প্রতিদিনের জীবনজুড়ে আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে রাতের খাবারের টেবিলের আড্ডা, সবখানেই এর বিচরণ। অতীতের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনগুলোর সাথে এআই-এর পার্থক্য কোথায়? এই উন্নত সিস্টেমগুলো এমন সব কাজ করতে পারে, যেগুলো আগে কেবল মানুষের পক্ষেই করা সম্ভব ছিলো। এআই সেগুলো দ্রুত করে দিচ্ছে।

প্রযুক্তি সাংবাদিক হিসেবে আমি এক দশক ধরে এআই নিয়ে লিখছি ফরচুন (Fortune) এবং ভেঞ্চারবিট (VentureBeat)-এর মতো প্রকাশনাগুলোতে। এর অগ্রগতি সত্যিই বিস্ময়কর। তবে এটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উন্মাদনা শুরু হয় ২০২২ সালের নভেম্বরে, যখন ওপেনএআই (OpenAI) ‘চ্যাটজিপিটি’ (ChatGPT) চালু হয়।
চ্যাটজিপিটি ছিল প্রথম চ্যাটবট। এটি বহুমুখী কাজ করতে জানে। মানুষের মতো কথা বলতেও পারে। এটি দ্রুত মানুষের কল্পনাশক্তি জয় করে নেয়। এবং ইতিহাসের দ্রুততম ক্রমবর্ধমান কনজিউমার সফটওয়্যার অ্যাপ্লিকেশনে পরিণত হয়- মাত্র প্রথম দুই মাসে চ্যাটজিপিটি ১০০ মিলিয়ন ব্যবহারকারীর মাইলফলক স্পর্শ করে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য বলছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের এক-তৃতীয়াংশ প্রাপ্তবয়স্ক লোক এআই চ্যাটবট ব্যবহার করেছেন। সমপরিমাণ কিশোর-কিশোরী প্রতিদিন এটি ব্যবহার করছে।
এত ব্যাপক ব্যবহারের পরও এআই-এর গল্প এখনো সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই প্রযুক্তি এখনো নিখুঁত নয়। তবে আপনি এর অভূতপূর্ব কম্পিউটিং ক্ষমতাকে নিজের সুবিধায় ব্যবহার করতে পারেন। নিরাপদ, কার্যকর এবং সৃজনশীলভাবে এটি ব্যবহার করতে হলে আপনি আসলে কী নিয়ে কাজ করছেন সেটা বোঝা জরুরি। যেসব বিষয় জেনে রাখা প্রয়োজন-

এআই কী?
এআই হলো এমন একটি প্রযুক্তি যা কম্পিউটার এবং মেশিনকে জটিল কাজ করার ক্ষমতা দেয়, যা সাধারণত মানুষের বুদ্ধিমত্তার সাথে সম্পৃক্ত- যেমন শেখা এবং সমস্যা সমাধান করা। মানুষ সাধারণত এআই বলতে ‘জেনারেটিভ এআই’ (Generative AI) বুঝে। এই এআই লেখা, ছবি, ভিডিও এবং কম্পিউটারের কোড তৈরি করতে পারে।
আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে, তারা প্রায়ই এআই চ্যাটবট বা অ্যাসিস্ট্যান্টের কথা বলে যা ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ (LLM) দ্বারা চালিত। এগুলো বিশাল পরিমাণ মানুষের ভাষা বা ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষিত অত্যাধুনিক সফটওয়্যার। এগুলো চ্যাটজিপিটি বা ক্লড (Claude)-এর মতো সাধারণ কাজের টুল থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট কাজের জন্য তৈরি বিশেষ ‘এজেন্ট’ পর্যন্ত হতে পারে।
আপনি যদি কখনও অ্যালেক্সা (Alexa) বা সিরি (Siri) ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে অনেকটা একই ধরণের প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। তবে চ্যাটজিপিটি, গুগল জেমিনি (Gemini) বা ক্লড-এর মতো চ্যাটবটগুলো অনেক জটিল এবং বৈচিত্র্যময় কাজ করতে পারে। এগুলো শুধু কণ্ঠস্বরে সীমাবদ্ধ নয়—আপনি এতে টাইপ করতে পারেন, ডকুমেন্ট পাঠাতে পারেন এবং ছবি বিশ্লেষণ করতেও বলতে পারেন।
এআই কীভাবে কাজ করে?
