
পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর রাষ্ট্রপতি হবেন কে? সেটা নিয়ে চলছে গুঞ্জন। আলোচনায় এসেছে ড. মুহম্মদ ওসমান ফারুকের নাম। তিনি কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের জ্যেষ্ঠ নেতাদের আলোচনায় ড. ওসমান ফারুকের নাম আছে বলে দলটির একটি সূত্র জানিয়েছে। সেইসাথে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে নিয়েও জোড় আলোচনা চলছে। এছাড়া বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও আবদুল মঈন খানের নামও আলোচনায় আছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন থাকলেও শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দৌড় থেকে ছিটকে পড়তে পারেন আলোচনায় থাকা শীর্ষ আমলা নাসিমুল গনি। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদের প্রাথমিক শর্ত হলো সংসদ সদস্য (এমপি) হওয়ার যোগ্যতা থাকা। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তির যদি এমপি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আইনি অধিকার না থাকে, তবে তার জন্য রাষ্ট্রপতির পদের পথও বন্ধ হয়ে যাবে। এখানে যুক্ত হচ্ছে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও-র কঠোর নিয়ম। আরপিও-এর ১২(এইচ) ও ১২(এফ) ধারায় বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের চাকরি থেকে অবসরের পর কেউ যদি চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বে থাকেন, তবে চুক্তি শেষ বা বাতিলের পরও অন্তত তিন বছর তিনি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অযোগ্য থাকবেন। একইভাবে সরকারি পদত্যাগ বা অবসরের পরও নির্ধারিত সময় পূর্ণ করার আইনি বাধ্যবাধকতা আছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিধিনিষেধের কারণে ওই শীর্ষ কর্মকর্তা আজ পদত্যাগ করলেও তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার সুযোগ নেই। আইনি এই জটিলতা ও তিন বছরের বাধ্যবাধকতা অতিক্রম না করা পর্যন্ত তার বঙ্গভবনে যাওয়ার পথ বন্ধই থাকছে।
ড. মুহম্মদ ওসমান ফারুক দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, বিশ্বব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরির সুবাদে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান এবং দলের প্রতি আনুগত্যের কারণে রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছেন।
ড. মুহম্মদ ওসমান ফারুক ১৯৭০ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তিনি অপারেশন ও মার্কেটিং বিষয়ে শিক্ষকতা করেন। পরে তিনি বিশ্বব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ পদে দীর্ঘদিন চাকরি করেন। বিশ্ব ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে ২০০১ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ওই বছর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন কিশোরগঞ্জ-৪ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভায় শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পান। বর্তমানে তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান।
সরকারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে আর কোনো সংশয় নেই। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সূত্রটি জানায়, অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি খুব শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন।
বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে বঙ্গভবন বা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বঙ্গভবনকেন্দ্রিক একটি সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি তার কর্মীদের শিগগির বঙ্গভবন ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। পদত্যাগের পর তিনি কিছুদিন বিশ্রামে থাকতে পারেন। চিকিৎসার জন্য বিদেশেও যেতে পারেন বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র জানিয়েছে, আগামী ৬ সেপ্টেম্বর রবিবার জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন বসতে পারে। ওই অধিবেশনেই দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে পারেন। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদত্যাগ, মৃত্যু বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়। সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীরই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
মো: সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংবিধান অনুযায়ী, তার পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা।
পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ফলে নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন , তা নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির উচ্চপর্যায়সহ রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।
প্রতিবেদন: মো. আল আমিন