণ, গত ক’দিন থেকেই শুরু হয়েছে এই নূতন সুর।
সমস্যাটা, মানে সংসার চালানোর পুরো দায়িত্ব মালেকের ওপর চাপিয়ে দেবার চেষ্টা লক্ষ্য করছে মুন্সি। ছোটবউ এসেই বলবে, ‘ইবেলা কিছু নাই, কি করবাইন?’
মালেক দু’একবার রাগারাগি করেছে। আর দেওয়া সম্ভব নয়, জানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তারপরও সংসার টেনে গেছে সে। ফলে দোকানের শুধু লাভ নয়, পুঁজিতেও টান পড়েছে! অবস্থা এমন, দোকানে নূতন মালও আর ওঠাতে পারে না। ছোট্ট এই বাস স্টপেজের ক্ষুদ্রতর একটি দোকানের লাভ থেকে চারজনের সংসারের পুরো চাহিদা মেটানো অসম্ভব। দোকান লাটে ওঠার জোগাড়। মালেক তাই ক্ষেপে যায়। সে চোখ উল্টে ফেলে। পষ্টাপষ্টি জানিয়ে দেয়, “আমি আর দিবার পামু না। আমার দুকান ত শ্যাষ। আমার কাছে আর আবা না।’
সত্যি সত্যিই মালেক হাত গুটিয়ে নেয় এবং সে রাতে চুলোয় হাড়ি চড়ে না বাড়িতে। দু’টো বিস্কুট খেয়ে রাত কাটায় মালেক। পরদিন শুরু হয় রীতিমত কুরুক্ষেত্র। মোহরালি মুন্সী প্রচণ্ড রাগে ক্রোধে তেড়ে আসে লাঠি নিয়ে। ‘আমারটা খাইয়া, আমারটা পিন্দা শৈল্যে ত্যাল জমছে? হারামজাদা নেমক হারাম, ছুট্টনুকের বাচ্ছা। আমি পুইন্যা (পালক) না আনলে, কবে পুটকির চামরা হুকাইয়া মরতি। শালায় আইজ আমারে খাওন দিবার চায় না!’
মালেক বলতে যায়, ‘দিনপত্তি দুকান থনে দিবার গেলে তো দুকান শ্যাষ হইয়া যাবগা, তহন কি খাবা, তহন ক্যামনে সংসার চালাবা?’
মোহরালি মাতব্বর এখন ক্ষিপ্ত। সে যুক্তি শুনতে নারাজ। ‘তুই আমারে না খাওয়াইয়া থুইছস। তুই ভাবছস্ কি, আমি মইরা গেছি? ক’, ক’, তরে দুকান ঘর বানায়া দিছে কেডা? ঐ ঘরো আমি দুকান করবার পামু না?
যা, যা, বাইরো আমার দুকান ঘর থনে। তর মতন পোলার কাম নাই আমার। যা বাইরো!’
প্রতিবেশীদের হস্তক্ষেপে তখনকার মতো দোকান থেকে ফিরে যায় মোহরালি মুন্সী। ঠিক তখনই শুরু হয় দূরে শহরের ওপর ভারতীয় বিমানের হামলা। এখান থেকে দশ মাইল উত্তরে জামালপুর শহরের ওপর রূপালী পাখির মতো পাক খেয়ে ঘুরছে ভারতীয় বোমারু বিমানগুলো। গোলাবর্ষণ ও বোমা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। দু’দিন আগেই আশেপাশের সবখানে মুক্তিবাহিনী এসেছে। শহর ঘেরাও হয়েছে আগেই। এখন বিমান হামলার সহায়তায় পাক বাহিনীকে হটিয়ে দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। মুক্তিবাহিনী কামান মর্টার দাগছে। আজ বা কালকের মধ্যেই শহরের পতন ঘটতে পারে। চারদিকে চাপা আনন্দ উল্লাসের আভাস। এই গ্রামেও অহরহ শোনা যাচ্ছে হর্ষোৎফুল্ল জনতার উদাত্ত স্লোগান, ‘জ-অয়-বাংলা।’ দীর্ঘ নয়মাস পর আসছে কাঙ্ক্ষিত বিজয়। এখন আর বিজাতীয় বিদেশী মিলিটারির নির্দেশ শুনতে হবে না। শালারা কি কম জ্বালাইছে! শহরে গেলেই ধরতো, “হেই, ইধারাও, ইধারাও, তেরা ডান্ডিকার্ড কাহা?” একটু সন্দেহ হলেই সার্চ করতো, “তুম্ মুক্তি হো? তুম্ জ্যয় বাংলাকা আদমী হ্যায়, না ক্যায়া? ক্যহিয়ে, আভি জ্যয় বাংলা ক্যহিয়ে, শালা বহেনচোত!”
