টিপুর রকেট, বিভীষিকা নামাতো ইংরেজ শিবিরে

নাসার এক কর্মশালায় গিয়েছিলেন ভারতের রকেট বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালাম। সেখানকার দেয়ালে টানানো একটি ছবি দেখে চমকে উঠেন তিনি। ছবিটি রকেট হামলার। একদল সেনা রকেট ছুঁড়ে মারছে। আর এতে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে অন্যদল। আবদুল কালামের চোখ আটকে যায় রকেট যারা ছুঁড়ছে, তাদের ওপর। আরে, এদের চেহারাতো ভারতীয়দের মতো!

তারপর ভারতীয় ওই বিজ্ঞানী খোঁজ করে দেখেন, এই ছবিটা মহীশুরের বীর টিপু সুলতানের দলের। আজকের আধুনিক কনগ্রেভ রকেট উদ্ভাবনের সূত্র লুকিয়েছিলো টিপুর রকেট সিস্টেমের ভেতর। এ কারণেই টিপুকে বলা হয় আসল রকেটম্যান।

চলুন আমরা এগিয়ে যাই আরো একটু গভীরে, যেখান থেকে শুরু হয়েছিলো মহীশুরের বিভীষিকা-

ইংরেজ শিবিরে বহুবার বিভীষিকা তৈরি করেছিলো টিপুর লোকেরা। ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে যেমন ভয় পায়, আকাশে নীল আলোর ছটা দেখলেই তেমন আঁতকে উঠতো বৃটিশরা। ওরা জানতো একটু পরই আঘাত হানবে টিপুর রকেটের ঝাঁক। ওগুলো আচমকা আঘাত হানতো।

রকেটের সাথে জুড়ে দেওয়া হতো বাঁশের ফলা। এগুলো ক্ষত-বিক্ষত করতো বৃটিশ সেনাদের।

তৃতীয় অ্যাংলো-মহীশুর যুদ্ধে হামলা করা হয় কর্নেল নক্স এর সেনাদের ওপর। ১৭৯২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কর্নেল নক্স তার সেনাদল নিয়ে উত্তর থেকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন কাবেরি নদীর দিকে। সেরিঙ্গাপটমের কাছে এসে টিপুর হামলার শিকার হন। ঝাঁকে ঝাঁকে রকেট নামতে শুরু করলো তার দলের ওপর। কিছু রকেট শূন্যে বিস্ফোরণ তুলতো। কিছু এসে মাটিতে ড্রপ খেতো। ওগুলো ড্রপ খেয়ে সাপের মতো করে এগুতো।

এমন অদ্ভুত আক্রমণ এর আগে দেখেনি ইংরেজরা। কেবল ইংরেজরাই নয়, গোটা পৃথিবীর কেউ দেখেনি। তখনও পৃথিবীতে রকেট ছিলো। তবে সেগুলো বাঁশের চোঙ্গায়। অথচ টিপুর রকেটগুলো লোহার তৈরি। লোহার খোলসভর্তি গানপাউডার।

গানপাউডার ব্যবহার করে প্রথম রকেট উড়ানোর প্রযুক্তি আবিষ্কার হয় চীন দেশে। শুরুতে ওরা গানপাউডার দিয়ে উৎসব করতো। বাঁশের খোলসে পাউডার ভরে বিস্ফোরণ তুলতো। এতে চীনাদের উৎসব হতো আলোঝলোমল।

এমন করেই রকেটের আবিষ্কার। কোনো এক উৎসবে গানপাউডার-ভর্তি বাঁশের চোঙ্গা অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করে। ওটা অন্য চোঙ্গাগুলো থেকে ছিটকে আলাদা হয়ে যায়। এরপর একটি পাল্লা তৈরি করে কিছুদূর গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটায়। মূলত গনপাউডারের গ্যাস ও স্ফুলিঙ্গের শক্তিতেই ওই চোঙ্গাটা ছিটকে গিয়েছিলো।

সেই থেকে প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে রকেট ব্যবহার শুরু হয়। চীনারা প্রথম রকেট ব্যবহার করে মঙ্গোলিয়দের বিরুদ্ধে। এতে মঙ্গোলিয়রা হতভম্ব হয়ে যায়। পর্যবেক্ষণ করতে থাকে এর কৌশল। শেষে নিজেরাই সেটা আয়ত্ব করে ফেলে। মঙ্গোলিয়দের মাধ্যমে রকেট ছড়িয়ে যায় ইউরোপে। তবে সেসব রকেট বাঁশের চোঙ্গাতেই সীমাবদ্ধ ছিলো।

বাঁশের রকেট ব্যবহার করতেন টিপু সুলতানের বাবা হায়দার আলীও। তার সময়ে মহীশুর বাহিনীতে রকেট-সেনার সংখ্যা ছিলো বারোশ’। ১৭৮০ সালে পল্লীলুরের যুদ্ধে রকেটের তেলেসমাতি দেখান তিনি। তার কাছে পরাজিত হয় বৃটিশ বাহিনী। ওই যুদ্ধে রকেট হামলা করে ইংরেজদের অস্ত্রগুদামে আগুন ধরিয়ে দেন হায়দার আলী।

মহীশুরের ট্রাম্প কার্ড ছিলো রকেট। টিপু সুলতানের সময় এর গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়। তিনি মোকাবেলা করেন শক্তিশালী ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে। এদের বিরুদ্ধে টিকে থাকার জন্য নিপুণ কৌশল চাই। টিপু সুলতান রকেট নিয়ে গবেষণায় মন দেন। ১৭০০ দশকের শেষের দিকে তিনি ব্যবহার করতে থাকেন লোহার তৈরি খোলস। লোহার খোলসের ভেতর প্রকট বিস্ফোরণ হয়। এতে রকেটের ক্ষিপ্রতা ও পাল্লা বেড়ে যায়। টিপুর রকেটগুলো দুই কিলোমিটার দূর পর্যন্ত আঘাত হানতে পারতো। ওই সময়ের ইউরোপের বাঁশের রকেটের পাল্লা এর কাছাকাছিও ছিলো না।

