ওপেনহাইমার, কিংবদন্তী বিজ্ঞানীর ধ্বংস-আখ্যান

মরুভূমি দেল মুয়ের্তো। আমেরিকার নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের এই মরুতেই প্রথমবারের মতো বিস্ফোরণ হয়েছিলো পারমাণবিক বোমা। আর এর পেছনে ছিলেন কিংবদন্তী বিজ্ঞানী ওপেনহাইমার। তার ধ্বংস-আখ্যান নিয়েই আজকের অ্যাপিসোড।

লিকলিকে শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, আখ্যানের নায়ক রবার্ট ওপেনহাইমার। অবশ্য তিনি নায়ক নাকি খলনায়ক! এ নিয়েও কথা আছে। তবে দেশের সঙ্কটে মগজে শান দিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন এই বিজ্ঞানী।

১৯৪৫ সালের জুলাই মাসের ষোল তারিখ। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের মরু ইয়োর্নাদা দেল মুয়ের্তো। ওখানেই পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ হয়েছিলো রবার্ট ওপেনহাইমারের আবিষ্কার করা বোমার। বিস্ফোরণের আগে চেহারায় দুঃস্বপ্নের ছায়া ভেসে উঠেছিলো তার। তিনি কি ধ্বংস করে দিচ্ছেন গোটা পৃথিবীকে?

বিস্ফোরণ যেখানে হবে এর দশ কিলোমিটার দূরে একটি কন্ট্রোল বাংকারে অপেক্ষা করছিলেন প্রকল্পের প্রধান ওপেনহাইমার। ওদিকে কাউন্টডাউন চলছে।

চোখের পাতা পড়তে চাইছে না তার। আগের কয়েকটা দিন অনেকটা না ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি। একটার পর একটা সিগারেট খেয়েছেন। আর খকর খক কেশেছেন। যতটা ঘুম আসার কথা, সেটাও হারিয়ে গেছে কাশির দমকে। না ঘুমিয়ে পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি লম্বা লিকলিকে শরীরকে আরো হালকা করে দিয়েছেন রবার্ট।

হাতে একটি কাগজ। এতে থাকা সমীকরণ মেলানোর চেষ্টা করছেন তিনি। একটু পর দশ কিলোমিটার দূরে যে বিক্রিয়া শুরু হবে, সেটা বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে মিশে বাড়তে থাকবে। বাড়তে বাড়তে যদি বেড়েই চলে, তাহলে একে থামানো যাবে না। এতে ধ্বংস হয়ে যাবে পৃথিবী।
তিনি তো পৃথিবী ধ্বংস করতে চান না!

বিষয়টার সুরাহা করতে একবার আইনস্টাইনের কাছে গিয়েছিলেন রবার্ট। আইনস্টাইন তাকে পাত্তা দেননি। সোজা বলে দিলেন- নিজের সমীকরণ নিজে মিলিয়ে নিতে।

আদতে এমন একটা ব্যাপার নিয়ে সিরিয়াসলি এগিয়ে যাবেন হাইমার, সেটা কল্পনায়ও আনতে পারেননি আইনস্টাইন। অথচ জার্মানী ভয়ঙ্কর বোমা বানাচ্ছে, জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে চিঠি লিখেছিলেন তিনি। সেইসাথে যুক্তরাষ্ট্রকে এর বিপরীতে প্রস্তুতি নিতেও অনুরোধ করেছিলেন।
এ কারণেই ভরসা নিয়ে আইনস্টাইনের কাছে গিয়েছিলেন রবার্ট। তবে বড় বিজ্ঞানীর তাচ্ছিল্যে অনেকটাই হোঁচট খেলেন ছোট বিজ্ঞানী।


কেন এমন ঘটলো?

সেটা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে কাজে মন দিয়েছিলেন ওপেনহাইমার। এর পরিণতি হিসেবে একটি আগুন-পরীক্ষার মুখোমুখি তিনি। কাউন্টডাউন চলছে। কমে আসছে সংখ্যা। হাইমারের পাশে দাঁড়িয়ে এক সামরিক কর্মকর্তা বার্ড আর শেরউইন। তিনি বলেছিলেন, ‘শেষ কয়েকটি সেকেÐে ড. ওপেনহাইমারের উৎকণ্ঠা আরো বেড়ে যায়। তার শ্বাস পড়ছিলো না।’

এরপরই ঘটলো বিস্ফোরণ। সূর্য’র সাথে এক হয়ে এলো মরু। মাশরুমের মতো মেঘে ঢেকে গেলো আকাশ। গর্জনে কেঁপে উঠলো মাটি। শতমাইল দূরে গিয়েও ধাক্কা খেলো বাতাস।

রবার্ট ওপেনহাইমার শ্বাস ফেললেন। কয়েক মিনিট পর হাঁটা শুরু করলেন তিনি। তাকে দেখছিলেন সহকর্মী ইসিডোর রাবি। পরে তিনি জানিয়েছেন, ‘আমি কখনো তার সেই হাঁটার দৃশ্য ভুলবো না। গাড়ি থেকে নামার দৃশ্যটিও ভোলার মতো ছিলো না। তিনি তার কাজটি করতে পেরেছিলেন।’
কী কাজ ছিলো ওপেনহাইমারের? কেনইবা তাকে পারমাণবিক বোমা বানাতে হয়েছে?

