মার্শাল আর্ট বা কুং ফু-কারাতের ময়দানে একটা দারুণ কৌশল আছে। একজন দক্ষ যোদ্ধা কখনোই তেড়ে আসা শত্রুর শক্তির সাথে নিজের শক্তির টক্কর দিতে যান না, বরং শত্রুর গায়ের জোরকেই তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করেন। দুশমন যখন প্রচণ্ড বেগে তেড়ে আসে, তখন কারাতে জানা ব্যক্তি বিদ্যুৎ গতিতে স্রেফ একপাশে সরে দাঁড়ান। এতে আক্রমণকারী নিজের ভার সামলাতে না পেরে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। তখন তাকে হালকা একটা টোকা দিলেই সে মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে যায়। মার্শাল আর্টে পারদর্শী মানুষ কখনোই নিজে থেকে প্রথম হামলা চালান না। তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেন মারপিট বা রক্তপাত এড়িয়ে চলতে। এমনকি কখনো কখনো শত্রুর হাতে দু-এক ঘা খেয়েও তারা ধৈর্য ধরেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় এবং লড়াইয়ে নামতে বাধ্য হন, তবে ঠান্ডা মাথায় মশা-মাছি তাড়ানোর ঢঙে দুশমনের শরীরের গঠন বা মুখের ভূগোল বদলে দেওয়ার মতো মোক্ষম জবাব দিতে পারেন। বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে ইরান ঠিক এই রণকৌশল নিয়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা

কৌশলী পিছুটান ও দীর্ঘমেয়াদী ফাঁদ
ইরান এখন আর সরাসরি সামরিক শক্তির বড়াই করছে না, বরং তারা ভিয়েতনাম আর আফগানিস্তান যুদ্ধের তিক্ত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর এক ভয়াবহ ‘কৌশলগত অচলাবস্থা’ চাপিয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইল ম্যানিফেস্টোর এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, তেহরান খুব ঠান্ডা মাথায় ওয়াশিংটনের শক্তিকেই তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় রূপান্তর করছে। ইরানের সংবাদ মাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইরান এখন ‘না হেরে জিতে যাওয়ার’ নীতিতে এগোচ্ছে। তারা জানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশাল শক্তিকে সম্মুখ সমরে হারানো কঠিন, কিন্তু যুদ্ধকে যদি বছরের পর বছর টেনে লম্বা করা যায়, তবে ওয়াশিংটন নিজের ভারেই নিজে কুপোকাৎ হবে। ঠিক যেভাবে কারাতে যোদ্ধা সরে দাঁড়িয়ে শত্রুকে ভারসাম্যহীন করেন, ইরানও মার্কিন সামরিক শক্তিকে এক অন্তহীন ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের চোরাবালিতে আটকে ফেলেছে।
প্রযুক্তির নামে পকেট কাটার খেলা
ইরানের এই যুদ্ধের সবচেয়ে কুশলী দিক হলো ‘খরচের বৈপরীত্য’। তেহরান অত্যন্ত সস্তা সব ড্রোন আর প্রযুক্তি ব্যবহার করে মার্কিন বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত রাখছে। আর সেই সস্তা খেলনা ড্রোন ঠেকাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে খরচ করতে হচ্ছে লাখ লাখ ডলার দামের অত্যাধুনিক মিসাইল। অর্থাৎ, প্রতিবার যখন মার্কিন সেনারা আত্মরক্ষার জন্য ট্রিগার চাপছে, তখন ওয়াশিংটনের কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা স্রেফ ধোঁয়ার মতো উড়ে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বই এখন তাদের জন্য এক বিশাল আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান এখানে সেই দক্ষ যোদ্ধার মতো কাজ করছে, যে নিজে বেশি শক্তি খরচ না করে শত্রুকে দিয়ে বেশি শক্তি খরচ করিয়ে তাকে ক্লান্ত করে দিচ্ছে।
অস্তিত্বের লড়াইয়ে ইস্পাতকঠিন ঐক্য
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত হুমকি আর নিষেধাজ্ঞা ইরানের ভেতরে এক অদ্ভুত পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। যারা হয়তো আগে সরকারের নানা সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতেন, তারাও এখন মাতৃভূমি রক্ষার প্রশ্নে একতাবদ্ধ। বাইরের দেশের শক্তির হুমকি সাধারণ মানুষকে জাতীয়তাবাদের পতাকাতলে নিয়ে এসেছে। দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় অভ্যন্তরীণ বিভেদ ভুলে সবাই এখন এক কাতারে শামিল। মার্কিন প্রশাসন ভেবেছিল চাপ বাড়ালে ইরান ভেতর থেকে ভেঙে পড়বে, কিন্তু আদতে হয়েছে তার উল্টো। অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পুরো দেশ এখন এমন এক সংহতি দেখাচ্ছে যা ভাঙা ওয়াশিংটনের জন্য প্রায় অসম্ভব।
ট্রাম্পের মনস্তাত্ত্বিক গোলকধাঁধা
ইরান খুব ভালো করেই জানে যে হরমুজ প্রণালী আর বাব আল-মানদেব প্রণালীতে সামান্য অস্থিরতা তৈরি করতে পারলেই পুরো বিশ্বের তেলের বাজারে আগুন লেগে যাবে। আর বিশ্ববাজারের এই অস্থিরতা সরাসরি মার্কিন ভোটারদের পকেটে টান ফেলে, যা শেষমেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধাক্কা দেয়। এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প পড়েছেন এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক গ্যাঁড়াকলে। ইরান যখন সংকট কাটাতে একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তখন ট্রাম্পের ব্যক্তিগত দম্ভ আর ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষা করার জেদ সেই আলোচনার পথ আটকে দিচ্ছে। ট্রাম্প এমন এক কৌশলী ফাঁদে আটকে গেছেন যেখান থেকে না পারছেন সামরিকভাবে জিততে, না পারছেন সম্মানের সাথে রণে ভঙ্গ দিতে।
ইল ম্যানিফেস্টোর এই বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ইরান এখন মার্কিন প্রশাসনকে এক গভীর অন্ধগলিতে ঠেলে দিয়েছে। কারাতে যোদ্ধার মতো তারা শান্ত থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি আগ্রাসী পদক্ষেপকে তাদের নিজেদের বিরুদ্ধেই ঘুরিয়ে দিচ্ছে। এখনকার যুদ্ধে বোমা মেরে হয়তো ঘরবাড়ি ধ্বংস করা যায়, কিন্তু তাতে কোনো রাজনৈতিক বিজয় আসে না। বরং যুদ্ধের ময়দানে টিকে থাকার খরচ যত বাড়ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই মরণফাঁদ থেকে মুক্তি পাওয়া ততই কঠিন হয়ে পড়ছে। তেহরান অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি চালকে নস্যাৎ করে দিয়ে এক দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত জয়ের পথে হাঁটছে।