ইরানের সর্বোচ্চ নেতার আসল ক্ষমতা কতটুকু? কীভাবে দেশ চালান তিনি?

Uncategorized3 weeks ago26 Views

সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে তিনজন সেই চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন।

১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি শীর্ষ নেতা নির্বাচিত হন এবং তখন থেকে দেশের শাসনক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে ছিলেন তিনি। মার্কিন ইসরাইল আক্রমণে তার মৃত্যু হয়। পরে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হন আলি খামেনির ছেলে মোজতবা হোসেইনি খামেনি। ইরানে সর্বোচ্চ নেতার পরের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের।

ইনফোজা ভিউজ এর জন্য প্রতিবেদন করেছেন ফাতেমা আবেদীন

ইরানিরা দাবি করে থাকেন, বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বিপ্লব ইরানের ইসলামি বিপ্লব

ইরানে সর্বোচ্চ নেতাদের ‘রাহবার-ই-মোয়াজেম-ই-ইরান’ নামেই ডাকা হয়। সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচন করা হয় ‘মজলিস-ই-খোবরেগান-ই-রাহবারি’নামে একটি সংসদ থেকে। এই সংসদের সদস্য ৮৮ জন। সংসদ চাইলে একজন দায়িত্বরত সর্বোচ্চ নেতাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতিও দিতে পারে। আরসব দেশের মতো ইরানেও রয়েছে  আইন, শাসন ও বিচার বিভাগ। ইরানে এই তিনটি বিভাগেরই প্রধান হচ্ছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা। তিনি একইসাথে দেশটির সামরিক বাহিনীগুলোর সর্বোচ্চ নেতা। ইরান রাষ্ট্রীয়ভাবে যদি কারও বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করতে চায়, তবে সেটি দেশটির সর্বোচ্চ নেতার অনুমতি ছাড়া সম্ভব নয়। তাই এই পদে রদবদলও কম।

১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনি দেশটির প্রধান ও কমান্ডার ইন চিফ। দেশটির সরকারি পুলিশ ও নীতি পুলিশের কর্তৃত্ব রয়েছে খামেনির হাতে। 

ইসলামিক রেভল্যুশন গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নিয়ন্ত্রণও থাকে সর্বোচ্চ নেতার হাতে। আইআরজিসির দায়িত্ব ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা করা। আইআরজিসির স্বেচ্ছাসেবক শাখা বাসিজ রেজিসট্যান্স ফোর্স। বাসিজেরও প্রধান হলেন আয়াতুল্লাহ খামেনি। 

ইরানের প্রেসিডেন্ট শীর্ষ নির্বাচিত কর্মকর্তা। সর্বোচ্চ নেতার পরই তার অবস্থান। সরকারের  কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব প্রেসিডেন্টের ওপর। ইরানের অভ্যন্তরীণ নীতি ও পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। তবে তার ক্ষমতাও বিশেষ করে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে সীমিত।

প্রেসিডেন্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইরানের সরকারি পুলিশ বাহিনী পরিচালনা করে। তবে পুলিশের কমান্ডার নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা কেবলই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার। আর কমান্ডারকে সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার কাছে জবাবদিহি করতে হয়। ইসলামিক রেভল্যুশন গার্ড কর্পস ও বাসিজের কমান্ডারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

এর অর্থ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন দেশের জন্য সেটিই অনুসরণ করতে হবে। ইরানের প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা আবার যাচাই করা হয় পার্লামেন্টের মাধ্যমে। পার্লামেন্ট নতুন আইন প্রণয়ন করে| আবার এই গার্ডিয়ান কাউন্সিলে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ মিত্ররা থাকেন| এই কাউন্সিল নতুন আইন অনুমোদন করতে পারে ও ভেটো দিতে পারে।

ইরানে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার নির্দেশনা অনুযায়ী ২০০৫ সালে ধর্মীয় পুলিশ বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বাহিনী ইসলামিক নৈতিকতা ও আইন সমুন্নত রাখতে কাজ করে। ১৯৭৯ সালে ইসলামিক রেভল্যুশনের পর এই আইন প্রবর্তিত হয়। ধর্মীয় পুলিশ বাহিনীতে সাত হাজার পুরুষ ও নারী কর্মকর্তা রয়েছেন। 

এছাড়া ইরানে রয়েছে রেভুল্যশন গার্ড। ইরানের রেভল্যুশন গার্ড দেশের ইসলামি ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইরানের অন্যতম প্রধান সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাহিনী হলো এই আইআরজিসি। এই বাহিনীতে ১৫ হাজারের বেশি সদস্য রয়েছেন। এই বাহিনীর নিজস্ব স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনী রয়েছে। ইরানের কৌশলগত অস্ত্রেরও তত্ত্বাবধান করে এই বাহিনী।

