বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের মানুষ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়- ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা। বাকি দলগুলো মূলত টুরিস্ট ভিসায় অংশগ্রহণ করে। তবে এবারের বিশ্বকাপে নতুন এক ঘটনা ঘটছে। খেলার চেয়ে বেশি আলোচনায় আছে দুধ। দুধ দিয়ে গোসল করে দল পরিবর্তন করছেন অনেকে। বেশিরভাগই ব্রাজিল থেকে আর্জেন্টিনায় যোগ দিচ্ছেন। বিশ্বকাপ নিয়ে দারুণ রচনা লিখেছেন সোহেল অটল। তিনি আর্জেন্টিনা দলের সমর্থক

দুধ-গোসলের রেওয়াজ অবশ্য এদেশে পুরনো। রাজনৈতিক দল পরিবর্তনের সময় অনেক নেতা-কর্মী দুধ দিয়ে গোসল সারেন বলে জনশ্রুতি আছে। আগের দলের সব পাপ, ভুল, দুর্নীতি, ব্যর্থতা, গালাগালি- এক বালতি দুধে ধুয়ে-মুছে সাদা হয়ে যায়। গতকাল পর্যন্ত যেটাকে তাঁরা জাতীয় বিপর্যয় বলতেন, আজ সেটাকেই জাতীয় অর্জন বলতে শুরু করেন।
কিছুদিন আগেই তো হিরো আলম দুধ-গোসলের মাধ্যমে “ব্রেক-আপ” পার্টি দিলেন। হিরো আলম স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার সময় প্রকাশ্যে দুধ দিয়ে গোসল করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো জীবন ধুয়ে ফেলে নতুন জীবনে প্রবেশ। সংবাদমাধ্যমের ভাষায়, এটা ছিল এক ধরনের প্রতীকী শুদ্ধিকরণ।
বাংলাদেশি জাতি বিষয়টি খুব মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছে।
এখন দেখা যাচ্ছে, বিশ্বকাপে ব্রাজিলের অনেক পুরনো সমর্থক হঠাৎ ঘোষণা করছে, “ছোটবেলা থেকেই আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক।”
বন্ধুরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করছে, “কিন্তু গতকালও তো তুমি নেইমারের ছবি দিয়ে কভার ফটো বানাইছিলা?”
সে রহস্যময় হাসি দিয়ে বলছে, “ভাই, ওটা ছিল গোসল-পূর্ব যুগ।”
শোনা যাচ্ছে, দেশে এখন দুধের নতুন বাজার তৈরি হয়েছে। এক লিটার, দুই লিটার নয়— “দলবদল প্যাকেজ” নামে বিশেষ অফার আসছে।
ব্রাজিল থেকে আর্জেন্টিনা হতে লাগবে তিন লিটার
ইংল্যান্ড থেকে স্পেন হতে লাগবে দুই লিটার
জার্মানি থেকে পর্তুগাল হতে লাগবে দেড় লিটার
আর রাজনৈতিক দল পরিবর্তনের জন্য লাগবে এক বালতি, দুইজন সাক্ষী এবং একটি সংবাদ সম্মেলন

আসলে ফুটবল সমর্থকদের আমরা অযথা দোষ দিই। তারা তো রাজনীতিবিদদের কাছ থেকেই শিখেছে।
বাংলাদেশে বহুদিন ধরেই এক অলিখিত রাজনৈতিক দর্শন চালু আছে- আদর্শ পরিবর্তনের সবচেয়ে দ্রুত মাধ্যম হলো দুধ-গোসল।
গতকাল পর্যন্ত যিনি বলছিলেন, “এই দল দেশের সর্বনাশ করেছে”, আজ তিনি সেই দলের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলছেন, “আমার রাজনৈতিক চেতনার জন্মই এই দলের আদর্শ থেকে।”
এত দ্রুত পরিবর্তন দেখে বিজ্ঞানীরাও হতবাক। তারা গবেষণা করে দেখেছেন, আলোর গতির চেয়েও দ্রুত যদি কিছু হয়, সেটি হলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক উপলব্ধি।
বিশ্বকাপের কারণে এখন ফুটবল সমর্থকদের মধ্যেও সেই বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে।

এভাবে চলতে থাকলে বিশ্বকাপ ফাইনালের আগেই দেশে দুধের সংকট দেখা দিতে পারে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
আমার ব্যক্তিগত প্রস্তাব হলো, ফিফা যেন অবিলম্বে নতুন একটি নিয়ম চালু করে। কোনো সমর্থক দল পরিবর্তন করতে চাইলে তাকে প্রথমে স্থানীয় থানায় আবেদন করতে হবে। এরপর একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দুধ দিয়ে গোসল সম্পন্ন করতে হবে। তারপর নতুন জার্সি পরার অনুমতি দেওয়া হবে।
নচেৎ একদিন দেখা যাবে, ফাইনালের ৮০ মিনিট পর্যন্ত ব্রাজিলের পতাকা নিয়ে বসে থাকা লোকটি ম্যাচ শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট পরে বলছে—
মেসিকে আমি তখন থেকেই ভালোবাসি, যখন তিনি ক্লাস থ্রিতে পড়তেন

সোহেল অটল: সাংবাদিক, সাহিত্যিক