মুজিব-বন্দনায় অন্যদের ভোট কমে, ফজলুর রহমানের বাড়ে

বিশ্লেষণ3 months ago36 Views

অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানকে নিয়ে একটা সাসপেন্স ছিলো। দল থেকে তার পদ স্থগিত করার পর অনেকে ধরেই নিয়েছিলো, তিনি আওয়ামী লীগের বিকল্প একটা রাজনৈতিক দল গঠন করতে যাচ্ছেন। তার কিছু কথায় এধরনের ইঙ্গিতও পাওয়া গিয়েছিলো। কিন্তু সবরকমের সন্দেহ দূর করে দিয়ে ফজলুর রহমানের হাতে তুলে দেওয়া হলো ধানের শীষ।

পুরো ব্যাপারটা দারুণ রোমাঞ্চকর। মনোনয়ন দেওয়ার আগে তার পদের ওপর স্থগিতাদেশও প্রত্যাহার করা হয়নি। তিনমাসের জন্য ফজলুর রহমানের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পর্যায়ের পদ স্থগিত করা হয়েছিলো আগস্ট মাসের ২৬ তারিখ। সে হিসাবে তিনমাস এখনো পার হয়নি।

তাহলে, ঘটনাটা কী ঘটলো?

ঘটনা যাই ঘটুক, ফজলুর রহমান যে তার নির্বাচনী এলাকায় জনপ্রিয় সেটা মনোনয়ন পাওয়ার পর তার ভোটারদের উচ্ছ্বাস থেকে দেখা গেছে।

মজার ব্যাপার হলো, বিএনপির অন্য যারা আওয়ামী লীগের বয়ান ফেরি করেন তাদের সঙ্গে ফজলুর রহমানকে মেলালে ভুল হবে।

অন্যরা আওয়ামী লীগের বয়ান ফেরি করে নিজেদের ভোট কমান। আর ফজলুর রহমান ভোট বাড়ান।

আপনারা যারা সোজাসাপটা বলে দেন- ফজলুর রহমান পাশ করতে পারবেন না, তাদের জন্য বলছি, দয়া করে তার নির্বাচনী এলাকায় খোঁজ নিয়ে কথা বলেন।

চব্বিশের বিপ্লবের বিরুদ্ধে কথা বলায় সারাদেশে তিনি সমালোচিত হয়েছেন, এটা সত্য। কিন্তু একটা লোক এমপি হতে গেলে তো সারাদেশের ভোটের দরকার হয় না।

তার জয়-পরাজয় নির্ভর করে নিজের আসনের লোকদের ভোটের ওপর।

ফজলুর রহমান নিজের ভোটারদের নার্সিং করছেন।

চব্বিশের বিপ্লবের পর দেশে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের তলদেশের স্রোত ঠিক কোনদিকে বইছে, সেটা কেবল একটা নির্বাচন হয়ে গেলেই বোঝা যাবে। তার আগে নয়। আগের অনেক হিসাব-নিকাশ এখন অচল হয়ে গেছে।

তারপরও তো বাইরে থেকে বয়ে যাওয়া বাতাস আঁচ করা যায়। সেই বাতাসের শব্দ ফজলুর রহমানের অনুকুলে আছে বলেই মনে হচ্ছে।

সম্ভবত এ কারণেই বিএনপি তাকে মনোনয়ন দিয়েছে। তাছাড়া কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে বিকল্প কোনো প্রার্থীও ছিলো না দলটির। হ্যাঁ, মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন অনেকে। কিন্তু তাদের সঙ্গে ফজলুর রহমানের জনপ্রিয়তার ফারাক আকাশ আর পাতালের মতো।

অন্যদিকে সারাদেশে জামায়াতের যে সুবাতাস বয়ে যাচ্ছে, সেটা নিয়েও আতঙ্ক আছে বিএনপির। ওই আসনে দুর্বল কাউকে মনোনয়ন দিলে সেটা হতো জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট রোকন রেজাকে দেওয়া বিএনপির উপহার।

রোকন রেজা ফজলুর রহমানের পাড়াতো ভাতিজা। স্থানীয় একটা ইশকুলের অনুষ্ঠানে দুইজনকে একসাথে দেখা গিয়েছিলো। জামায়াত তখন প্রাথমিকভাবে তাদের প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকায় রোকন রেজার নাম ছিলো। সেই প্রসঙ্গ টেনে অনুষ্ঠানের মাইকে রোকন রেজাকে ‘ভাতিজা’ বলে ডাক দিয়েছিলেন ফজলুর রহমান।

ওই ডাকের সাথে জড়িয়েছিলো আদর। ছিলো মহব্বত। আর হালকা একটু তাচ্ছিল্যও।

ফজলুর রহমানের পাড়াতো এই ভাতিজা বয়সে কম। তিনি কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ছিলেন। পরে কেন্দ্রীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন তিনি জামায়াতে ইসলামী ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তর শাখার আইন বিভাগের সেক্রেটারি।

