সুদানে মৃত্যুযাত্রা: এল-ফাশার থেকে তাওইলা, ৫০ কিলোমিটার পথে নরকের গল্প

চব্বিশে ৩৬ দিনে কতো লোককে হত্যা করেছেন শেখ হাসিনা?
চৌদ্দশ’! জাতিসংঘের হিসাব থেকে এমন একটা ধারণা পাওয়া গেছে। আর তার দীর্ঘ পনেরোবছরের শাসনে হত্যা করা হয়েছে আরো অনেক। তবে সেই সংখ্যাটা হয়তো লাখের ঘরে যাবে না।

কিন্তু সুদানে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় হত্যা করা হয়েছে দুই হাজারেরও বেশি নিরস্ত্র বেসামরিককে। আর পুরো সংঘাতে প্রাণ গেছে দেড় লাখেরও বেশি মানুষের। পুরুষদের চোখের সামনে ধর্ষণ করা হচ্ছে তাদের মা, স্ত্রী এবং কন্যাদের।

দেশটিতে নেমে এসেছে মানবিক বিপর্যয়। সেখানকার ছবিগুলো হরর চলচ্চিত্রকেও হার মানায়। এক কোটিরও বেশি মানুষ এখন বাড়ি-ঘর ছেড়ে পথে পথে ঘুরছে। তাদের মাথার ওপর ছাদ নেই। বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা নেই।
অথচ এই ঘরহারা মানুষদের আছে সোনার খনি। কিন্তু কেবল খনি থাকলেই হবে না, খনি থেকে সোনা উত্তোলন করে সেটাকে বাজারজাত করার কৌশল জানা নেই সুদানিদের। এতে সুবিধা নিচ্ছে আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়রা। এরা কায়দা করে সোনা বাগিয়ে নিচ্ছে। খনি থেকে সোনা তুলতে গিয়ে হয়রান হচ্ছে সুদানিরাই। খনিধসে মৃত্যু হয় তাদেরই।

সুদানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় ২০২৩ সালের এপ্রিলে। দেশটির সেনাবাহিনী ও র‌্যবা আরএসএফ এর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে এই যুদ্ধ। এতে বাতাস দিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাধর দেশগুলো। এই বাতাসের প্রভাবে দেশটিতে নেমে আসে দুর্ভিক্ষ। সম্প্রতি সেনাবাহিনীকে হটিয়ে দারুফুরের রাজধানী এল-ফাশারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে আরএসএফ। এরপর সেখানে শুরু হয় নৃশংস গণহত্যা। ১৮ মাস অপরোধের পর র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘরহারা লোকদের ওপর। বাস্তচ্যুত এই পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছিলো সড়কে।

এই নৃশংসতার টুকরো কিছু ঘটনা প্রকাশ করেছে ডেইলি মেইল। একট ভিডিওতে দেখা গেছে, মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে একের পর এক হত্যা করছে আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফ। কিছু ক্লিপে দেখা গেছে লাশের স্তূপ।

মানুষের একটা দলকে হত্যা করার সময় সামরিক পোশাকসহ ছবি তুলতে দেখা গেছে আল-ফতেহ আবদুল্লাহ ইদ্রিসকে। লোকগুলো তখন তার কাছে জীবন ভিক্ষা চাইছিলো। অন্য একটা ক্লিপে গর্ব করে এই হত্যার দায় স্বীকার করে নিতে দেখা গেছে ইদ্রিসকে।

কোনো ভিডিওতে দেখা গেছে, সশস্ত্র লোকেরা মৃতদেহের উপর উদযাপন করছে।

যুদ্ধজুড়ে চলছে যৌন সহিংসতা। নারীদের ধর্ষণ এবং যৌন দাসে পরিণত করার খবরও পাওয়া গেছে। যারা সেখান থেকে বেঁচে পালিয়েছেন, তারা যৌন দাসত্ব এবং ধর্ষণের কথা জানিয়েছেন।

গেজেইরা রাজ্যের মাদানিতে থাকেন ৩০ বছর বয়সী হামিদা। ফজরের নামাজের পর তাকে ধর্ষণ করতে আসে এক লোক। বাধা দিলে তার ছোট মেয়েকে ধর্ষণ করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। এরপর এদের মধ্যে দুইজন তার হাত বেঁধে দেয়। তার মেয়ের সামনেই ধর্ষণ করা হয় তাকে।