ঘটনার পেছনে থাকে ঘটনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও জাপানের সাথে দ্বৈরথ থামেনি আমেরিকার। জাপানকে শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বানানো হয়েছিলো এই বোমা। ওপেনহাইমারের সেই বোমা জাপানের হিরোশিমায় ফেলা হলো আগস্ট মাসের ৬ তারিখ। এতে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো পৃথিবী। আর হিরোশিমার চিহ্ন পৃথিবী থেকেই যেন উধাও হয়ে গিয়েছিলো সেদিন। এখানেই শেষ নয়। এর কয়েকদিন পর বোমা ফেলা হলো নাগাসাকিতে।

ধারাবাহিক হামলায় বিপর্যস্ত হয়ে যুদ্ধ থামানোর অনুরোধ করলেন জাপান সম্রাট হিরোহিতো।

যুদ্ধ থামলো। জাপানের পরের ইতিহাস ঘুরে দাঁড়ানোর। আমেরিকার সহযোগিতায় হিরোশিমা ও নাগাসাকির বিভীষিকা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশটি।

জাপানের দুই শহরে যখন পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়েছিলো, তখনো এর আবিষ্কারক কে, জানতে পারেনি পৃথিবী। অনেকেই সন্দেহ করেছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইনকে। এমনকি এখনো কেউ কেউ আছেন, যারা আইনস্টাইনকেই পারমাণবিক বোমার জনক হিসেবে চেনেন।

বোমার আঘাতে দুই শহরের আর্তনাদ যখন ছড়িয়ে গিয়েছিলো পৃথিবীতে, তখন নিজেকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করেছিলেন এর আবিষ্কারক ওপেনহাইমার। তিনি বলেছিলেন, ‘এখন আমিই হলাম মৃত্যু, এই পৃথিবীর সবচাইতে কুখ্যাত ধ্বংসকারী’।

জুলিয়াস রবার্ট ওপেনহাইমার অনেকটা লাজুক ছিলেন। লাজ-লজ্জার মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠেছিলেন তিনি। তবে ছোটবেলা থেকেই মগজে বুদ্ধি ছিলো। ১৯০৪ সালের এপ্রিল মাসের ২২ তারিখ জন্মেছিলেন নিউ ইয়র্কের ম্যানহ্যাটনে এক ইহুদি পরিবারে। তার বাবা জুলিয়াস ওপেনহাইমার জার্মান থেকে এসে আমেরিকায় বসতি গড়েছিলেন। কাপড় আমদানি করতেন তিনি। মা ইলা ফ্রিডম্যান ছিলেন চিত্রশিল্পী। শিল্পে আগ্রহ ছিলো বাবারও। সেই সুবাদে ভ্যান গগ, সেজানি, গগিনের মতো শিল্পীদের রঙ কাজ করতো রবার্ট ওপেনহাইমারের ভেতর।

রসায়নে পড়তে চাইলেও পদার্থবিদ্যাকে ভালোবেসে ফেলেন ওপেনহাইমার। ইশকুল শেষ করে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। সেখানে পদার্থবিদ্যা, গণিত, দর্শন, প্রাচ্য ধর্ম, ফরাসি এবং ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়েন। ওইসময় হার্ভার্ডে তাপ গতিবিদ্যার উপর লেকচার দিতেন খ্যাতিমান পদার্থবিদ পার্সি ব্রিজমান। তার মাধ্যমে গবেষণামূলক পদার্থবিদ্যার সাথে পরিচয় হয় ওপেনহাইমারের। এমন কঠিন বিষয়েও দক্ষতার সাথে সব পরীক্ষায় পাশ করেন তিনি। ১৯২৫ সালে সর্বোচ্চ ফলাফল নিয়ে উত্তীর্ণ হন। সমাবর্তনের দিন সনদপত্র হাতে নিয়ে বিজ্ঞানের খোঁজে ইউরোপ ভ্রমণের স্বপ্ন দেখতে থাকেন রবার্ট।

শেষে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে বিজ্ঞানী জে জে থমসনের অধীনে গবেষণা শুরু করেন তিনি। থমসন ইলেক্ট্রন আবিষ্কার করেছিলেন প্রথম। তিনি নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন। কয়েকমাস পর গবেষণাগারের রুটিন কাজে বিরক্ত হয়ে যান রবার্ট। পরে পূর্বপুরুষের ভূমি জার্মানি চলে যান। সেখানে গবেষণা শুরু করেন কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা নিয়ে। ১৯২৭ সালে এই বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি পান। এরপর থেকে তার প্রতিভার খবর ছড়াতে থাকে। খ্যাতিমান বিজ্ঞানী নিলস বোর এবং ম্যাক্স বর্নের সাথে পরমাণুর গঠন নিয়ে কাজ শুরু করেন। বর্নের সাথে একসাথে কাজ করে বর্ন-ওপেনহাইমার তত্ত্ব প্রকাশ করেন। এতে বড় বড় গবেষণাগার থেকে কাজ করার আমন্ত্রণ পান তিনি।