রোকন রেজা যখন শিবির করতেন, তখন থেকেই নিজের মাঠ গড়তে শুরু করেছিলেন। ওই সময় থেকেই তরুণদের মধ্যে একটা প্রভাব ছিলো এই নেতার। এখন সেই প্রভাবের পরিসর অনেক বড় হয়েছে। তবে ঠিক কতোটা বড় হয়েছে, সেটা নির্বাচন হওয়ার আগে আঁচ করা কঠিন।

মজার ব্যাপার হলো, এই সংসদীয় আসনে যারাই রাজনীতি করেন, ভোটারদের সাথে তাদের যোগাযোগটা থাকে জলের মতো সহজ। শেখ হাসিনা সরকারের প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদের যত দুর্নামই থাকুক, তার একটা সুনাম ছিলো- তিনি মানুষের ঘরের খবর জানতেন। রহিম-করিম আর রোখসানাদের নাম ধরে ডাকতেন। এ কারণেই তিনি জনপ্রিয় ছিলেন। তবে শেষদিকে এসে এলাকায় মাফিয়াতন্ত্র বাস্তবায়ন করেছিলেন আব্দুল হামিদ। মানুষের সাথে যোগাযোগ কমে গিয়েছিলো তার ও তার পরিবারের।

তখন হাওরে তলে তলে স্রোত বয়ে যাচ্ছিলো ফজলুর রহমানের। যারা আওয়ামী লীগ করেন, মনে-প্রাণে নৌকাকে ভালোবাসেন, তারাও ফজলুর রহমানের ধানের শীষ নিয়ে ফিস-ফাস করতেন।

ফিসফাস না করে উপায় ছিলো না, সবদিকে মাফিয়াদের মাইক্রোফোন পাতা ছিলো। একটু আওয়াজ হলেই গলা চেপে ধরা হতো।

স্বয়ং ফজলুর রহমানের অবস্থাও ছিলো তথৈবচ। তাকে এলাকায় ঢুকতে দেওয়া হতো না। ফজলুর রহমান বাড়ি যাবেন, এই খবর শুনলেই মাঝপথ থেকে ঢাকায় ফিরিয়ে দেওয়া হতো।

ওই সময়টায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গলা ছেড়ে কথা বলতেন তিনি। শেখ হাসিনাকে ধুয়ে ছেড়ে দিতেন। ফ্যাসিবাদ ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তিনি যা বলতেন- মানুষ সেগুলো শুনতো। তার গরম বক্তৃতায় উজ্জ্বীবন পেতো।

আসলে ফজলুর রহমানের কথা শুনতেই ভালো লাগে। তার কথায় ছন্দ আছে, তাল আছে। ধাক্কা আছে। আর আছে উজ্জ্বীবনের রসদ।

কিন্তু চব্বিশের বিপ্লবের পর তার বয়ান অনেকটা পাল্টে যেতে শুরু করলো। পতিত স্বৈরাচারের ফেলে যাওয়া গালি ‘রাজাকার’ ‘আল-বদর’কে কুড়িয়ে নিলেন এই নেতা।

এতে কী হলো?

দেশজুড়ে সমালোচনা তৈরি হলো। তার নামের সাথে লেগে গেলো পাল্টা গালি ‘ফজুপাগলা’। তিনি ইট মারলেন। জবাবে পাটকেল খেতে থাকলেন। শুরু হলো ‘ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া’।

এক পর্যায়ে জুলাইযোদ্ধারা অসহ্য হয়ে উঠলো তার কাছে। টকশোতে তার সাথে কোনো জুলাইযোদ্ধাকে ডাকা হলে তিনি তাদের বয়স জিজ্ঞেস করতে শুরু করলেন।

তিনি যখন গুলশান অফিসে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বৈঠকে ডাক পেলেন, তখন তার স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হয়েছে কি না, এ নিয়ে কৌতুহল তৈরি হয় মানুষের। আর মানুষের কৌতুহল মেটাতে গিয়ে ফজলুর রহমানকে ফোন করেছিলেন কিশোরগঞ্জের এক সাংবাদিক। তিনি জানতে চেয়েছিলেন- তার পদের ওপর স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হয়েছে কি না?

এর জবাব না দিয়ে ওই সাংবাদিকের বয়স জিজ্ঞেস করে বসেন ফজলুর রহমান।

বয়সে যারা তার ছেলের চাইতেও কম, তাদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ব্যাপারে যথেস্ট সন্দেহ আছে ফজলুর রহমানের।

তার ছেলের বয়স কতো, খোঁজ নিয়ে দেখিনি। আশা রাখি আমার চাইতে বেশি না। আর যদি তার ছেলে বয়সে আমার চাইতে বড় হয়েই থাকেন, তাহলে আমার ষোলআনাই মিছে হয়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে।

ফজলুর রহমান আমার গুরুজন। তাছাড়া জুলইয়ের পেছনে আছে তার অগ্নিঝরা অবদান। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তিনি বাতাসে ছড়িয়েছেন জ্বলন্ত বারুদ। এই সত্যটা আমাদের মনে রাখতে হবে।

আর এই সত্যটা ছিলো বলেই নতুন বাংলাদেশে দাপট নিয়ে আছেন তিনি। তার হাতে আসে ধানের শীষ প্রতীক।