এআই সিস্টেমগুলো মূলত বিশাল এক ‘প্যাটার্ন-বিশ্লেষণকারী প্রেডিকশন মেশিন’ বা অনুমানের যন্ত্র। চ্যাটবটের এই চমৎকার ভাষাগত দক্ষতা তৈরির জন্য বিজ্ঞানীরা ইন্টারনেটের প্রায় সমস্ত লেখা একটি বিশেষ কম্পিউটার সিস্টেমে প্রবেশ করিয়েছেন, যা মানুষের ভাষার অনুমানযোগ্য ধরণ বা প্যাটার্ন শনাক্ত করতে পারে।
আপনি যখন চ্যাটবটকে কোনো কাজ দেন (যাকে প্রম্পট বলা হয়), এটি তার ডেটাসেটের প্যাটার্নগুলো ব্যবহার করে অনুমান করে একটি যৌক্তিক উত্তরের জন্য- কোন শব্দের পর কোন শব্দ আসা উচিত। এআই আসলে কিছু ‘জানে’ না, তবে মানুষের কথা বলার ধরণ অনুকরণ ও অনুমান করতে দক্ষ। বর্তমানে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক চলছে, এআই যা করে তাকে ‘চিন্তা করা’ বলা যায় কি না। গবেষণা বলছে কিছু চ্যাটবট এমন আচরণ করে যা চিন্তা বা বিচারবুদ্ধির মতো মনে হয়। কিন্তু এআই মডেলগুলো সামগ্রিকভাবে কীভাবে কাজ করে সেটা আমরা জানি। প্রতিটি নির্দিষ্ট উত্তরের পেছনে তারা ঠিক কী সিদ্ধান্ত নেয় তা এখনো পুরোপুরি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এআই দিয়ে আপনি কী করতে পারেন?
এর সম্ভাবনা সীমাহীন। কেউ এআই দিয়ে বাচ্চাদের গল্পের বই লিখছেন, কেউ ওয়ার্কআউট প্ল্যান বানাচ্ছেন, আবার কেউ কুকুরের বাচ্চার নাম ঠিক করছেন। একজন তো আমাকে জানিয়েছেন, তিনি তার পায়ের পাতার ছবি আপলোড করে চ্যাটবট দিয়ে সেটা বিশ্লেষণ করিয়েছিলেন, যাতে তার পায়ের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক রানিং জুতা খুঁজে পাওয়া যায়।
অন্য একজন এআই-কে তার ব্যক্তিগত ‘চিফ অব স্টাফ’ হিসেবে ব্যবহার করেন। দিনের শেষে তিনি ক্লড (Claude) অ্যাপটি খুলে তার মনের সব দুশ্চিন্তা, কাজের তালিকা এবং টুকিটাকি বিষয়গুলো সেখানে লিখে দেন। এরপর ক্লড সেগুলোকে গুছিয়ে তার সারা সপ্তাহের কাজের রুটিন তৈরি করে দেয়।
এআই বিশাল পরিমাণ ডেটা সংক্ষেপে প্রকাশ করতে, জটিল বিষয় সহজভাবে বোঝাতে এবং দীর্ঘ কোনো লেখা থেকে মূল বিষয়গুলো খুঁজে বের করতে দারুণ কার্যকর। এছাড়া সৃজনশীল কাজের সঙ্গী হিসেবেও জনপ্রিয়। বাগান করা, জীবনবৃত্তান্ত (Resume) উন্নত করা বা ব্যবসার পরিকল্পনা—সবকিছুতেই এআই-এর সাথে মতবিনিময় করা যায়।
ব্যক্তিগতভাবে আমি রান্নাঘরে এর অনেক সুবিধা পেয়েছি। চ্যাটজিপিটি রেসিপির পরিমাপগুলো আমার জন্য নিমিষেই হিসাব করে দেয়। এছাড়া ক্লড আমাকে সারা সপ্তাহের খাবারের পরিকল্পনা (Meal Planning) করে দিয়ে আমার জীবন অনেক সহজ করে দিয়েছে।
এআই ব্যবহারের ঠিকঠাক উপায় কী?