১৯২৯ সালে একিসাথে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্যালটেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার অফার করা হয় রবার্ট ওপেনহাইমারকে। সময় ভাগ করে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা চালাতে থাকেন।

ওই সময় রবার্টের পূর্বপুরুষের দেশ জার্মানির ক্ষমতায় আসেন হিটলার। ১৯৩৬ সালে স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিবিদদের সাথে ঘনিষ্ঠ হন রবার্ট। পরে জোসেফ স্ট্যালিন সোভিয়েত বিজ্ঞানীদেরকে অপমান করায় ওই ধারা থেকে সরে আসেন তিনি।

১৯৩৭ সালে বাবার মৃত্যু হয়। পরে কিছুদিনের জন্য নিউ ইয়র্কে ফিরে যান রবার্ট। পারিবারিক সম্পত্তির ভার বুঝে নিয়ে সংসারের হাল ধরার চেষ্টা করেন। কয়েক বছর পর ক্যাথেরিন পুনিং হ্যারিসন নামের এক নারীকে বিয়ে করেন। তাদের পিটার এবং ক্যাথেরিন নামে দুই সন্তানের জন্ম হয়।

১৯৩৯ সালে এডলফ হিটলার নাজি বাহিনী নিয়ে পোল্যান্ড দখল করেন। শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধের ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করে চিঠি লিখেন বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন, লিও সাইলার্ড এবং ইউজিন ওইনার। তবে ওই চিঠিটি আইস্টাইন স্বপ্রণোদিত হয়ে লিখেননি বলেও মনে করেন অনেকে। চিঠিতে কেবল আইনস্টাইনের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিলো বলে দাবি করেন তারা।

চিঠি পাওয়ার পর মার্কিন বিজ্ঞানীরা পারমাণবিক বোমা তৈরিতে মন দেন। প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম থেকে তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম-২৩৫ আলাদা করার পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন রবার্ট। পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে হলে ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর সংকট ভর নির্ণয় করতে পারা ছিলো জরুরি।

পারমাণবিক বোমা তৈরির একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এর নাম দেওয়া হয় ‘ম্যানহ্যাটন প্রকল্প’। এতে কাজ করতে থাকেন শত শত বিজ্ঞানী। সবার তত্ত¡াবধানে ছিলেন রবার্ট ওপেনহাইমার। হিটলার বোমা তৈরির আগেই কাজ শেষ করতে হবে তাদের।

এই তাড়া থেকেই সফল হতে পেরেছিলেন তিনি। কাজ শেষ করে পরীক্ষা করার জন্য বেছে নিয়েছিলেন লস আলামোস মালভূমিকে। ১৯৪৩ সালে এখানে সফল পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি জন্ম দেন বিধ্বংসী অস্ত্রের। এর দুইবছর পর আক্রান্ত হয় হিরোশিমা-নাগাসাকি। ওই বছরই প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ান তিনি।

১৯৪৯ সালে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বানানোর ঘোষণা দেন স্ট্যালিন। এতে মার্কিন বিজ্ঞানীদেরকে হাইড্রোজেন বোমা বানাতে বলেন প্রেসিডেন্ট। বিজ্ঞানীরা এতে রাজি না হওয়ায় রবার্টকে দায়ী করে তদন্ত কমিটি গঠন হয়। চারবছর তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দেওয়া হয়। এতে জানানো হয়, কমিউনিস্টদের সাথে আঁতাত করেছিলেন রবার্ট ওপেনহাইমার। নায়ক থেকে খলনায়ক হয়ে যান তিনি।

১৯৬৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হন লিন্ডন বি. জনসন। তিনি রবার্টের প্রতি সদয় হন। তাকে সম্মানজনক এনরিকো ফার্মি পুরষ্কার দেন।

পরে রাজনীতির সাথে ছিলেন রবার্ট। প্রিন্সটনে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন। আর বক্তৃতা করে বেড়াতেন। তিনি বলতেন পারমাণবিক বোমার বিরুদ্ধে। শেষ জীবনে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখ শেষ হয় জুলিয়াস রবার্ট ওপেনহাইমার নামের এই কিংবদন্তী বিজ্ঞানীর আখ্যান।

উপস্থাপনা: মশিউর কায়েস

লেখা: শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

প্রযোজনা: সজল ফকির

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

    Join Us
    • Facebook
    • Youtube
    Deal Of The Month
      Categories

      Advertisement

      Loading Next Post...
      Follow
      Search Trending
      Popular Now
      Loading

      Signing-in 3 seconds...

      Signing-up 3 seconds...