এহন বুজবো হারামীর বাচ্চারা, কারা আসল বাইনচোত, খানেরা না বাঙালীরা। ভাবতে ভাবতে দোকানের ঝাঁপ আটকিয়ে বাড়ি যায় আবদুল মালেক। দ্যাখে, বাড়ি আরেক রণক্ষেত্র। মোহরালি মুন্সী তার ভাই আর জোয়ানমর্দ ভাতিজাদের সঙ্গে পরামর্শ করছে। মালেইক্কারে বাইর কইরা দে তরা, ঐহানে আমি দুকান করমু, অর মতন পোলা দিয়া আমার কুনু কাম নাই।’ মালেককে দেখেই আবার ক্ষেপে ওঠে বুড়া, ‘ঐ হারামজাদা, ভাগ, ভাগ্ আমার সামান থেইকা।” হুকুমমাত্র মুন্সীর ভাতিজারা দৌড়ে যায় দোকানে। দোকানের সমস্ত মাল সামান ছুঁড়ে ফেলে দেয় বাইরে। ভেঙ্গে খানখান হয়ে যায় অনেক শিশি, বোতল, বয়েম। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে সমস্ত জিনিস। শেষে ওর চকিটাও বের করে ছুঁড়ে ফ্যালে জাম তলায়। আবদুল মালেক একা, অসহায়। বাধা দিতে পারে না। তাকিয়ে তাকিয়ে দ্যাখে তার সাধের দোকান বেদখল হয়ে যাচ্ছে। আবদুল মালেকের মালিকানা যে এতো ঠুনকো, এতো নাজুক, জানা ছিল না তার নিজেরই। চোখ ভরা জল নিয়ে জিনিসগুলো একটা একটা করে জড়ো করে মালেক। যে জিনিসগুলো নেয়া সম্ভব দ্রুত সরিয়ে নিয়ে যায় পাশের একটি বাড়িতে, বন্ধু ফজুর ঘরে। বাকি জিনিসগুলো চকির ওপর রেখেই সরে পড়ে। কারণ, এখন চোর ডাকাতের ভয় নেই। চারদিকে যুদ্ধ। মানুষ এখন যার যার জান বাঁচাতে ব্যস্ত। চুরি চামারির ধান্দা করার সুযোগ কোথায়!
ভোর বেলা নয়া সড়কে চলে আসে মালেক। তার মুখটা খুবই বেজার। কাল সারারাত গোলাগুলির আওয়াজ শোনা গেছে। কামান, মর্টারের গোলা আর বিমানের বোমা বর্ষণের প্রচণ্ড শব্দ। সেইসঙ্গে নয়া সড়কে শোনা গেছে সামরিক যানবাহনের ভারী আওয়াজ।
সমস্ত রাত ধরে খান সেনারা গাড়িতে আর পায়ে হেঁটে পিছু হটেছে। ঢাকার দিকে, টাঙ্গাইলের দিকে পালিয়ে গেছে ওরা। যাবার সময় সড়কের দুই পাশের জমিতে খাবার মত যা কিছু পেয়েছে সবই খেয়েছে ওরা। অবরুদ্ধ শহরে কতদিন খেতে পায়নি কে জানে! ক্ষুধায় তৃষ্ণায় নিশ্চয়ই কাতর ছিল। জাংলার শশা, গাছের পেঁপে এমনকি খেতের মুলা পর্যন্ত তুলে চিবিয়ে খেয়েছে পাক সেনারা। তার আগেই পতন ঘটেছে শহরের।
আজ ভোর থেকেই জয়বাংলা স্লোগান দিতে দিতে আসতে শুরু করেছে মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা। শহরের দিক থেকে আসছে ওরা গাড়িতে করে।
সড়কের দু’পাশের পাড়াগুলো থেকে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে বাস স্টপেজে। অনেকে মুক্তি বাহিনীর গাড়িতে উঠে নাচছে, বিজয়ের আনন্দে আত্মহারা যোদ্ধাদের স্লোগানের সঙ্গে কণ্ঠ মেলাচ্ছে, ‘জ-অয়-বাং-লা; জ-অয়-বাং-লা।’
মালেক স্লোগানে কণ্ঠ মেলাতে পারে না। দেশ স্বাধীন হবার আনন্দ তারও হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে। বুকটা উদ্বেল হয়ে উঠছে। কিন্তু মনটা তেতো। গত সন্ধ্যায় তার নিজের দেশ বেদখল হয়ে গেছে। দোকানটাই তো ছিল তার দেশ। তার প্রিয় দেশেরই আরেক উপলব্ধি। সে দেশ বোঝে না, যুদ্ধ বোঝে না— শুধু বোঝে, নিজের দেশ যেমন আমার প্রিয়, তেমনই দোকানটাও।
সকাল ছ’টা সাড়ে ছ’টার দিকে শুরু হয় ভারতীয় পদাতিক বাহিনীর টাঙ্গাইলের দিকে অগ্রযাত্রা। দলে দলে, শ’য়ে শ’য়ে, হাজারে হাজারে, ঢুকছে ভারতীয় সৈন্য। এরা খান সেনাদের মতো মাইট্যা রংয়ের পোশাক পরেনি, পরেছে জঙ্গুইল্যা ছাপা কাপড়ের পোশাক। বেশির ভাগ সৈন্যের চুলদাড়ি দেখে ভিরমি খাবার জোগাড়। সুন্দর পাগড়ি বাঁধা তাদের মাথায়।
