সার্কাস চলছে তবে দর্শক ক্লান্ত: ডোনাল্ড ট্রাম্পের আজব ‘বিজয়’ ও ইরান ধ্বংসের ফাঁকা বুলি

যুদ্ধক্ষেত্রের কঠিন বাস্তবতার সাথে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখের কথার কোনো মিল নেই এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রেসিডেন্টের একের পর এক ভিত্তিহীন দাবি এখন এক চরম তামাশায় পরিণত হয়েছে। প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা

ইরানের সংবাদ সংস্থা ওয়ানা জানিয়েছে, মার্কিন রাজনীতিতে একটা পুরনো কথা আছে, ‘ভাঁড় বা কৌতুক অভিনেতাকে ভোট দিলে সার্কাসই উপহার মিলবে।’ ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এই কথাটি এখন অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়ে উঠেছে। ইরানের সাথে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে চলতি মাসের ১২ তারিখ পর্যন্ত পাওয়া হিসাব মোতাবেক ট্রাম্পের দেওয়া ভাষণ এবং তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এর পোস্টগুলো পর্যালোচনা করে এক অদ্ভুত ও হাস্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। এই সময়ের মধ্যে ট্রাম্প ঠিক ৫৫ বার ইরান ‘পরাজিত’ হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন, ৩৫ বার দাবি করেছেন ইরানের ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়ে যাওয়ার কথা, ৩৮ বার ‘খুব শিগগিরই চুক্তি হচ্ছে’ বলে আশ্বাস দিয়েছেন এবং ২৫ বার জোর গলায় বলেছেন যে হরমুজ প্রণালী নাকি এখনো ‘উন্মুক্ত’ রয়েছে। অথচ বাস্তব পরিস্থিতি বলছে পুরোই উল্টো। গোটা অঞ্চল জুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোনের মার খেয়ে মার্কিন সেনারা যখন নাজেহাল, উপগ্রহ চিত্রে হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার প্রমাণ মিলেছে এবং ট্রাম্পের তথাকথিত কোনো ‘চূড়ান্ত বিজয়’ যখন দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তখন তার এই অবাস্তব দাবিগুলো কেবলই হাস্যরসের খোরাক জোগাচ্ছে।
রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে, চোখের সামনে ঘটে চলা বাস্তবতাকে অস্বীকার করে বারবার একই মিথ্যার পুনরাবৃত্তি করা আসলে এক ধরণের মানসিক বিকার এবং তেতো সত্য থেকে পালিয়ে বাঁচার অপচেষ্টা মাত্র।
ট্রাম্প সাহেব ক্ষমতায় আসার আগে বুক ফুলিয়ে ওয়াদা করেছিলেন যে তিনি ‘অনন্তকালের যুদ্ধগুলো অবসান’ করবেন। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে, তিনি নিজেই এমন এক যুদ্ধজাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে বসে আছেন যা ডুবতে ডুবতে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। কুয়েত আর বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটিতে একের পর এক ইরানি হামলায় যখন হতাহতের খবর আসছে কিংবা কৃত্রিম উপগ্রহের ছবিতে হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি অচল দেখাচ্ছে, ঠিক তখনই ট্রাম্পকে মার্কিন জনগণের ক্ষোভ শান্ত করতে মঞ্চে নেমে এমন ফাঁকা বুলি আওড়াতে হচ্ছে। তিনি ইতিমধ্যে ৫৫ বার ইরানের ‘পরাজয়’ নিয়ে চেঁচামেচি করেছেন, অথচ বাস্তবতা হলো ইরান মোটেও হেরে যায়নি বরং তারা এই অঞ্চলে মার্কিন ও তাদের দোসর ইসরাইলের দাদাগিরি বন্ধ করে শক্তির এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
ট্রাম্পের অভিধানে ‘ইরান ধ্বংস’ হয়ে যাওয়ার অর্থ বোধহয় সামরিক শক্তির আরও দ্রুত উত্থান। কারণ ট্রাম্প তার ভাষণে ৩৫ বার দাবি করেছেন যে ইরান নাকি ধ্বংস হয়ে গেছে, অথচ তার এই দাবি করার ২৪ ঘণ্টাও পার হয়নি যখন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসিসি) তিনটি দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এমনকি জর্ডানের আল-আজরাক বিমান ঘাঁটিতে থাকা অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানগুলোকেও তারা নিখুঁত নিশানা বানিয়েছে। ট্রাম্পের এমন দাবি দেখে তার কড়া সমালোচকরাও এখন হাসাহাসি করছেন।