কোন চ্যাটবট সেরা, সেটা বলা কঠিন। একেকজনের পছন্দ একেক রকম। তবে সব প্ল্যাটফর্মই এখন প্রায় কাছাকাছি মানের সেবা দেয়। তাই বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পরীক্ষা করে দেখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
এআই ব্যবহারের সময় আপনার ‘প্রম্পট’ বা নির্দেশনায় সুনির্দিষ্ট হোন। আপনি যত বিস্তারিত তথ্য দেবেন, উত্তর তত নিখুঁত হবে। বড় কোনো কাজকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করে নিন। যেমন, সরাসরি ‘আমাকে একটি ব্যবসা শুরু করতে সাহায্য করো’ না বলে, আগে নিজের সম্পর্কে এবং কী ধরণের ব্যবসা করতে চান সেটা জানান। এরপর বাজার গবেষণা ও পরিকল্পনা করতে এর সাহায্য নিন। এআই-এর ক্ষেত্রে ‘প্রেক্ষাপট’ (Context) খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কোন বিষয়গুলোতে সতর্ক থাকতে হবে?
হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ-এর এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মানুষ এখন থেরাপি বা একাকীত্ব দূর করতেও জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করছে। তবে এর ফলে অনেকে বাস্তবের চেয়ে এআই-এর ওপর বেশি আবেগপ্রবণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন, যা থেকে মানসিক সমস্যাও তৈরি হতে পারে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো তথ্যের সঠিকতা। এআই মাঝেমধ্যে ভুল তথ্য খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে উপস্থাপন করে, যাকে প্রযুক্তিগত ভাষায় ‘হ্যালুসিনেশন’ (Hallucination) বলা হয়। তাই স্বাস্থ্য বা আইনি উপদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এর ওপর পুরোপুরি নির্ভর করবেন না। তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে একে সোর্সের লিংক দিতে বলুন।
এছাড়া তথ্য সুরক্ষা বা প্রাইভেসি নিয়ে ঝুঁকি থাকে। আপনি চ্যাটবটে যা শেয়ার করছেন তা পুরোপুরি গোপন থাকবে- এমন নিশ্চয়তা নেই। পাশাপাশি এআই দিয়ে তৈরি ছবি বা ভিডিও এতই বাস্তবসম্মত মনে হয়, আসল-নকল চেনা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই ইন্টারনেটে যা দেখছেন তা নিয়ে কিছুটা সংশয় থাকা জরুরি।
সামনে কী আসছে?
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখন ‘এআই এজেন্ট’ তৈরির কাজ করছে। এটি এমন এক সফটওয়্যার যা আপনার হয়ে সরাসরি কাজ করে দেবে। যেমন, শুধু ভ্রমণের পরিকল্পনা করাই নয়, এআই আপনার ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে টিকিট এবং হোটেলও বুক করে দেবে। এটি সায়েন্স-ফিকশন মুভির মতো আপনার একজন সত্যিকারের সহকারী হিসেবে কাজ করবে।
এআই প্রযুক্তি ঠিক কোন দিকে যাবে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। তবে মনে রাখবেন, এআই-এর কোনো কিছুই অনিবার্য নয়। এটি মানুষই তৈরি করছে এবং আমরাই সিদ্ধান্ত নেব আমরা কতটা ব্যবহার করব বা বিশ্বাস করব। এআই-এর সাথে পরিচিত হওয়া মানেই আমাদের জীবনে এর ভূমিকা কেমন হবে, সেটা আমাকেই নির্ধারণ করতে হবে।
আমি দশ বছর ধরে এই ক্ষেত্রে কাজ করছি। তারপরও নিজেকে ‘সুপারইউজার’ মনে করি না- আর আপনারও সুপারইউজার হওয়ার দরকার নেই। ছোট ছোট কাজ দিয়ে শুরু করুন। দেখুন এআই কোথায় আপনার কাজ সহজ করে দিচ্ছে। আর কোথায় ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। দিনশেষে নিয়ন্ত্রণটা আপনার হাতেই।

সেজ ল্যাজারো: মার্কিন প্রযুক্তি লেখক। রিডার্স ডাইজেস্ট– এ প্রকাশ হওয়া তার এই লেখাটা ভাবানুবাদ করা হয়েছে। – ইনফোজা ডেস্ক