নতুন রাজনীতিতে ধানের শীষের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে দাঁড়িপাল্লা। তিনি জামায়াত ও শিবিরের সমালোচনা করবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমালোচনা করতে গিয়ে ৫ আগস্টের জন্য জামায়াত ও শিবিরকে দায়ী করে তাদেরকে ‘কালো শক্তি’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি। এ কারণেই বিএনপি থেকে পদ স্থগিত হয়েছিলো তার।

তাকে নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল থেকে অংশ নেওয়া জিএস প্রার্থী শেখ তানভির বারী হামিম। তিনি এক টকশোতে বলেছিলেন- ওয়ান্স এ আওয়ামী লীগ, অলওয়েজ আওয়ামী লীগ।

ভদ্র ও মার্জিত এই ছাত্রনেতা ঠিক বলেছেন কি না, আমার জানা নেই।

তবে এটা বলতে পারি, অলওয়েজ না হলেও আপাতত আওয়ামী লীগ থাকাটা ফজলুর রহমানের জন্য সুবিধাজনক।

হ্যাঁ, ইটনা-মিঠামইন ও অষ্ট্রগ্রাম অর্থাৎ কিশোরগঞ্জ-৪ সংসদীয় আসনের ভোটাররা একচেটিয়া আওয়ামী লীগের। এখন আওয়ামী লীগ নেই। আছেন ফজলুর রহমান।

ফজলুর রহমান যখন ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করেছেন, তখনো নৌকার প্রার্থী আব্দুল হামিদকে সমানে সমান টেক্কা দিয়েছেন। দিনের ভোট রাতে না হলে হয়তো জিতেও যেতেন তিনি।

আসলে যারা নৌকা প্রতীক পছন্দ করেন, এমন লোকেরাও ফজলুর রহমানকে ভালোবেসে ভোট দিয়েছেন ধানের শীষে।

সুবক্তা এই নেতার ব্যক্তিগত ভোটার আছে। আর এই ভোটারদের সংখ্যা অনেক। তারা হয়তো নৌকা ভালোবাসেন। কিন্তু ফজলুর রহমানের জন্য ভোট দেন ধানের শীষে।

আর ফজলুর রহমান মুজিব-বন্দনা করেন, তখন অনেকেই তার চোখে খুঁজে পান ডুবে যাওয়া নৌকার ছায়া।

অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান একানব্বইয়ে নির্বাচন করেছেন নৌকা নিয়ে। হাওর থেকে নয়, কিশোরগঞ্জ-৩ অর্থাৎ সদর আসন থেকে। তখন তিনি হেরে গিয়েছিলেন ধানের শীষের এক মাওলানার কাছে।

১৯৯৬ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কিশোরগঞ্জ-৫ আসন থেকে নির্বাচন করে হেরে যান। ২০০১ সালে ওই আসনে কাদের সিদ্দিকীর গামছা নিয়েও পরাজিত হন। তখন কাদের সিদ্দিকীর দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি।

ফজলুর রহমান বিএনপিতে আসেন ২০০৭ সালে। তাকে বিএনপিতে আসতে উৎসাহিত করেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এবং নুরুল কবির। জাফরুল্লাহর সঙ্গে তার পুরনো সম্পর্ক। তার মাধ্যমে হাওর উন্নয়নে অনেক কাজ করেছেন ফজলুর রহমান। জাফরুল্লাহ ফজলুর রহমানকে বিশ্বাস করতেন। পছন্দ করতেন। কারণ আর্থিকভাবে ফজলুর রহমানের সততা আছে। তার জীবন জৌলুশে ভরা নয়।

বিএনপিতে আসার পর ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করেন তিনি। কিন্তু ওইসব নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা না থাকায় তিনি হেরেছেন, নাকি জিতেছেন সেটা স্পষ্ট করে বলা যায় না।

তবে বাইরের ফলাফল থেকে আমরা যতদূর জানি, তার জীবনে জয়ের দেখা নেই।

লাগাতার পরাজিত হওয়া এই প্রার্থী এবার কি জয় পাবেন?

‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ সরাসরি বলাটা মুশকিল।

তবে মোটাদাগে বলা যায়- এই আসনের জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবেন ধানের শীষ বা দাঁড়িপাল্লার মার্কামারা ভোটাররা নয়, বরং আওয়ামী-লীগ সমর্থক ভোটারেরা। তাদের বড় অংশের ভোট যেতে পারে ধানের শীষে। আর আব্দুল হামিদের কট্টর সমর্থকেরা ফজলু-বিরোধীতার জন্য বেছে নিতে পারেন দাঁড়িপাল্লার রোকন রেজাকে।

কিন্তু জয় পাবেন কে? ফজলুর রহমান কি প্রথমবারের মতো জিতে যাচ্ছেন?

হিসাবটা দয়া করে নিজেরাই মিলিয়ে নিন। তবে মনে রাখবেন, রাজনীতির শেষ হিসাব কখনো মেলানো যায় না।

দেখুন শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ এর আলাপ

Leave a reply

Loading Next Post...
Follow
Search Trending
Popular Now
Loading

Signing-in 3 seconds...

Signing-up 3 seconds...