উৎসুক জনতার নানা মন্তব্য ভেসে আসে মালেকের কানে। কেউ একজন বলে, পাকিস্তানি খানেগো চায়া এগোরেই ত বেশি মুসলমান মুনে হয়। কেউ বলে, অরা হইলো শিখ সৈন্য। দারুণ যোদ্ধা জাতি। অরা পণ করছে, স্বাধীন না হইলে চুল দাড়ি কামাবো না। এমনি নানা ধরণের মন্তব্য শোনা যায়।
আবদুল মালেক বুদ্ধি করে জামতলায় ফেলে রাখা চকি সরিয়ে একটু দূরে রাস্তার পাশে বিছিয়েছে। বিড়ি সিগারেটের ছোট্ট ডাব্বাটা এনে চকির এক প্রান্তে বসে গেছে। জিনিসপত্র সরিয়ে জায়গা করে নেয় সে। অনেক লোক জমেছে। বেচাবিক্রি হইলেও হইতে পারে।
এক ঘণ্টা, দেড় ঘণ্টা ধরে সৈন্যরা মার্চ করে চলে গেল। ধানুয়া কামারপুরের দীর্ঘ যুদ্ধে খানসেনাদের পরাস্ত করে এরা এসেছে শেরপুর হয়ে ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে জামালপুরে। জামালপুর অবরোধ করে পতন ঘটিয়েছে গতকাল। আজ পায়ে পা মিলিয়ে পিচের সড়কে খট্ খট্, খট্-খট্, লেফ্ট রাইট, লেফ্ট-রাইট করতে করতে তারা যাচ্ছে টাঙ্গাইলের দিকে। আর যাচ্ছে গাড়িতে, আর্মির ট্রাকে। সব যে শিখ সৈন্য তা নয়। নানা চেহারার সৈন্য তারা। সকাল সাড়ে সাতটা আটটার দিকে সৈনিকদের একটি দল দাঁড়িয়ে পড়ে। নিশ্চয়ই কমান্ডারের নির্দেশে। তারা সড়কের পাশে, গাছতলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে। বিশ্রাম নেয়। পানি খায় কেউ কেউ। কেউ বা উঠে আসে মালেকের দোকানের কাছে।
‘সিগ্রেট হ্যায়, সিগ্রেট।’
‘কিয়া সিগ্রেট সার?’ খান সেনাদের মুখে শুনে দীর্ঘ নয় মাসে ওদের ভাষা একটু আধটু শিখেছে মালেক। সে সিগারেট বিক্রি করে। সৈন্যটি অদ্ভুত রঙের ভারতীয় নোট ধরিয়ে দেয় মালেকের হাতে। মালেক জানে না এ টাকা চলবে কিনা। কিন্তু ফিরিয়ে দেওয়ার সাহস পায় না। সে বরং ভাবে, একি হলো, এ কি হলো! যেই বিদেশীগো খেদাইলাম, এরা দেহি হেগো ভাষায়ই কতা কয়!
বেশি ভাবার সময় পায় না মালেক। একজন শিখ সৈন্য হাসতে হাসতে হঠাৎ মালেকের কাঁধ ধরে ঝাঁকি দেয়, “কেয়া দোস্ত, তুম জ্যয় বাংলা বোলতা নেই? তোমহারা মুলুক তো আজাদ হো গিয়া। বোলো বোলো, জয় বাংলা—
আজাদী! আজাদী রক্ষা করবো তো রাজাকারেরা, আলবদর, আল শাম্সরা। খান সেনারা। আমরা স্বাদীন চাইছিলাম দ্যাশ। স্বাদীন হইছি। এরা আবার আজাদীর কতা কয় ক্যান? কোন্ আজাদীর কতা কয়?
তখন অতো ভাবার সময় নেই। অস্ত্রধারী ভারতীয় সৈন্য তার কাঁধ ধরে ঝাঁকছে। আবদুল মালেক ভারতীয় সৈন্যের অদ্ভুত উচ্চারণের সঙ্গে জোরে স্লোগান ধরে, “জ্যয় বাংলা…।” তার কণ্ঠ চিরে ডুকরে ওঠা কান্না বেরিয়ে আসতে চায়। সে দুহাতে চোখ ঢেকে চকিতে পেছন ফেরে। তার দশ আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে চোখ চলে যায় সড়কের পাশের শূন্য দোকানটির দিকে। ওটা এখন মুন্সীর দখলে। শিগগিরই নতুন মালামাল তুলে জাঁকিয়ে বসবে তার পালক বাপ মোহরালি মুন্সী।
মালেকের সজল চোখে শিখ সৈন্য ও মোহরালি মুন্সীর চেহারা মিলেমিশে একাকার হতে শুরু করে।

কবি ও কথাশিল্পী মুজতাহিদ ফারুকীর ‘দখলদার’ গল্পটি তার বই জীয়নখোলার জীবনমৃত্যু অথবা দুধমাতা থেকে নেওয়া হয়েছে। এবছর ফেব্রুয়ারি মাসে বইটি প্রকাশ করেছে ছিন্নপত্র প্রকাশন।
