
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ মানেই অবধারিতভাবে ব্রাজিলের জয়জয়কার—গত ৯২ বছরের ইতিহাস অন্তত এই কথাই বলছিল। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘সি’-এর প্রথম হাই-ভোল্টেজ ম্যাচটিতে সেই চেনা সমীকরণ সম্পূর্ণ এলোমেলো করে দিল মরক্কো। নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে উপচে পড়া ৮০,৬৬৩ জন দর্শকের সামনে মরক্কোর হাই-ইনটেনসিটি ফুটবলের সামনে রীতিমতো ধুঁকতে দেখা গেল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। যদি ৩১ মিনিটে ভিনিসিউস জুনিয়রের সেই একক নৈপুণ্যের জাদুকরী গোলটি না আসত, তবে কার্লো আনচেলত্তির বিশ্বমঞ্চে অভিষেকটা বিষাদময় হতে পারত। ১-১ গোলের এই ড্রয়ে মরক্কো মাঠ ছেড়েছে বুক চিতিয়ে, আর ব্রাজিল ড্রেসিংরুমে ফিরেছে একরাশ অস্বস্তি আর দুশ্চিন্তা নিয়ে।
ম্যাচের শুরু থেকেই মাঠে আফ্রিকার সিংহদের গর্জন স্পষ্ট ছিল। নেইমারের চোটের কারণে অনুপস্থিতি এবং মাঝমাঠে কাসেমিরো ও ব্রুনো গিমারায়েসের মন্থরতা কাজে লাগিয়ে মরক্কো প্রথম আধঘণ্টায় ব্রাজিলকে কোনো পাত্তাই দেয়নি। ম্যাচের প্রথম ৩০ মিনিটে মরক্কো ব্রাজিলের বক্সে একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে ১২টি শট নেয়।
সেই আক্রমণের ধারাবাহিকতায় ২১ মিনিটে স্তব্ধ হয়ে যায় গ্যালারির হলুদ সমুদ্র। রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ব্রাহিম দিয়াজের নিখুঁত পাস খুঁজে নেয় ইসমাইল সাইবারিকে। ব্রাজিলের ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েল ও মার্কুইনহোসকে বোকা বানিয়ে এগিয়ে আসা গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকারের মাথার ওপর দিয়ে আলতো চিপে বল জালে জড়ান সাইবারি (১-০)। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রক্ষণভাগকে তখন অনভিজ্ঞ ও ছন্নছাড়া দেখাচ্ছিল।
গোল হজমের পর কিছুটা সম্বিত ফেরে সেলেসাওদের। ব্রাজিলের সাম্বা ফুটবল উধাও হলেও ব্যক্তি-নৈপুণ্যের অভাব কখনোই ছিল না। ৩১ মিনিটে বাঁ প্রান্ত থেকে ব্রুনো গিমারায়েসের সাথে ওয়ান-টু-ওয়ান খেলে বল নিয়ন্ত্রণে নেন ভিনিসিউস জুনিয়র। মরক্কোর ডিফেন্ডার নীল এল আয়নাউইকে চমৎকার ড্রিবলিংয়ে পরাস্ত করে ডান পায়ের কোণাকুণি জোরালো শটে পরাস্ত করেন ইয়াসিন বুনোকে। ব্রাজিলের জার্সিতে নিজের ৫০তম ম্যাচে এটি ভিনির ১০ম আন্তর্জাতিক গোল। এই গোলের ওপর ভর করেই সমতায় ফেরে ব্রাজিল।
প্রথমার্ধের ভুল বুঝতে পেরে বিরতিতেই বড় পরিবর্তন আনেন ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তি। কাসেমিরো ও রজার ইবানেজকে তুলে তিনি মাঠে নামান ফ্যাবিনিও ও দানিলোকে। এই পরিবর্তনের ফলে ব্রাজিলের মাঝমাঠ ও ডিফেন্সে কিছুটা স্থায়িত্ব আসে। দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিলের বল পজিশন বাড়লেও (৫১.২%) তারা মরক্কোর রক্ষণদুর্গ ভাঙতে পারেনি। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে (৯০+৯ মিনিট) নিশ্চিত পরাজয় থেকে ব্রাজিলকে রক্ষা করেন অ্যালিসন। মরক্কোর এল আয়নাউইয়ের দূরপাল্লার শট প্রথমে ফিরিয়ে দেওয়ার পর, ফিরতি বলে আমাইমুনির শট শুয়ে থাকা অবস্থাতেই ডান হাত দিয়ে অবিশ্বাস্যভাবে ব্লক করেন লিভারপুল গোলরক্ষক।
ম্যাচ শেষে গ্যালারি এবং ফুটবল বোদ্ধাদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
বিশ্লেষকদের চোখ: ফুটবল বিশ্লেষকরা কার্লো আনচেলত্তির প্রথম অফিশিয়াল ট্যাকটিক্যাল সেটআপ নিয়ে বেশ কড়া সমালোচনা করছেন। লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে ৫ম হওয়া ব্রাজিল যে এখনো পুরোপুরি গুছিয়ে উঠতে পারেনি, এই ম্যাচ তারই প্রমাণ। মাঝমাঠের ধীরগতি এবং উইংয়ে রাফিনহাদের সুযোগ নষ্ট করার প্রবণতা বড় চিন্তার কারণ। তবে মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবির রণকৌশল প্রশংসিত হয়েছে বিশ্ব মিডিয়ায়। মরক্কো দেখিয়ে দিল যে ২০২২ সালের সেমিফাইনাল খেলাটা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না।
সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া: স্টেডিয়ামে উপস্থিত এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্রাজিলিয়ান সমর্থকরা দলের খেলা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে রক্ষণভাগের এমন ‘অগোছালো’ পারফরম্যান্স সমর্থকদের আশাহত করেছে। তবে নেইমারের অনুপস্থিতিতে ভিনিসিউস যেভাবে দলের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছেন, তা সমর্থকদের মনে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে।
ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি নিজেই স্বীকার করেছেন, “শুরুতে দলটা কিছুটা নার্ভাস ছিল এবং ভারসাম্যের অভাব ছিল। তবে প্রথম ম্যাচ দেখেই বিশ্বকাপের ভাগ্য নির্ধারণ করা যায় না।” আগামী শুক্রবার ফিলাডেলফিয়াতে হাইতির বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে মাঠে নামবে সেলেসাওরা।