ওমিনা নামে এক নারীর কথা তুলে ধরেছে ডেইলি মেইল। রাত নয়টার পর চাবুক হাতে নিয়ে এক লোক আসে। তার মেয়েকে ধরে অন্য ঘরে নিয়ে যায়। পাশের ঘর থেকে মেয়ের চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলেন ওমিনা।

ধর্ষণ এবং গণধর্ষণের পাশাপাশি, আরএসএফ সেনারা নারীদের মারধর করেছে। ধারালো ব্লেড দিয়ে আঁচর টেনেছে। শরীরে ঢেলে দিয়েছে গলে যাওয়া গরম তরল।

পাঁচ সন্তানের এক মা জানান, চোখের সামনে হত্যা করা হয়েছে তার ষোল বছর বয়সি ছেলেকে। আরএসএফের লোকেরা ছুরি দিয়ে তাদের মাথা কেটে ফেলতে চেয়েছিলো বলেও পালিয়ে যাওয়া অনেকে জানিয়েছেন।

মাইলের পর মাইল হেঁটে পাশের এলাকা তাওইলায় পালিয়ে গেছেন তারা। এল-ফাশার থেকে তাওইলার দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার। এই পথটুকু যেতে দেখা গেছে অসংখ্য লাশের সারি। ভয়াবহ এই যাত্রায় শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পেরেছে খুব কম লোকই। এদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, পুরুষেরা বেঁচে নেই।

এল-ফাশারের ঘটনা নিয়ে আল জাজিরায় লিখেছেন তেহরানভিত্তিক সাংবাদিক মাজিয়ার মোতামেদি। তিনি জানান, আলখির ইসমাইল নামের এক তরুণ সুদানী তাওইলায় পালিয়ে বাঁচতে পেরেছেন। তার দলে ছিলো ৩০০ লোক। তাকে ছাড়া আর কাওকে বাঁচিয়ে রাখা হয়নি। ইসমাইলের এক সহপাঠি যোদ্ধাদের মধ্যে ছিলো। সেই তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।

নাতি-নাতনিদের সাথে পালিয়ে যাওয়া ফাতিমা আব্দুল রহিম জানিয়েছেন, তিনি পাঁচদিন ধরে হেঁটে তাওইলায় পৌঁছান। শহর থেকে পালিয়ে বাঁচা রাওয়া আবদাল্লা নামে এক তরুণী বলেন, তার বাবা নিখোঁজ রয়েছেন।

বেঁচে যাওয়া লোকেরা লিঙ্গ, বয়স এবং জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে আলাদা করছিলো। মুক্তিপণের জন্য আটকে রাখা হচ্ছিলো অনেককে। পণবাবদ চাওয়া হচ্ছে ৫০ থেকে ৩০ লাখ সুদানি পাউন্ড।

এসব নৃশংসতা কেবল আরএসএফ করছে না। দীর্ঘ এই লড়াইয়ে নৃশংসতা রয়েছে সেনাবাহিনীরও। এখন সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আছে সুদানের উত্তর এবং পূর্বাঞ্চল। এই বাহিনীকে মদদ দিচ্ছে মিশর।

সুদানের সেনাবাহিনীর মূল সহায়ক দেশ মিশর। দেশটির সঙ্গে স্বার্থ জড়িয়ে আছে মিশরের। আছে বিশাল সীমান্ত। একইসঙ্গে দুই দেশের মধ্যে আছে নীল নদ। তাছাড়া সেনাপ্রধানের সাথে নামের মিল রয়েছে মিশরের প্রেসিডেন্টের। সুদানের সেনাপ্রধান জেনারেল আব্দেল ফাত্তাহ আল-বুরহান। একইসাথে তিনি ডি ফ্যাক্টো প্রেসিডেন্ট। আর মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি।

অন্যদিকে আরএসএফকে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করছে দেশটি।

অভিযোগ করা হয়, আরএসএফকে যুদ্ধে নামিয়ে মানুষের জীবন আর মাটির নিচের স্বর্ণ লুটে নিচ্ছে আমিরাত। দুবাইয়ে স্বর্ণ ব্যবসার জৌলুসের পেছনে আছে এই হরর বাস্তবতা।

দেখুন শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ এর আলাপ

Leave a reply

    Join Us
    • Facebook
    • Youtube
    Deal Of The Month
      Categories

      Advertisement

      Loading Next Post...
      Follow
      Search Trending
      Popular Now
      Loading

      Signing-in 3 seconds...

      Signing-up 3 seconds...