সুকুমার রায়ের ‘হ য ব র ল’-এ কাক্কেশ্বর কুচকুচে স্লেট-পেন্সিল নিয়ে অঙ্ক কষতে বসে বলেছিল— “সাত দুগুণে চোদ্দোর নামল চার, হাতে রইল পেন্সিল!” ইরান বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চালানো যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান দিতে গিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ঠিক এই ‘পেন্সিল-মার্কা’ হিসাবের আশ্রয় নিয়েছে। গত কয়েক দশকে যুদ্ধের ময়দান থেকে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা যা-ই শিখে থাকুন না কেন, গণিতের ক্ষেত্রে তারা যে এখনও সেই কাক্কেশ্বর কুচকুচের কাছেই পড়ে আছেন, তা তাদের দেওয়া যুদ্ধের খরচের খতিয়ান দেখলেই স্পষ্ট হয়। প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা

মার্কিন সামরিক শক্তির আকাশচুম্বী দম্ভ আর বাস্তব ক্ষয়ক্ষতির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে যে এক বিশাল গাণিতিক ব্যবধান আছে, তা ঢাকতে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা এখন আক্ষরিক অর্থেই সেই খ্যাপাটে গণিতশাস্ত্রে দীক্ষা নিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে পেন্টাগন যে হিসাব বিশ্ববাসীর সামনে পেশ করেছিল, বাস্তব চিত্র তার চেয়ে বহুগুণ ভয়াবহ এবং ব্যয়বহুল। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর যুদ্ধের প্রাথমিক খরচ ২৫ বিলিয়ন ডলার দাবি করলেও, সিএনএন-এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে প্রকৃত অঙ্কটা আসলে এর দ্বিগুণ—প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। গত বুধবার হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির সামনে পেন্টাগন কর্মকর্তা জুলস জে হার্স্ট যে হিসাব পেশ করেছেন, তা যেন অনেকটা ‘হাঁসজারু’ বা ‘বকচ্ছপ’ গোছের। তিনি কেবল ব্যবহৃত গোলাবারুদ আর সমরাস্ত্রের খরচটুকু দেখিয়ে হাত ধুয়ে ফেলেছেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর ইরানের বিধ্বংসী হামলায় যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক পরিকাঠামো ধুলোয় মিশে গেছে, মার্কিন কর্মকর্তারা তা অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে স্লেট থেকে মুছে ফেলেছেন।
বিশেষ করে ইসরেইলি আগ্রাসনের দোসর হিসেবে কাজ করতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যে কয়েক দশকের সাজানো সামরিক অবকাঠামো তছনছ হয়েছে, তা পুনর্গঠন করতে এখন পেন্টাগনকে চড়া মাশুল দিতে হচ্ছে। খবর বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুদ্ধের প্রথম ৪৮ ঘণ্টাতেই বাহরাইন, কুয়েত, ইরাক, আরব আমিরাত ও কাতারের অন্তত নয়টি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক স্থাপনা ইরানের নিখুঁত নিশানায় পড়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জর্ডানে থাকা অত্যন্ত বহুমূল্য এবং গর্বের ‘থাড’ (THAAD) মিসাইল সিস্টেমের রাডার যখন ধ্বংস হয়, তখন পেন্টাগনের হিসাবের খাতায় সেই বড়সড় শূন্যটি আর দেখা যায়নি। একইভাবে সৌদি আরবে মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি ‘ই-থ্রি সেন্ট্রি’ বিমান যখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো, তখন হার্স্ট সাহেব নির্লজ্জের মতো স্বীকার করেছেন যে, বিদেশের মাটিতে ধ্বংস হওয়া এসব সম্পদের কোনো চূড়ান্ত হিসাবই নাকি তাদের কাছে নেই। প্রশ্ন জাগে, যে দেশ মহাকাশ থেকে সুঁইয়ের মাথা দেখে ফেলার দাবি করে, বিদেশের মাটিতে নিজেদের আস্ত একটা বিমান বা রাডার সিস্টেম ধ্বংস হওয়ার হিসাব তাদের কাছে নেই কেন? উত্তরটা হয়তো সেই পেন্সিল-অঙ্কই—যা সুবিধামতো হাতে রেখে দেওয়া হয়েছে।
মজার ব্যাপার হলো, এই বিশাল আর্থিক ধসের দায়ভার এখন কৌশলে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর ঘাড়ে চাপানোর ফন্দি আঁটছে ওয়াশিংটন। পেন্টাগন আশা করছে, ধ্বংস হওয়া ঘাঁটিগুলো নতুন করে গড়তে এই পার্টনার দেশগুলোই পকেট থেকে অর্থ জোগাবে। অথচ ২০২৭ অর্থবছরের জন্য পেন্টাগন যখন ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের একটি দানবীয় বাজেট প্রস্তাব জমা দিচ্ছে, সেখানে ইরান যুদ্ধের এই প্রকৃত খরচের কোনো প্রতিফলনই নেই। কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধের অনিশ্চয়তার কারণে নাকি সঠিক অঙ্কটা সেখানে বসানো যায়নি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মার্কিন প্রতিরক্ষা বাজেটে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত যে অস্বাভাবিক উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে সাধারণ জনগণের করের টাকাই তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহৃত হতে যাচ্ছে। ওয়াশিংটনের অন্দরেই এখন গুঞ্জন উঠছে, ইসরায়েলি স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে নিজেদের কোষাগার কেন এভাবে উজাড় করা হবে?
তথাকথিত সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের দম্ভ নিয়ে ইরানের ওপর চড়াও হওয়া মার্কিন বাহিনী এখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শুধু ভাঙা স্লেটে কাল্পনিক অংক মেলাচ্ছে। দিনশেষে পেন্টাগনের এই গোঁজামিলের পাহাড় দেখে আবারও সেই কালজয়ী চরিত্রের কথাই মনে পড়ছে। তাদের সমস্ত তত্ত্ব, প্রযুক্তি আর বিশাল বাজেটের শেষ কথা সেই একটাই— “সাত দুগুণে চোদ্দোর নামল চার, হাতে রইল পেন্সিল!”