৪ ফুট ১০ ইঞ্চি উচ্চতার যে মানুষটি বদলে দিয়েছিলো ইতিহাস

খেলা6 months ago86 Views

৪ ফুট ১০ ইঞ্চি উচ্চতার যে মানুষটি বদলে দিয়েছিলো ইতিহাস

১৯৮৮ সালের সিউল অলিম্পিকের কথা। ৪ ফুট ১০ ইঞ্চি উচ্চতার এক তরুণ ধীরে ধীরে উঠে এল অলিম্পিকের ভারোত্তোলনের মঞ্চে। বিশাল দেহের শক্তিশালী অ্যাথলেটদের ভিড়ে তাকে দেখাচ্ছিল যেন এক শিশু। দর্শকসারিতে ফিসফিস শুরু হলো। সাংবাদিকদের ক্যামেরার পেছন থেকেও শোনা গেল চাপা হাসি। “এত ছোট মানুষ কীভাবে এত ভারী ওজন তুলবে?” মুহূর্তটা ছিল অবহেলার, অবিশ্বাসের। কিন্তু সে তরুণের চোখে ছিল অন্যরকম আগুন। বারবেল ছুঁয়ে সে গভীর শ্বাস নিল। পুরো স্টেডিয়াম তখন নিস্তব্ধ। এক ঝটকায় ওজন উঠল তার কাঁধে… তারপর মাথার ওপরে। এভাবে কয়েক মুহূর্ত কেটে গেলো। হঠাৎ করেই বদলে গেল দৃশ্যপট। যেখানে ছিল হাসাহাসি, সেখানে ছুটে এলো বিস্ময়। যেখানে ছিল অবহেলা, সেখানে শুরু হলো গর্জন করা করতালি। দর্শকরা দাঁড়িয়ে পড়ল আসন ছেড়ে। সাংবাদিকরা ক্যামেরা নামিয়ে তাকিয়ে রইল বিস্ময়ে। এই ছোট্ট শরীরের মানুষটাই তখন ইতিহাস লিখছিল। সেই দিন জন্ম নিল এক কিংবদন্তি— “পকেট হারকিউলিস” নাইম সুলেমানোলু

নাইম সুলেমানোলু জন্মগ্রহণ করেন ২৩ জানুয়ারি ১৯৬৭ সালে, বুলগেরিয়ার মোমচিলগ্রাদ শহরে। তিনি তুর্কি বংশোদ্ভূত ছিলেন এবং ছোটবেলা থেকেই শারীরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী ছিলেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি ভারোত্তোলন অনুশীলন শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর প্রতিভা সবার নজরে আসে। তার জীবনের পথ ছিল কেবল খেলাধুলার নয়, ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের গল্পও। বুলগেরিয়ায় তুর্কি সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়নের সময় তিনি নিজের পরিচয় ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি তুরস্কে আশ্রয় নেন এবং সেখান থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুরস্কের প্রতিনিধিত্ব শুরু করেন।

গ্রিক পুরাণের বীর হারকিউলিস অসীম শক্তির প্রতীক। নাইমের খাটো গড়নের সঙ্গে অসাধারণ শক্তির সমন্বয় দেখে সাংবাদিকরাই তাকে ‘পকেট হারকিউলিস’ নামে অভিহিত করেন। ছোট শরীরে যেন এক দৈত্যাকার শক্তির বিস্ফোরণ — এই বৈপরীত্যই তাকে আলাদা করে তুলেছিল। পকেট হারকিউলিস খ্যাত এই ভারোত্তোলক ১৯৮৮ সিউল অলিম্পিক, ১৯৯২ বার্সেলোনা অলিম্পিক , ১৯৯৬ আটলান্টা অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয় করেন। তিনি ৭টি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ , ৬টি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয় করেন। তিনি তাঁর ক্যারিয়ারে ৪৬টির বেশি বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন, যা আজও ভারোত্তোলনের ইতিহাসে এক বিরল কৃতিত্ব।

কিংবদন্তি এই ভারোত্তোলক ২০১৭ সালের ১৮ নভেম্বর তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে মারা যান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে লিভারের গুরুতর সমস্যায় (লিভার সিরোসিস) ভুগছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং লিভার প্রতিস্থাপনও করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিলে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়ায় ৫০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে তুরস্কসহ বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে গভীর শোক নেমে আসে।

নাইম সুলেমানোলুর বুলগেরিয়ার শৈশবের বাড়িটিকে ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণ করে জাদুঘরে রূপান্তর করেছে তুরস্ক। তার বাড়িটি সংস্কার করে সেখানে তার ব্যবহৃত ব্যক্তিগত সামগ্রী, পদক, পুরোনো আলোকচিত্র ও জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের স্মারক প্রদর্শন করা হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা কিংবদন্তি এই ভারোত্তোলকের সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প জানতে পারেন। এই জাদুঘর শুধু তার ক্রীড়া অর্জনের স্মারক নয়, বরং প্রতিকূলতা জয় করে বিশ্বজয় করার অনুপ্রেরণার এক জীবন্ত দলিল।

বুলগেরিয়ার মোমচিলগ্রাদ শহরে নাইমের বাড়িটি বর্তমানে জাদুঘর। ছবি – www.dailysabah.com এর সৌজন্যে।

নাইম সুলেমানোলু তুরস্কে শুধু একজন কিংবদন্তি ভারোত্তোলক নন, বরং জাতীয় বীর হিসেবে স্মরণীয়। তিনটি অলিম্পিক স্বর্ণপদক, বিশেষ করে ১৯৮৮ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে তার ঐতিহাসিক সাফল্য তাকে দেশের গৌরবের প্রতীকে পরিণত করে। “পকেট হারকিউলিস” নামে পরিচিত এই মহান ক্রীড়াবিদকে তুরস্কে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়; তার নামে ক্রীড়া কমপ্লেক্স, প্রতিষ্ঠান ও স্মারক নির্মিত হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে শেষ বিদায় জানানো হয়। আজও তিনি তুর্কি জাতীয় আত্মমর্যাদা, সাহস ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক হিসেবে মানুষের হৃদয়ে অম্লান।

0 Votes: 0 Upvotes, 0 Downvotes (0 Points)

Leave a reply

    Join Us
    • Facebook
    • Youtube
    Deal Of The Month
      Categories

      Advertisement

      Loading Next Post...
      Follow
      Search Trending
      Popular Now
      Loading

      Signing-in 3 seconds...

      Signing-up 3 seconds...