যুদ্ধবিধ্বস্ত শরণার্থী শিবির থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চ: অ্যাওয়ার মাবিলের এক অবিস্মরণীয় রূপকথা

অ্যাওয়ার মাবিলের এক অবিস্মরণীয় রূপকথা। ছবি : ফিফা

ইনফোজা স্পোর্টস ডেস্ক:

ফুটবল শুধু ২২ জন খেলোয়াড়ের মাঠের লড়াই নয়; এটি কখনো কখনো জীবনসংগ্রাম, টিকে থাকা এবং সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে স্বপ্নের চূড়ায় পৌঁছানোর এক জীবন্ত দলিল। অস্ট্রেলিয়া জাতীয় ফুটবল দলের (সকারুস) উইঙ্গার অ্যাওয়ার মাবিলের (Awer Mabil) জীবন ঠিক তেমনই এক রূপকথা, যা যেকোনো সাধারণ মানুষকে নতুন করে বাঁচার এবং স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণা জোগায়।

কেনিয়ার এক অন্ধকার শরণার্থী শিবির থেকে শুরু করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়ামঞ্চ—ফিফা বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধিত্ব করা পর্যন্ত মাবিলের এই যাত্রা যেন এক রূপোলী পর্দার গল্পকেও হার মানায়।

শরণার্থী শিবিরের সেই কঠিন শৈশব

অ্যাওয়ার মাবিলের জন্ম ১৯৯৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর কেনিয়ার কাকুমা শরণার্থী শিবিরে। তাঁর বাবা-মা সুদানের ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলেন এই শিবিরে। কাকুমার সেই ছোট্ট কুঁড়েঘরেই কেটেছে মাবিলের শৈশবের প্রথম ১০টি বছর।

তারকা খেলোয়াড় হওয়ার পরে কেনিয়ার শরণার্থী শিবিরে পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলছেন মাবিল। 
ছবি : জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR)

ছবি : আওয়ার মাবিল সেই শরণার্থী শিবিরে শরণার্থীদের সঙ্গে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলেন, যেখানে তিনি খেলাটি শিখেছিলেন। UNHCR থেকে নেয়া ছবিটি।

সেখানে নূন্যতম সুযোগ-সুবিধাও ছিল বিলাসিতা। ক্ষুধার্ত পেট আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মাঝে মাবিলের একমাত্র সঙ্গী ছিল ফুটবল। তবে আসল ফুটবল কেনার সামর্থ্য কোথায়? প্লাস্টিকের ব্যাগ আর পুরনো মোজা পেঁচিয়ে গোল বল বানিয়ে শরণার্থী শিবিরের ধুলোবালি মাখা মাঠে খালি পায়ে দৌড়াতেন তিনি। মাবিল একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন:

“আজ আমি যে হোটেল রুমে থাকি, সেটি আমার শৈশবের সেই পুরো কুঁড়েঘরের চেয়েও বড়। ফুটবলই ছিল সেই কঠিন দিনগুলোতে আমার বেঁচে থাকার একমাত্র আনন্দ।”

অস্ট্রেলিয়ায় নতুন জীবনের আলো

২০০৬ সালে মাবিল ও তাঁর পরিবার হিউম্যানিটেরিয়ান রিসেটেলমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় পায়। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে শুরু হয় তাঁদের এক নতুন জীবন। নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি আর সম্পূর্ণ অচেনা এক পরিবেশের মুখোমুখি হয়েও মাবিল তাঁর ফুটবল খেলার তাড়না ভুলে যাননি।

১৫ বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাব স্তরে খেলার সময় অ্যাডিলেড ইউনাইটেডের স্কাউটদের নজরে আসেন তিনি। তাঁর গতি, ক্ষিপ্রতা আর দুর্দান্ত ড্রিবলিং দক্ষতা দেখে ক্লাব কর্তৃপক্ষ তাঁকে তাদের যুব একাডেমিতে যুক্ত করে। ২০১২ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে অ্যাডিলেড ইউনাইটেডের হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক ঘটে এই তরুণ উইঙ্গারের।

