বিশ্বের চোখ এখন আমেরিকায়। আলোচনা হচ্ছে তারকাদের নিয়ে। কোন স্টেডিয়াম কতো ডলার খরচ করে বানানো হয়েছে, সেগুলো নিয়ে। কিন্তু ইনফোজার আজকের প্রতিবেদনে সেসব কিছুই থাকছে না। থাকছে গাজার যুদ্ধাহত ফুটবলারদের আখ্যান। তারাও ফুটবল খেলতেন। এখনো খেলেন। কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা এই খেলোয়াড়দের নিয়ে একটি লেখা প্রকাশ করেছেন। লিখেছেন সাংবাদিক মারাম হুমাইদ। তিনি লেখাটার শিরোনাম দিয়েছেন, ‘বিশ্ব উদযাপন করছে। কিন্তু গাজা দূর থেকে বিশ্বকাপ দেখছে।

গাজা সিটির এক স্টেডিয়ামের নাম ‘প্যালেস্টাইন’। এখানে ক্রাচে ভর দিয়ে ফুটবল খেলছেন ২৪ বছর বয়সী আলী তাফেশ। তিনি ‘গাজা আল-ইরাদা’ নামের এক ফুটবল ক্লাবের সদস্য। ইরাদা অর্থ ইচ্ছা। তাহলে গাজা আল-ইরাদা মানে দাঁড়ায়, গাজার ইচ্ছা। এই ক্লাবের সব খেলোয়াড়রা অঙ্গ হারিয়েছেন ইসরাইলি হামলায়। আলী ও তার সতীর্থদের কাছে ফুটবল এখন কেবল খেলা নয়, মানসিকভাবে টিকে থাকার লড়াই। ফুটবলে তিনি ফিরে পেতে চান জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া সময়।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সময়ও গাজার চিত্রটা এমন ছিল না। আলী তাফেশ স্মৃতিচারণ করে জানান, চার বছর আগে বন্ধুদের নিয়ে ক্যাফেতে বসে বিশ্বকাপ দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার বাড়ি ধ্বংস হয়, মারা যান মা ও ভাই। আলী হারান একটি পা। সাবেক এই স্প্রিন্টার এখন ক্রাচে ভর দিয়ে দুই ঘণ্টা হেঁটে মাঠে আসেন অনুশীলনের জন্য। সেখানে যাতায়াতের ব্যবস্থা নেই। এমনকি বুট বা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জামও নেই।
দলের আরেক অভিজ্ঞ খেলোয়াড় ৪০ বছর বয়সী সাদী আল-মাসরি, সাঁতার ও ভলিবলে ফিলিস্তিনের জাতীয় দলের প্রতিনিধি ছিলেন। মাসরি বলেন, “আমাদের জন্য বিশ্বকাপ দেখা কষ্টের। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের কোয়ালিফায়ার খেলার কথা ছিল আমাদের। কিন্তু বিশ্ব আমাদের ভুলে গেছে।’
২০২২ সালের সাথে বর্তমানের তুলনা করে তিনি জানান, এখন গাজায় না আছে বিদ্যুৎ, না আছে বড় স্ক্রিন। মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে কোনোমতে খেলা দেখার চেষ্টা করবেন তারা।
ফিলিস্তিনি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা পিএফএ এর গত মার্চের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ১,০০৭ জন ক্রীড়াবিদ, কোচ ও কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এছাড়া ফুটবল মাঠ, জিমনেসিয়াম ও সুইমিং পুলসহ ২৬৫টি ক্রীড়া অবকাঠামো সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। অনেক স্টেডিয়াম এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা গাজার ফুটবল অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের জন্য ৫০টি মিনি-পিচ, ৫টি স্টেডিয়াম ও একটি একাডেমি তৈরির ঘোষণা দিয়েছিলো। কিন্তু সেগুলো এখনো প্রতিশ্রুতিই থেকে গেছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অজুহাতে ফিফা এখনো দৃশ্যমান কাজ শুরু করেনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, চলমান যুদ্ধে গাজায় ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ অঙ্গ হারিয়েছেন। এই চরম মানবিক বিপর্যয়ের মাঝেও ‘গাজা আল-ইরাদা’র কোচ হাতেম আল-মুগরেবি মনে করেন, এই বিশ্বকাপ একদিকে যেমন ফুটবল উৎসব, অন্যদিকে গাজার অ্যাথলেটদের জন্য এক চরম একাকীত্বের স্মারক।
বিশ্বকাপের এই বৈশ্বিক মঞ্চে গাজার খেলোয়াড়দের একটাই আকুতি- বিশ্বের ফুটবল ভক্ত ও খেলোয়াড়রা যেন ফিলিস্তিনিদের কথা ভুলে না যান। স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে এবং মাঠের আলোচনায় যেন ফিলিস্তিন থাকে। ক্রীড়া সমাজ যেন নীরবতা ভেঙে ফিলিস্তিনি অ্যাথলেটদের বেঁচে থাকার ও খেলার অধিকার ফিরিয়ে দিতে আসে।
-ইনফোজা ডেস্ক