হিমালয়ের নদীতে পাহাড় ধসে পড়ায় নেপালে দিয়েছে ভয়াবহ হড়পা বান। এতে তাসের ঘরের মতো উড়ে গেছে বাড়ি, সেতুসহ নানা অবকাঠামো। বুধবার রসুয়ার ভোতেকোশি নদীতে আছড়ে পড়েছিল এই বন্যা। সেটা তিব্বত থেকে বিশাল ঢল হিসেবে নেপালে ঢুকে যায়। এরপর ভোতেকোশি ও ত্রিশূল নদী হয়ে ঢলটি নিচের দিকে গড়িয়ে যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত নারায়ণী নদীতে গিয়ে মেশে।
এই হড়পা বানের টাইমলাইন প্রকাশ করেছে নেপালের গণমাধ্যম দ্যা কাঠমান্ডু পোস্ট। কাঠমান্ডু থেকে প্রতিবেদনটি করেছেন রাম কুমার।

বুধবার সকাল ৯টা বেজে ০৫ মিনিট, নেপালের জলবিদ্যা ও পানিসম্পদ গবেষণা কেন্দ্রের ‘বন্যা পূর্বাভাস বিভাগ জানতে পারে, একটি বিশাল হড়পা ঢল নেমে এসেছে নেপালের ভোতেকোশি নদীতে। এরপর এই হড়পা ভোতেকোশি থেকে ত্রিশূলীতে ঢুকে যায়। তারপর ছড়িয়ে যায় নিচের দিকে।
পূর্বাভাস বিভাগ জানিয়েছে, নদীর পানির উচ্চতা সংক্রান্ত তথ্য, বন্যার গতিপথ এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ক্ষতিগ্রস্ত জেলা, নদীতীরবর্তী এলাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ জনপদের বাসিন্দাদের আগেই সতর্কবার্তা এবং অ্যালার্ট পাঠানো হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। এর প্রায় ১৩ মিনিট পর, সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে রসুয়ার স্যাব রুবেসিতে অবস্থিত পানি পরিমাপক কেন্দ্রটি তথ্য পাঠানো বন্ধ করে দেয়। বন্ধ হওয়ার আগে ৮টা ৪০ মিনিটে স্টেশনটির সর্বশেষ পাঠে নদীর পানির উচ্চতা ছিল ১.৬২ মিটার। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই কেন্দ্রটির সতর্কতাসূচক স্তর হলো ৬ মিটার এবং বিপদসীমা ৯ মিটার।
এর প্রায় ১৫ মিনিট পর, কর্তৃপক্ষ জানতে পারে যে তিব্বত অংশ থেকে ভোটেকোশি নদীতে একটি বড় বন্যা বা ঢল প্রবেশ করেছে। সকাল ৯টা ১৫ মিনিট থেকে ৯টা ১৬ মিনিটের মধ্যে রসুয়া, নুওয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ানের নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্কতায় থাকার অনুরোধ জানিয়ে ৬ লক্ষাধিক সতর্কতামূলক এসএমএস পাঠানো হয়।
সকাল ৯টা ২০ মিনিটে বেত্রাবতী নদীর পানি পরিমাপক কেন্দ্রটিও তথ্য পাঠানো বন্ধ করে দেয়। কেন্দ্রটিতে পানির সর্বশেষ নথিভুক্ত উচ্চতা ছিল ৩.৫৫ মিটার।
সকাল ১০টা ২৮ মিনিটের মধ্যে বন্যা ধাদিং-গালছি এলাকায় পৌঁছানোর এবং পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মুগলিন অতিক্রম করার আশঙ্কা দেখা দেয়। এরপর কর্তৃপক্ষ পৃথিবী হাইওয়ে, মুগলিন-নারায়ণঘাট সড়ক এবং ত্রিশূলী নদীর তীরের বাসিন্দাদের জন্য নতুন করে সতর্কবার্তা পাঠায়।
সকাল ১১টা ২৬ মিনিটে ফুরকে (মালেখু) পরিমাপক কেন্দ্রে নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে। ঠিক ১৭ মিনিট পর, সকাল ১১টা ৪৩ মিনিটে ফুরকে নদীর একটি সেতুসহ বেশ কিছু অবকাঠামো বন্যায় ভেসে যায়। সকাল ১১টা ৫০ মিনিটের মধ্যে বন্যার পানি মালেখু এলাকায় পৌঁছে যায়।
দুপুর ১টায় বন্যা মুগলিন অতিক্রম করার খবর নিশ্চিত হওয়া মাত্রই কর্তৃপক্ষ দেবঘাট পর্যন্ত নদীতীরের অধিবাসীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানায়। দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে দেবঘাটে নদীর পানির উচ্চতা পৌঁছায় ৪.৭৬ মিটারে। প্রাথমিক ধারণায় বলা হয়েছিল, মূল ঢলটি বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে দেবঘাটে পৌঁছাবে এবং সে সময় পানির উচ্চতা প্রায় ৮ মিটারে উঠতে পারে।
দুপুর ২টা ১৪ মিনিটে কালিখোলা পরিমাপক কেন্দ্রে পানির স্তর বিপদসীমা ছাড়িয়ে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, কেন্দ্রটিতে সর্বোচ্চ ১২.৩ মিটার পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়।

বিকাল ৩টা ২০ মিনিটের মধ্যে বন্যা নারায়ণী-দেবঘাট অঞ্চলে পৌঁছে যায় এবং নদীর পানি তখনও ক্রমাগত বাড়ছিল। বিকেল ৪টায় দেবঘাটে নদীর পানি সর্বোচ্চ ৬.৫৭ মিটারে পৌঁছানোর পর তা কমতে শুরু করে।
সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটের মধ্যে দেবঘাটে নদীর পানির উচ্চতা কমে প্রায় ৪ মিটারে নেমে আসে। কারিগরি প্রতিবেদনের প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, এই বন্যায় অতিরিক্ত প্রায় ২ কোটি ঘনমিটার পানি বয়ে এসেছে।
সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ভূমিকম্প রেকর্ড হওয়ার পর থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে দেবঘাটে পানি কমতে শুরু করা পর্যন্ত —ভোতেকোশি থেকে ত্রিশূলী হয়ে মুগলিন, মালেখু ও দেবঘাট পর্যন্ত এই বন্যা পুরো পথ অতিক্রম করতে সময় নেয় প্রায় ১০ ঘণ্টা।
প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায়, ঢলটি নিম্নপ্রবাহে এগিয়ে যাওয়ার সময় পথের বেশ কয়েকটি নদী পরিমাপক কেন্দ্রের তথ্য আদান-প্রদান ব্যাহত হয়েছিল, তবে কর্তৃপক্ষ পুরো সময় জুড়েই নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষের জন্য অগ্রিম সতর্কবার্তা ও অ্যালার্ট দেওয়া জারি রেখেছিল।