সাগরে রহস্যময় ‘ইওপিএল’ জোন! যেভাবে চীনে তেল পাঠাচ্ছে ইরান

আল জাজিরা যেসব স্যাটেলাইট তথ্য পর্যালোচনা করেছে, তাতে দেখা যায়, গত মাসে 'হিউম্যানিটি' সহ ইরানের পতাকাবাহী অন্তত ১৮টি তেল ট্যাংকার ইওপিএল-এ পৌঁছার পর তাদের ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ করে ফেলেছিল

গত সপ্তাহের শনিবার, মালয়েশিয়ার উপকূলের দিকে রওনা দেয় ইরানি ওয়েল ট্যাংকার ‘হিউম্যানিটি’। উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছেই স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ করে দেয় জাহাজটি।

তারপর স্যাটেলাইট ট্র্যাকিংয়ে যে তথ্য দেখা যায়- একহাজার ৮৩ ফুট দীর্ঘ এই তেলবাহী ট্যাংকারটি মালয়েশিয়ার ‘ইস্টার্ন আউটার পোর্ট লিমিটস’ বা ইওপিএল-এ গিয়ে পৌঁছেছে। বারোশো বর্গকিলোমিটারের এই এলাকাটা দক্ষিণ চীন সাগ উপকূল থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে। 

চীনের কাছে ইরানের তেল বিক্রির নেটওয়ার্ক এবং ইস্টার্ন আউটার পোর্ট লিমিটস নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আল জাজিরা। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন এরিন হেল

সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্ভবত মাঝদরিয়ায় অন্য কোনো মধ্যস্থতাকারী জাহাজে খালাশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো ‘হিউম্যানিটি’। আর এ কারণেই ট্র্যাকিং বন্ধ করে ‘অদৃশ্য’ হয়ে যায় জাহাজটি। ইউএস-চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশনের তথ্য বলছে, এই তেলের ফাইনাল ডেস্টিনেশান হলো চীন। কারণ ঐতিহাসিকভাবে ইরান থেকে রফতানি হওয়া তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই কেনে চীন।

কয়েক দশক থেকেই আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা পাওয়া দেশ ইরান, রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার তেলের বাজার হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে ‘ইওপিএল’। সম্প্রতি পাওয়া স্যাটেলাইটের তথ্যে দেখা গেছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে টানা পাঁচ মাস ধরে চলা যুদ্ধ এবং ১৩ এপ্রিল থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত (ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌঅবরোধ থাকার পরও ‘ইওপিএল’-এ এই কাজ বিন্দুমাত্র থামেনি।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সামুদ্রিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ প্রকল্প ‘সি-লাইট’-এর পরিচালক রে পাওয়েল জানিয়েছেন, বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তিনি অন্তত এমন ৬২টি জাহাজ দেখেছেন। এই জাহাজগুলো পারস্য উপসাগর থেকে রওনা করে ‘ইওপিএল’ ও হংকং হয়ে চলে গেছে উত্তর চীনের দিকে।

এই জাহাজগুলোই ইরানের তেল বিক্রি নেটওয়ার্কের সাথে জড়িত বলে আল জাজিরার কাছে মন্তব্য করেছেন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির সিনিয়র রিসার্চ স্কলার এরিকা ডাউনস।

তিনি বলেন, “ইরান থেকে চীনগামী অপরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক জলসীমায় এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে স্থানান্তর করা হয়। তেলের আসল উৎস গোপন রাখতে চীনে পৌঁছার আগে বেশ কয়েকবার হাতবদলও করা হয়।”

তিনি বলেন, “চীনের ছোট শোধনাগারগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক ব্যবস্থাকে পরোয়া করে না। তাই তারা কম দামে ইরান থেকেই তেল কিনে নেয়।”

ইয়োকোসুকা কাউন্সিল অন এশিয়া-প্যাসিফিক স্টাডিজ-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কর্মসূচির পরিচালক এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ চার্লি ব্রাউন বলেন, “মালয়েশিয়ার ইওপিএল এলাকায়, যেখানে জাহাজ নোঙর করে, সেটা এখনো আগের মতোই কর্মমুখর।”

ইওপিএল এলাকাটি মালয়েশিয়ার মূল আঞ্চলিক জলসীমার বাইরে হলেও তাদের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে। এখানে মূলত মাছশিকারিদের অধিকার থাকে। মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে হওয়ায় এই এলাকায় টহল দেওয়া কঠিন।

তবে কুয়ালালামপুর সম্প্রতি তাদের আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। গত জুনে মালয়েশিয়া তাদের ‘একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন’ সংশোধন করেছে। এতে সরকারের অনুমতি ছাড়া তাদের আইনি সীমানার মধ্যে অবৈধ নোঙর করা, জ্বালানি সরবরাহ বা “বাংকারিং” এবং জাহাজ থেকে জাহাজে পণ্য স্থানান্তর বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।

এ বিষয়ে আল জাজিরার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

গত বৃহস্পতিবার আল জাজিরা যেসব স্যাটেলাইট তথ্য পর্যালোচনা করেছে, তাতে দেখা যায়, গত মাসে ‘হিউম্যানিটি’ সহ ইরানের পতাকাবাহী অন্তত ১৮টি তেল ট্যাংকার ইওপিএল-এ পৌঁছার পর তাদের ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ করে ফেলেছিল। এর বাইরে ‘ডোর’ নামের আরেকটি ইরানি তেল ট্যাংকারকে মালাক্কা প্রণালী দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ফিরে যেতে দেখা গেছে। যা সম্ভবত সম্প্রতি এই এলাকা থেকে কাজ শেষ করে ফিরে যাচ্ছিল।

এছাড়া বৃহস্পতিবার ওই এলাকায় অন্তত ৫০টি মার্কিন বা ইইউ নিষেধাজ্ঞা থাকা জাহাজ ‘এআইএস’ সংকেত ছড়াচ্ছিল, যার মধ্যে ইরানের পতাকাযুক্ত তিনটি কার্গো ও কনটেইনার জাহাজও ছিল। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ট্র্যাকিং বন্ধ রাখা ‘অদৃশ্য’ জাহাজের সংখ্যা এই এলাকায় আরোবেশি হতে পারে।

মার্কিন অর্থসচিব স্কট বেসেন্ট বলেছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে চীনা শোধনাগারগুলোর ইরানি অপরিশোধিত তেল কেনার পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইওপিএল- এর মতো শক্তিশালী নেটওয়ার্কগুলোর কারণে বাকি তেলের বিক্রি এখনো সচল আছে।

ওয়াইসিএপিএস-এর বিশেষজ্ঞ চার্লি ব্রাউন বলেন, “নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এগুলো থামানো যাবে না। নিষেধাজ্ঞার কারণে বিকল্প বাজার গড়ে উঠছে। গড়ে উঠছে মূল্য পরিশোধের বিকল্প ব্যবস্থাও।”

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...