দক্ষিণ লেবাননের পাহাড়ি উপত্যকায় এখন এক অদ্ভুত লড়াই চলছে। একদিকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে ঠাসা মার্কিন মদতপুষ্ট ইসরাইল সেনাবাহিনী, আর অন্যদিকে হিজবুল্লাহর লড়াকু বাহিনী। কিন্তু এই লড়াইয়ে হিজবুল্লাহ এমন এক চাল চেলেছে, যাতে ইসরাইলি কমান্ডারদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেছে। সেই তুরুপের তাসের নাম— ‘ফাইবার অপটিক ড্রোন’। ইরানের সংবাদ মাধ্যমতাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সির খবর অনুযায়ী, এই ছোট ছোট ড্রোনগুলোই এখন ইসরাইলি সেনাদের যমদূত হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা

বিগত দুই সপ্তাহ ধরে দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি ঘাঁটি আর সেনাসমাবেশের ওপর এই ড্রোনগুলো বেশ বিধ্বংসী হামলা চালিয়েছে। ‘থাকিতে চরণ মরণে কী ভয়/ নিমিষে যোজন ফরসা’ নীতি গ্রহণ করে প্রাণ বাঁচাতে অনেক এলাকা থেকে ইসরাইল তাদের বাহিনী সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক, ইসরাইলি ওয়েবসাইট ‘মাআরিউ’ পরামর্শ দিয়েছে যেন তাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ২০০০ সালের যুদ্ধের ওপর বানানো ‘বিউফোর্ট’ সিনেমাটি দেখানো হয়। কেন জানেন? যাতে সাধারণ মানুষ আর শাসকরা বুঝতে পারে লেবাননের ‘কাদামাটি’ ঠিক কতটা ভয়ংকর এবং সেখানে ইসরাইলি সেনাদের দশা কী হয়।
এমনকি ইসরাইলি সেনাপ্রধান ইয়াল জামিরও এখন সেনা সরিয়ে নেওয়াকেই সঠিক কাজ বলে মনে করছেন। তার ভয়, এভাবে চলতে থাকলে লেবাননের মাটিতে ইসরাইলি সেনারা হিজবুল্লাহর জন্য স্রেফ ‘শুটিং রেঞ্জচাঁদমারি হাঁস’ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।
তারের বাঁধনে প্রযুক্তির হার
ইসরাইল তো বড়াই করে, তাদের ইলেকট্রনিক ওয়্যারফেয়ার বা সিগন্যাল জ্যাম করার ক্ষমতা দুনিয়া সেরা। কিন্তু হিজবুল্লাহর এই নতুন ড্রোন সেই অহংকার গুঁড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণত ড্রোন চলে রেডিও তরঙ্গের সাহায্যে, যা জ্যাম করা সম্ভব। কিন্তু হিজবুল্লাহর এই ড্রোনগুলো উড়ছে পাতলা ফাইবার অপটিক তারের সাথে যুক্ত হয়ে। নাটাই বাঁধা ঘুড়ির এক রকমফের বলা যায়। এতে কোনো জ্যামার বা সিগন্যাল কাটার যন্ত্রপাতি এই ড্রোনকে আটকাতে পারছে না। অপারেটরের সাথে ড্রোনের যোগাযোগ থাকছে সরাসরি তারের মাধ্যমে।
ইসরাইলি প্রতিরক্ষা দপ্তরের মতে, হিজবুল্লাহর হাতে হাজার হাজার এমন বিস্ফোরক ড্রোন আছে। ৭ অক্টোবরের লড়াইয়ে হামাস যেভাবে ড্রোন দিয়ে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা দেয়াল তছনছ করে দিয়েছিল, হিজবুল্লাহ সেই শিক্ষাকে আরও এক ধাপ উপরে নিয়ে গেছে। এই ড্রোনগুলো রাডারের নিচে দিয়ে ওড়ে, আবার ট্যাংক বিধ্বংসী মিসাইলের চেয়েও উঁচুতে থাকে। ফলে একে খুঁজে পাওয়া যেমন কঠিন, গুলি করে নামানো তার চেয়েও বেশি শক্ত।
আয়রন বিম: কাজ না করা এক রঙিন স্বপ্ন
ইসরাইল এখন হাহুতাশ করছে তাদের লেজার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন বিম’ নিয়ে। রাফায়েল-এর প্রধান এবং সাবেক জ্বালানি মন্ত্রী ড. ইউভাল স্টেইনিৎজ কবুল করেছেন যে, ফাইবার অপটিক ড্রোন ঠেকাতে লেজার হয়তো কার্যকর হতে পারত, কিন্তু সমস্যা হলো সেই প্রযুক্তি এখনো ঠিকঠাক মাঠেই নামাতে পারেনি তারা। মাত্র কয়েক মাস আগে তারা একটা যন্ত্র হাতে পেয়েছে, যা দিয়ে পুরো যুদ্ধ সামলানো অসম্ভব।
ইসরাইলি সংবাদ মাধ্যমগুলোতে ড্রোন ঠেকানোর জন্য নানা অদ্ভুত বুদ্ধি দেওয়া হচ্ছে— কেউ বলছে হামার গাড়ির ওপর নেট বা জাল লাগিয়ে রাখতে, কেউ বলছে রাতের বেলা দেখার বিশেষ ক্যামেরা ব্যবহার করতে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ড্রোনগুলো ঠিকই ইসরাইলি সেনাদের ওপর আছড়ে পড়ছে।
সুড়ঙ্গই শেষ ভরসা
ইসরাইলি সেনাদের জন্য এখন লেবাননের মাটি মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, হিজবুল্লাহর বানানো সুড়ঙ্গগুলোই এখন ইসরাইলিদের কাছে নিরাপদ আশ্রয় মনে হচ্ছে। ‘নেটজিও ডট নেট’ লিখেছে, যখন আকাশ থেকে ড্রোন আর মিসাইল বৃষ্টির মতো পড়ে, তখন মাটির ওপরে থাকা মানেই নিশ্চিত মৃত্যু। তাই ইসরাইলি সেনারা এখন বীরত্ব দেখানোর চেয়ে হিজবুল্লাহর পরিত্যক্ত সুড়ঙ্গে লুকিয়ে প্রাণ বাঁচানোকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
ইসরাইল এখন এক বিশাল ‘কৌশলগত ফাঁদে’ আটকে গেছে। তারা না পারছে লেবানন থেকে পিছু হটে হার স্বীকার করতে, আর না পারছে ড্রোন হামলা থামিয়ে সামনে এগোতে। কর্মকর্তাদের ভয়, হিজবুল্লাহর এই সস্তা অথচ অজেয় ড্রোনের কৌশল যদি হামাস বা পশ্চিম তীরের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের হাতে পৌঁছে যায়, তবে পুরো অঞ্চলে ইসরাইলি আধিপত্য চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাহাড়সম সমর্থন থাকলেও, মাঠপর্যায়ের গেরিলা বুদ্ধির কাছে ইসরাইল যে কতটা অসহায়, তা এই ফাইবার অপটিক ড্রোন যুদ্ধ আবারও প্রমাণ করে দিল। যুদ্ধের ময়দান শুধু দামী অস্ত্র দিয়ে নয়, মাঝে মাঝে সাদামাটা অতি সাধারণ তারের বুদ্ধিতেও দখল করা যায়।