আইআরজিসির কুদস ফোর্স নামে বিদেশি একটি বাহিনী রয়েছে। এই কুদস ফোর্স গোপনে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মিত্রদের অর্থ, অস্ত্র, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ দেয়| বাসিজ রেজিসট্যান্স ফোর্সকেও নিয়ন্ত্রণ করে এই বাহিনী।

এর বাইরে রয়েছে বাসিজ। দ্য বাসিজ রেজিসট্যান্স ফোর্স আনুষ্ঠানিকভাবে অর্গানাইজেশন ফর দ্য মোবিলাইজেশন অব দ্য অপ্রেসড নামে পরিচিত। ১৯৭৯ সালে স্বেচ্ছাসেবী আধা সামরিক সংস্থা হিসেবে এটি গঠিত হয়। ইরানের প্রতিটি প্রদেশ ও শহরে বাসিজের শাখা রয়েছে। দেশটির অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানেও বাসিজের শাখা আছে। বাসিজের নারী ও পুরুষ সদস্যরা ‘বাসিজিস’ নামে পরিচিত। তাঁরা আইআরজিসির অধীনে কাজ করেন। প্রায় এক লাখ সদস্য অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন বলে ধারণা করা হয়।

এই কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বাহিনী পুরোটা সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ও ৮৮ সদস্যের সংসদ দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে বিপ্লবের পর। 

ইরানি বিপ্লব, ১৯৭৯ সালে ঘটা একটি যুগান্তকারী বিপ্লব। এই বিপ্লব ইরানকে পাশ্চাত্যপন্থি দেশ থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত করে। এ বিপ্লবকে বলা হয় ফরাসি এবং বলশেভিক বিপ্লবের পর ইতিহাসের তৃতীয় মহান বিপ্লব।

৪৫ বছর আগে আয়াতোল্লাহ খোমেনি ফ্রান্সে তার নির্বাসিত জীবন থেকে দেশে ফিরে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল সেটি। প্যারিসের বাইরে নফলে-ল্য শাতো নামের গ্রামটিতে থাকতেন আয়াতোল্লাহ খোমেনি। সেখানে বসেই ইরানে তার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন।

ইরানিরা দাবি করে থাকেন, বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বিপ্লব ইরানের ইসলামি বিপ্লব। প্রয়াত আধ্যাত্মিক নেতা, আপসহীন সংগ্রামী, ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে সংঘটিত সফল এ বিপ্লব। বর্তমান পৃথিবীর স্বঘোষিত পরাশক্তিগুলোর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সংঘটিত এ বিপ্লব ঝিমিয়েপড়া মুসলমানদের জাগ্রত করেছিল সার্বিকভাবে। ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি আড়াই শত বছরের পুরনো রাজতান্ত্রিক পাহলভী বংশের রাজত্বকে তছনছ করে দিয়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন খামেনি| বিপ্লবের মূল মর্মবাণী ছিল স্বাধনিতা, মুক্তি, ইসলামী প্রজাতন্ত্র।

ইরান বিপ্লবের পর ১৯৯০ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ইরানিদের গড় আয় বেড়েছে ৬৮ শতাংশ| গড় আয়ু ৫৪ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৫ বছর| কঠোরতর অবরোধে পড়ে অগ্রগতি প্রতিনিয়তই বাধাগ্রস্ত হয়, কিন্তু বন্ধ হয়নি। উল্লেখ করার বিষয় হলো, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ইসরাইলের পর ইরানই হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে সবচেয়ে অগ্রসর দেশ। 

ইরানি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেয়া ২০১৬-১৭ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ওই বছর দেশটির রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ১২ শতাংশ। তেল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞার পরও প্রধানত পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ও অন্যান্য সামগ্রী রফতানি থেকে এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে দেশটি। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ইরান সম্প্রতি বিশ্বের শীর্ষস্থান দখল করে। ২০১৭ সালের হিসাবে এ ক্ষেত্রে শীর্ষে ছিল ইরান, দ্বিতীয় অবস্থানে রাশিয়া এবং তৃতীয় স্থানে ছিল চীন।

 শীর্ষ ২৫ দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতায় ইরানের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ শতাংশ। দেশটির প্রযুক্তিভিত্তিক পণ্যের রফতানিও বেড়েছে বিপুল পরিমাণে। ২০১৫ সালে ইরান ৫০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের বিজ্ঞানভিত্তিক পণ্যসামগ্রী রফতানি করে। দৈনিক তেহরান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বে ন্যানো প্রযুক্তিতে দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, জাপান ও ফ্রান্সের মতো দেশকে টপকে চতুর্থ শীর্ষস্থান দখল করেছে ইরান। এই খাতে আট হাজার ৭৯১টি আর্টিকেল প্রকাশ করে দেশটি এই অবস্থান অর্জন করে। এই তালিকায় চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত ছিল যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে। 

ইরানিদের বিশ্বাস আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরান যে অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, তা মূলত ইসলামী বিপ্লবেরই সুফল।

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...