ভাঁড় বা কৌতুক অভিনেতাকে ভোট দিলে সার্কাসই উপহার মিলবে

এদিকে কূটনৈতিক বিশ্বস্ততার দিক থেকে ওয়াশিংটনের বারোটা বেজে গেছে। সিএনএন-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ট্রাম্প অন্তত ৩৮ বার দাবি করেছেন যে একটা চুক্তি নাকি ‘একেবারে হাতের নাগালে’ চলে এসেছে, যা এখন ৩৯ বারে গিয়ে ঠেকেছে। অথচ আজ পর্যন্ত কোনো চুক্তি সই হওয়া তো দূরের কথা, আলোচনা পুরোপুরি বানচাল হয়ে গেছে। কারণ ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে লেবাননে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি এবং তাদের আটকে রাখা ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ফেরত না দিলে কোনো কথা হবে না।
ট্রাম্পের এই বারবার দেওয়া মিথ্যা আশ্বাস কেবল তেহরানের কাছেই হাস্যকর হয়ে ওঠেনি, বরং ওয়াশিংটনের ইউরোপীয় এবং আরব মিত্ররাও এখন ট্রাম্পের কথা শুনলে মুচকি হাসে, কেউ আর তার কথাকে গুরুত্বের সাথে নেয় না।
সবচেয়ে বড় সার্কাসটি মঞ্চস্থ হয়েছে ১১ তারিখ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে, যখন ট্রাম্প বুক টান টান করে ঘোষণা দিলেন যে হরমুজ প্রণালী নাকি সম্পূর্ণ খোলা এবং এর ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল করছে। কিন্তু এর পরপরই মহাকাশ থেকে নেওয়া উপগ্রহের ছবি যখন সামনে এলো, তখন দেখা গেল সেখানে কোনো জাহাজের নামনিশানা নেই, সব তেলের ট্যাংকার বন্দরে নোঙর ফেলে অলস বসে আছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম তড়িঘড়ি করে একটা অস্পষ্ট বিবৃতি দিয়ে বলল যে তারা নাকি ‘পরিস্থিতি মূল্যায়ন’ করে দেখছে। ট্রাম্পের মুখের কথা আর মাঠের বাস্তবতার এই আকাশ-পাতাল তফাতই এখন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মূল হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই টানটান উত্তেজনার মধ্যেই যখন সবাই ভাবছিল যে তেহরান ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক কিছুটা শান্ত হতে পারে, ঠিক তখনই গত ১১ জুন দক্ষিণ ও মধ্য ইরানের বেশ কিছু লক্ষ্যবস্তুতে আবারও মার্কিন বিমান হামলা চালানো হয়। এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিচারিতাকেই প্রমাণ করে—তারা একদিকে আলোচনার ভং ধরে অন্যদিকে পেছন থেকে কাপুরুষের মতো সামরিক হামলা চালায়।
তবে দিনশেষে এই মার্কিন সার্কাস দেখতে দেখতে দর্শক অর্থাৎ খোদ আমেরিকার জনগণ এবং তাদের মিত্ররা এখন ক্লান্ত ও বিরক্ত। ট্রাম্পের এই তথাকথিত ‘বিজয়’, ‘ধ্বংস’ আর ‘চুক্তির’ গালগল্প হোয়াইট হাউজের সম্মানকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদের ভাবমূর্তি এক কৌতুকের বিষয়ে পরিণত করেছে। এই পুরো সার্কাস থেকে যদি কারও লাভ হয়ে থাকে, তবে তা একমাত্র ট্রাম্পেরই হয়েছে; কারণ তিনি এসব চটকদার ও উগ্র কথাবার্তা বলে তার কট্টর সমর্থকদের হাততালি কুড়াচ্ছেন। কিন্তু মার্কিন স্লোগানে তো আর যুদ্ধ জেতা যায় না। মাঠের সত্য এটাই যে ইরান আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও প্রতিরোধক্ষম হয়ে উঠেছে, হরমুজ প্রণালীতে তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক চোরাবালিতে আটকে গেছে যেখান থেকে বের হওয়ার পথ দুটি- হয় নিজেদের পরাজয় মেনে নেওয়া, না হয় এক মহাধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দিকে পা বাড়ানো।

Leave a reply

    Join Us
    • Facebook
    • Youtube
    Deal Of The Month
      Categories

      Advertisement

      Loading Next Post...
      Follow
      Search Trending
      Popular Now
      Loading

      Signing-in 3 seconds...

      Signing-up 3 seconds...