ইউরোপ জয় এবং কাতারের সেই ঐতিহাসিক পেনাল্টি

অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া লিগে আলো ছড়ানোর পর মাবিলের সামনে উন্মোচিত হয় ইউরোপীয় ফুটবলের দুয়ার। ২০১৫ সালে তিনি যোগ দেন ডেনমার্কের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব এফসি মিডটজিল্যান্ডে। সেখানে ঘরোয়া লিগ ও কাপ জেতার পাশাপাশি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে গোল করার গৌরবও অর্জন করেন তিনি, যা খুব কম অস্ট্রেলীয় ফুটবলারের ক্যারিয়ারেই রয়েছে। এরপর স্পেনের লা লিগার ক্লাব ক্যাডিজ, স্পার্টা প্রাগ এবং বর্তমানে স্পেনের সিডি কাস্তেলোনের হয়ে নিজের ফুটবল নৈপুণ্য দেখিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

তবে অস্ট্রেলিয়ার ফুটবল ইতিহাসে মাবিলের নাম আজীবন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ২০২২ বিশ্বকাপের একটি বিশেষ মুহূর্তের জন্য। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফে পেরুর বিরুদ্ধে ম্যাচটি টাইব্রেকারে রূপ নেয়। ‘সাডেন ডেথ’-এর সেই চরম স্নায়ুচাপের মুহূর্তে পেনাল্টি শট নিতে আসেন মাবিল। কোটি মানুষের প্রত্যাশার চাপ মাথায় নিয়েও তিনি পেরুর গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন। তাঁর সেই গোলের ওপর ভর করেই সকারুসরা কাতার বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছিল। গোলটি করার পর মাবিল মাঠে হাঁটু গেড়ে বসে কেঁদেছিলেন—সেটি কেবল জয়ের আনন্দ ছিল না, সেটি ছিল এক শরণার্থীর কৃতজ্ঞতার অশ্রু।

মাঠের বাইরে এক অনন্য মানবিক নায়ক

অ্যাওয়ার মাবিল কেবল মাঠেরই তারকা নন, মাঠের বাইরেও তিনি একজন আসল নায়ক। নিজের অতীতকে তিনি কখনোই ভুলে যাননি। ২০১৪ সালে তিনি এবং তাঁর ভাই মিলে গড়ে তোলেন ‘বেয়ারফুট টু বুটস’ (Barefoot to Boots) নামক একটি দাতব্য সংস্থা। এই সংস্থার মাধ্যমে কাকুমা শরণার্থী শিবিরের শিশুদের জন্য ফুটবল গিয়ার, শিক্ষা সামগ্রী এবং স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হয়।

মানবসেবায় অনন্য অবদানের জন্য তিনি ২০১৮ সালে FIFPro মেরিট অ্যাওয়ার্ড এবং ২০২৩ সালে সম্মানজনক ‘ইয়ং অস্ট্রেলিয়ান অব দ্য ইয়ার’ উপাধিতে ভূষিত হন।

সকারুসদের অভিজ্ঞ সেনানী

ক্যারিয়ারে অনেক চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়েছেন মাবিল। ২০১৯ সালে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর বোনকে হারানো ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত। কিন্তু প্রতিটি আঘাত মাবিলকে আরও মানসিকভাবে শক্ত করেছে।

বর্তমানে ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চেও অস্ট্রেলিয়া জাতীয় দলের টনি পোপোভিচের স্কোয়াডে অন্যতম অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলছেন ৩০ বছর বয়সী মাবিল। অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতে প্রায় ৩৮টি ম্যাচ খেলে ১০টি আন্তর্জাতিক গোল করা মাবিল এখন দলের তরুণদের জন্য এক বড় মেন্টর ও অনুপ্রেরণা।

ফুটবল ছাড়িয়ে এক মানবতার গল্প

অ্যাওয়ার মাবিলের গল্পটি শুধু গোল করা বা ম্যাচ জেতার নয়। এটি আমাদের শেখায় যে, জীবনের শুরুটা যেখানেই হোক না কেন—তা শরণার্থী শিবিরের কুঁড়েঘরই হোক বা যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশ—দৃঢ় ইচ্ছা, কঠোর পরিশ্রম আর সততা থাকলে পৃথিবীর যেকোনো মঞ্চ জয় করা সম্ভব। মাবিল যখনই অস্ট্রেলিয়ার লোগো বুকে নিয়ে মাঠে নামেন, তিনি তখন কেবল একজন ফুটবলার নন, তিনি বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুত ও সুবিধাবঞ্চিত লক্ষ লক্ষ মানুষের আশার আলো।

তথ্যসূত্র: ফুটবল অস্ট্রেলিয়া, এবিসি নিউজ এবং এসবিএস স্পোর্টস-এর আর্কাইভ থেকে সংগৃহীত

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...