পাহাড়ি উপকথার রাজকুমারী সাইরু

রিসোর্ট বনাতে গিয়ে প্রকৃতিকে বিরক্ত করা হয়নি। ছবি: সাইরু হিল রিসোর্ট

নিঃসঙ্গ পাহাড়ি কন্যার উপকথা। কন্যার নাম সাইরু। তার নামেই এখন বিলাসি এক রিসোর্টের নাম- সাইরু হিল রিসোর্ট। বান্দরবানের কন্যা সাইরু ছিলো ম্রো রাজকুমারী। বাবা ছিলেন ম্রোদের রাজা। তারা থাকতো বান্দরবানের টঙ্কাবতী ও শুয়ালক এলাকায়। ওই এলাকায় থাকে মারমারাও। আছে তঞ্চঙ্গ্যা, বম, বড়ুয়া ও খুমিদের বসতি।
রাজকন্যা সাইরুর খাতির ছিলো সবার সাথে। মারমাদের সাথে মিশতো সে। তঞ্চঙ্গ্যা, বম, বড়ুয়া ও খুমিদের সাথেও ভাব ছিলো। কিন্তু ভাব যতোই থাকুক, ওখানে এক জাতের ছেলের সাথে অন্য জাতের মেয়ের বিয়ে হওয়ার রীতি নেই। এটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় সাইরুর। ম্রো কোনো ছেলে নয়, তার ভালো লেগে যায় অন্য জাতের এক রাজকুমারকে। ভালো লাগার পর নিয়মিত দেখা করতে শুরু করে। বিষয়টা চোখে পড়ে সবার। শুরু হয় সামাজিক চাপ। সামাল দিতে না পেরে রাজকুমার বিয়ে করে ফেলে নিজের জাতের এক মেয়েকে।

পাহাড়ের চূড়ায় এই রিসোর্ট পর্যটকদের কাছে ছড়িয়ে দিয়েছে সাইরুর উপকথা। ছবি: সাইরুর বেশ কয়েকটি দৃশ্য নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা

সইতে পারেনি সাইরু
বিচ্ছেদ সইতে পারেনি সাইরু। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তারপর আর ফিরে আসেনি।
উপকথার কাহিনি দৌড়ায় নানাদিকে। কেউ বলেন, বনবাসে থেকেই রাজকুমারী সাইরু মারা গেছে। আবার জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলেও গল্প চালু আছে।
ম্রো ভাষায় ‘সাই’ অর্থ ‘পবিত্র’। আর ‘রু’ অর্থ ‘আত্মা’। তাহলে ‘সাইরু’ অর্থ দাঁড়ায় ‘পবিত্র আত্মা’।

মুকুট পাহাড় থেকে লোগো
এই আত্মা হারিয়ে গেলো, তবে সাইরুর গল্পটা সেখানেই হারায়নি। রাজকুমার ও রাজকুমারীর গল্পকে ‘অবলম্বন’ করে পাহাড়ের চূড়ায় জেগে উঠলো একজোড়া গাছ, যুগল হয়ে বেড়ে উঠতে থাকলো তারা। একটি জড়িয়ে আছে অন্যটিকে। এই এলাকাকে সবাই মুকুট পাহাড় বলে ডাকে। আর ওখানকার যুগল গাছকেই লোগো হিসেবে ব্যবহার করছে ‘সাইরু হিল রিসোর্ট’। ওখানে বেড়াতে গেলে রাতের অন্ধকারে পাহাড় থেকে এখনো নাকি ভেসে আসে নিঃসঙ্গ সাইরুর কান্না।

পাহাড়ের চূড়ায় এই রিসোর্ট পর্যটকদের কাছে ছড়িয়ে দিয়েছে সাইরুর উপকথা। সেই উপকথার ওপর ভর করেই রিসোর্টটি গড়ে তুলেছিলেন রাংলাই ম্রো। তিনি ম্রো উপজাতির হেডম্যান। পাহাড়ে যে যুগল গাছ জেগে উঠেছে, তার জমিতেই। তিনি যোগাযোগ করেন কয়েকজন উদ্যোক্তার সাথে। এতে সাইরুর গল্প দাঁড়িয়ে যায় মোহনীয় কাঠামো নিয়ে।
শুরুর দিকে এর নাম ছিলো ‘সাইরু ইনডিজেনাস কালচার প্রমোশন অ্যান্ড হিল রিসোর্ট লিমিটেড’। তখন কেবল পর্যটকদের জন্য এই প্রজেক্টটি ছিলো না। এর উদ্দেশ্য ছিলো স্থানীয় সংস্কৃতিকে প্রমোট করা। সেইসাথে তাদের রোজগারের ব্যবস্থা করা। তবে নিঃসঙ্গ পাহাড়ে থাকার যায়গা হিসেবে পর্যটকদের কাছে ধীরে ধীরে প্রিয়তা পেতে থাকে রিসোর্টটি। পরে এর নাম বদলে রাখা হয় ‘সাইরু হিল রিসোর্ট লিমিটেড’।


নকশায় আছে বাঁশ, বেত ও কাঠের মতো প্রাকৃতিক উপাদান। ছবি: সাইরু হিল রিসোর্ট
সাইরুর একেকটা কটেজে আছে মোহ-মায়া

