সবাই যখন দৌড়াচ্ছে, আপনি থামবেন কখন? ধীরস্থির জীবনেও শিল্প আছে

দর্শনজীবন1 month ago32 Views

আচ্ছা, শেষ কবে মোবাইল ফোনে কোনো নোটিফিকেশন ছাড়া টানা এক ঘণ্টা কাটিয়েছেন? অথবা শেষ কবে শুধু এক কাপ চা হাতে নিয়ে চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন, হাতে ফোন ছিলো না?

এই দুই প্রশ্নের জবাবে অনেকেই হয়তো বলবেন, গতকালও আমি নোটিফিকেশন ছাড়া এক ঘণ্টা কাটিয়েছি। কেউ হয়তো বলবেন, আমি যখন এই কাজে ব্যস্ত থাকি, ওই কাজে ব্যস্ত থাকি, তখন মোবাইল নোটিফিকেশনকে পাত্তা দেই না। এমনকি ফোনও ধরি না।

ওকে। সব ঠিক আছে। কিন্তু এমনও তো লোক আছে, যারা মোবাইলের নোটিফিকেশন না দেখে একটা ঘণ্টা সময়ও কাটাতে পারেন না। এক কাপ চা হাতে নিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে হলেও হাতে চাই মোবাইল ফোন।

আসলে আমরা এক অদ্ভুত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের চারপাশে এখন এআই আর অ্যালগরিদম। সবাই দৌড়াচ্ছে, দ্রুত দৌড়ায়। তারা আপডেট আছে, আরো আপডেট হতে চায়। কিন্তু এই দৌড়ে আমরা কি ভেতরে ভেতরে হাঁপিয়ে উঠছি না?

আজকের ‘আলাপ’ ‘স্লো লিভিং’ নিয়ে। ধীরস্থির জীবনেও যে একটা শিল্প আছে, সেটা নিয়ে।

অনেকে মনে করেন ‘স্লো লিভিং’ মানে অলসতা। আসলে কিন্তু সেটা না। আমার জীবনযাপন খুবই স্লো। কিন্তু যে কাজগুলো করি, সেগুলো খুব ফার্স্ট, দ্রুত, দ্রুতর চাইতেও দ্রুত। তবে মজার ব্যাপার হলো, চারপাশের মানুষগুলোর কাছে আমি ‘অলস’ হিসেবে পরিচিত।

শেষ কবে শুধু এক কাপ চা হাতে নিয়ে চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন, হাতে ফোন ছিলো না?। ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি

কারো কারো ধারণা, পৃথিবীতে যদি কখনো অলসদের প্রতিযোগিতা হয়, তাহলে আমি হবো গ্লোবাল চ্যাম্পিয়ন। এই ধারণার পেছনে কারণ কী?

কারণ হলো, আমি অনেকটাই বুঝতে পেরেছি জীবনযাপনের সত্যটা। সবকিছুতে রিঅ্যাক্ট করতে নেই। আর সবকিছু নিয়ে সবসময় ব্যস্ত হয়ে যেতে নেই। এতে আমি গড়পড়তা হয়ে যাবো। আর গড়পড়তা লোকদের দিয়ে বিশেষ কাজ হয় না।

আরো একটা কাজ করি আমি, মাথা থেকে যত সম্ভব তথ্য ও ঘটনা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করি। অনেকে আছেন, বড় বড় দার্শনিক বড় বড় কবির কোটেশন মুখস্ত করে রাখতে পারেন। জীবনে তিনি যতগুলো বই পড়েছেন, প্রায় সবগুলোর তালিকা একটানা বলে যেতে  পারেন। কিন্তু আমি সেটা পারি না। বলা যায়, পারতে চাইনি কখনো। হয়তো দেখা যাবে, সাতদিন আগে যে বইটা পড়েছি, সেটার নাম এখন মনে করতে পারবো না। আবার হয়তো কোনো একটা ঘটনার প্রেক্ষিতে পনেরো বছর আগে পড়া একটা বইয়ের কথা মনে পড়ে যাবে। কখনো কোনো ঘাসের ঘ্রাণ, বুনো ফুলের ঘ্রাণ মনে করিয়ে দেয় বিশেষ কোনো স্মৃতি।

আসলে সত্যি বলতে কি, আজ সকালে কী দিয়ে খেয়েছি, সেটা যদি কেউ জিজ্ঞেস করে বলতে পারবো না। 

আমি কেন এমন হলাম?

আসলে আমি প্রয়োজনীয় কাজগুলো মন দিয়ে করতে চাই। আর অপ্রয়োজনীয় শোরগোল থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চাই। আর আমার কাছে কোনটা প্রয়োজনীয়, কোনটা অপ্রয়োজনীয়, সেটা আমিই ঠিক করি, অন্য কেউ নয়।

ভাবুন তো, সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমরা আগে ফোনের স্ক্রিনে তাকাই। আমিও তাকাই। সারাদিন কয়েক হাজার তথ্যের চাপে আমাদের মস্তিষ্ক ক্লান্ত থাকে। তবে আমি সেইসব ক্লান্তি ঝেরে ফেলতে জানি, মস্তিষ্ককে ওভারলোড রাখি না।

মাঝে মাঝে আমি কিন্তু আমার মতো হারিয়ে যাই। যাকে বলা হয় ‘ডিজিটাল ডিটক্স’। কখনো কখনো ইন্টারনেটের বাইরে থাকি। আমি হাঁটতে থাকি, হাঁটতেই থাকি। ঢাকা শহরের জ্যাম হর্ন এসবের মাঝেই হাঁটতে থাকি। তখন ভাবতে থাকি আমার কাছে দরকারি বিষয়গুলো নিয়ে। হাঁটতে হাঁটতে জটিল কোলাহলগুলো পেরিয়ে যাই, কিন্তু কোলাহল আমাকে স্পর্শ করতে পারে না।

অবশ্য একমাস হলো আমি হাঁটতে পারছি না। একটা অ্যাক্সিডেন্ট করেছিলাম। অফিসে যাওয়ার জন্য তারাহুড়ো ছিলো ওইদিন। হাতে সময় কম ছিলো। তাই বিদ্যুৎচালিত রিকশায় উঠেছিলাম। পা দানিতে পা ঠেস দিয়ে রেখেছিলাম। সামনে হঠাৎ একটা পিকআপ ব্রেক করলো। ওইদিন আমার পায়ের আঙ্গুলগুলো প্রায় উল্টে গিয়েছিলো। সেই থেকে আমি হাঁটতে পারছি না বললেই চলে। অফিসে যেতে হয় যানবাহনে চড়ে।

পায়ের আঙ্গুলগুলো এখনো ভালো হয়নি। ডাক্তারের কাছে যাইনি। এক্সরে করাইনি। জীবন নিয়ে আমার এতো তাড়াহুড়ো নেই। তবে হাঁটতে পারছি না, এই কষ্টটুকু আছে।

আলাপ: শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

প্রযোজনা: সজল ফকির

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...