টিপুর রকেটের বৈজ্ঞানিক নকশাও ছিল। বারুদভর্তি ধাতব টিউব এক দিক থেকে বন্ধ ছিল। এবং অন্যদিকে সেঁটে দেওয়া হতো তলোয়ার। এতে রকেটের নিশানা ঠিকঠাক থাকতো। তাছাড়া একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব উড়ে গিয়ে সাঁই করে ঘুরে যেতো ওটা। এরপর আঘাত হানতো তলোয়ারের ধারালো ফলা।

একইসাথে দুইরকমের সুবিধা দিতো তলোয়ার। উড়ার সময় রকেটকে স্থিতিশীল রাখতো। আর পাল্লার শেষের দিকে পরিণত হতো অস্ত্রে।

লোহার জ্বালানী চেম্বারের সাথে যুক্ত থাকতো চারফুট লম্বা বাঁশের ফলা। এই ফলার আঘাতও ছিলো তীব্র। জ্বালানী চ্যাম্বারটি ছিলো আট ইঞ্চি লম্বা। এবং দেড় থেকে তিন ইঞ্চি ব্যাস। মাপজোক ঠিক রেখে নিক্ষেপ করতে হতো ওগুলো। এর জন্য সেনাদের দেওয়া হতো আলাদা প্রশিক্ষণ। রকেট চালানোর জন্য টিপুর বাহিনীতে ছিলো পাঁচ হাজার সেনা। রকেট চালিয়ে তিনি শত্রæদের মধ্যে বিভীষিকা তৈরি করতেন।

তখন একইসময়ে একাধিক রকেট ছুঁড়ে মারতে ব্যবহার হতো গাড়ি। দেখতে অনেকটা আধুনিক দিনের আর্টিলারি ইউনিটের মতো।

রকেট তৈরি করতে মহীশুরের বিভিন্ন এলাকায় ওয়ার্কশপ স্থাপন করেছিলেন টিপু সুলতান। স্থানীয় কারিগররাও এর বিকাশে বিশাল ভ’মিকা রেখেছেন।

রকেটের কারণে টিপুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বৃটিশরা কুলিয়ে উঠতে পারতো না। এ কারণে টিপুর রকেট নিয়ে আলাদা কৌতুহল তৈরি হয় তাদের। শেষ পর্যন্ত এই কৌতুহল মিটে তাদের। প্রতাপশালী ইংরেজদের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পারেননি টিপু সুলতান। ১৭৯৯ সালে তুরুখানাল্লির যুদ্ধে নিহত হন তিনি।

এরপর ইংরেজরা হাতে পেয়ে যায় রকেট কৌশল। এরা টিপুর অস্ত্রাগারে পায় ৭০০ রকেট ও ৯০০ রকেট তৈরির যন্ত্রাংশ। শুরু হয় গবেষণা। এগুলোকে ইংল্যান্ডে নিয়ে যান উইলিয়ান কনগ্র্যাভ। গবেষণার পর আয়ত্ত¡ করেন কৌশল। এরপর আরো গবেষণার পর উদ্ভাবন হয় কনগ্র্যাভ রকেট।

টিপুর রকেট যখন ইংরেজদের হাতে যায়, তখন বিশ্বের নানাদিকে ব্যবহার করতে থাকে তারা। এই রকেট সিস্টেম দিয়েই ওয়াটারলু যুদ্ধে নেপোলিয়নকে পরাজিত করেছিলো ইংরেজরা। ওয়াটারলু যুদ্ধের নায়ক ছিলেন আর্থার ওয়েলেসলি। তিনি ১৭৯৯ সালে সুলতানপেট টোপের যুদ্ধে অপমান নিয়ে হেরেছিলেন টিপুর কাছে। তার দুর্গের ওপর একের পর এক এসে পড়ছিলো আগুনের ঝাঁক। তখন হতবাক হয়ে পড়েছিলেন তিনি। দুর্গে তৈরি হয়েছিলো বিশৃঙ্খলা। শেষে সেনাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন আর্থার।

টিপুর রকেট নিয়ে পড়াশুনা করেছেন জওহরলাল নেহরু সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড সায়েন্টিফিক রিসার্চের বিজ্ঞানী রোত্তম নরসিমা। তিনি বলেন, ‘সুলতানপেটে অপমানিত হওয়ার পর ওয়েলেসলিকে বদলে দেওয়া হয়। তার এক জীবনী লেখক লিখেছেন, ওয়েলেসলি এর আগে কখনো রণাঙ্গনে ভয় পাননি। এরপর ওয়েলেসলি এই রকেট প্রযুক্তি ব্যবহার করে নেপোলিয়নকে পরাজিত করে সেনাপতি হন। মহীশুরের রকেট প্রভাবিত করেছে ওয়াটারলুর যুদ্ধকেও।’

মহাকাশ বিজ্ঞানী নরসিংহ মনে করেন, রকেট প্রযুক্তিতে টিপুর অবদান প্রশ্নাতীত। তিনিই হলেন ভারতের আসল রকেটম্যান।

উপস্থাপক: মশিউর কায়েস
লেখক: শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ
প্রযোজক: সজল ফকির

Leave a reply

Join Us
  • Facebook
  • Youtube
Categories

Advertisement

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...