মেঘ ঢুকে যায় যখন তখন
প্রতিটি কামরার নকশায় আছে বাঁশ, বেত ও কাঠের মতো প্রাকৃতিক উপাদান। দিনের আলোতে বিদ্যুৎবাতি জ্বেলে রাখতে হয় না। বাতাসে যখন মেঘ ভাসে, যখন তখন ঢুকে যায় ঘরে, কখনো বারান্দায়।
আতিক বলেন, ‘পর্যটকদের আনাগোনায় এই এলাকার কিছু পাহাড় ন্যাড়া হয়ে গেলেও সাইরু এখনো সবুজ।’
পাহাড়ে জীববৈচিত্র, পরিবেশ ও প্রকৃতি মাথায় রেখে গড়ে তোলা সাইরুর ইট-কাঠের কাঠামো ২০২৩ সালে পেয়েছে স্থাপত্যের মর্যাদা, ‘আর্কেশিয়া’ পুরস্কার।
সাইরু এলাকায় যে গাছগুলো লাগানো হয়েছে, সেগুলো স্থানীয় উপজাতিদের গাছ বলে জানিয়েছেন, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আতিক। এমনকি ফুল ও অলঙ্কারের গাছগুলোও প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে গেছে। রিসোর্টের ভেতর আছে কৃত্রিম সরোবর। এই সরোবরগুলোতে জমিয়ে রাখা হয় বৃষ্টির পানি। রিসোর্টে প্রতিদিন যে পানি খরচ করতে হয়, সেগুলোও যায় সরোবর থেকে।
সাইরুর একেকটা কটেজে আছে মোহ-মায়া। আছে বিলাসিতা। এক্সিকিউটিভ ও প্রিমিয়াম কামরার ডিজাইন তুলনাহীন। আছে বাথটাবসহ বিশালবাথরুম। খোলা টেরেস।
সাগরের পিঠ থেকে ১৭৭৫ ফুট উঁচুতে এই রিসোর্ট। এখানে থাকতে হলে গুনতে হয় চড়া দাম। গরিবানা হালে থাকতে চাইলেও এক রাতের জন্য দশ হাজার টাকার বেশি দরকার হয়।

শহর থেকে এক ঘণ্টার পথ
বান্দরবান শহর থেকে থানচির দিকে যেতে হবে ১৮ কিলোমিটার। সেখানকার শুয়ালক এলাকায় ‘সাইরু হিল রিসোর্ট’। রিসোর্টটি চিম্বুক সড়কের পাশেই। যেতে হলে শহর থেকে চান্দের গাড়ি ভাড়া করতে হয়। সময় লাগে ঘণ্টাখানেক।

কেবল রোমাঞ্চকর সুন্দর
এরপর কেবল রোমাঞ্চকর সুন্দর। চারদিকে খোলা প্রকৃতি। রিসোর্ট ফুঁড়ে মেঘ ভাসে। শীতে পাহাড় ঢেকে দেয় কুয়াশা। ভোরের সূর্য এসে দাঁড়ায় সাইরুর মাথার পূবে, দিন শেষে ঢলে পড়ে পাহাড়ের আড়ালে।

পর্যটক ডাকে পাখিরা
মাঝেমধ্যে পাখিরা ডেকে নিয়ে যায় পর্যটকদের। পাশের ট্রেইল ধরে হাঁটা শুরু করলে পাখিরা ডাকতে শুরু করে। ডেকে ডেকে নিয়ে যায় উপজাতিদের গ্রামে, সাইরুর বাবার রাজত্বে।

খরচা-পাতি
সাইরুতে পাঁচ-রকমের ২০টি কামরা আছে। সাংগু ভিউ, সাংগু ভিউ উইথ টেরেস, এক্সিকিউটিভ, প্রিমিয়াম এবং কটেজ রুম। সর্বনিম্ন দুইজন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ দশজন একসাথে এক কামরায় থাকা যায়। এক রাত থাকার জন্য ভাড়া সর্বনিম্ন ১০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২৫,০০০ টাকা। কখনো কখনো পনেরো থেকে ২০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়।
একবেলা খাওয়ার জন্য খরচ করতে হয় পাঁচ-সাতশো টাকা। রান্না করার জন্য তরি-তরকারিগুলো সংগ্রহ করা হয় স্থানীয় বাজার থেকে।

আরো সুবিধা
সকালের নাশতা, এলইডি টিভি, ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক, চব্বিশ ঘণ্টা রুম সার্ভিস, নামাজের কাপড়, হেয়ার ড্রায়ার, মিনি বার, লন্ড্রি, অতিরিক্ত বিছানা, নিরাপদ লকার, সুইমিং পুল।
মালামাল তোলা এবং বয়স্কদের কামরায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য আছে গো-কার্ট। সাইরুর মোট ২৯ কামরায় সেবার জন্য রাখা আছে পর্যাপ্ত লোক। আছে পার্কিং এবং চালকদের থাকার ব্যবস্থা।

সাইরু থেকে খুব কাছে…
সাইরু থেকে খুব কাছে নিলগিরি, চিম্বুক, শৈল প্রপাত, মেঘলা, স্বর্ণমন্দির ও নীলাচল। যাওয়া যায় সাংগু নদীতে নৌকা ভ্রমণে। ওই ভ্রমণে দেখা হবে ঝরনা বান্দরনী এবং স্রোতস্বিনীর সাথে।

Leave a reply

    Join Us
    • Facebook
    • Youtube
    Deal Of The Month
      Categories

      Advertisement

      Loading Next Post...
      Follow
      Search Trending
      Popular Now
      Loading

      Signing-in 3 seconds...

      Signing-up 3 seconds...