হংকং পয়সাওয়ালাদের শহর। কম আয়ের লোকদের টিকে থাকতে লড়াই করতে হয় ওই শহরে। এদের অনেকেই থাকেন কফিনের মতো ছোট ঘরে। বাড়ির ভেতর ছোট ছোট খাঁচায়। সেইসব গল্প নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

৫৬ বছর বয়সি এক গৃহহীন নারী লাই। তিনি প্রতিদিনের মতো হংকংয়ের সড়ক ধরে হাঁটছেন। সূর্য তখনো পুরোপুরি উঠেনি। লাইয়ের গায়ে ধূসর ওভারকোট। পায়ে চপ্পল। মাথায় কালো চুল, ছোট করে ছাঁটা। চোখে কালো চশমা। ম্যাকডোনাল্ডস এর একটি বুথে ঢুকে যান তিনি। চেয়ারে বসেন। ম্যাকডোনাল্ড এর কর্মীরা তখন খাবার প্রস্তুত করছেন। হঠাৎ টেবিলের ওপর মাথা রেখে পড়ে গেলেন লাই। কেউ একজন এসে তার পালস চেক করলেন। অ্যাম্বুলেন্স ডাকলেন। কিন্তু ঘটনাস্থলেই তাকে মৃত ঘোষণা করা হলো।
সকাল সাড়ে ১১টায় পেছনের দরজা দিয়ে লাশ বের করে নেওয়া হলো। দুপুর একটা নাগাদ ম্যাকডোনাল্ড আবার ব্যস্ত হয়ে গেলো আগের মতো। ওখানে লাইয়ের কোনো চিহ্নই থাকলো না।
লাই ছিলেন হংকংয়ের গৃহহীনদের একজন। এই শহরে তার মতো আরো অনেক লোক আছেন, যাদের থাকার কোনো যায়গা নেই। এখানে-ওখানে সুযোগ পেলে একটু মাথা রাখেন, ঘুমিয়ে নেওয়ার চেস্টা করেন। কারণ এই শহরে বাড়িভাড়া করার মতো যোগ্যতা নেই লাইয়ের মতো শ্রমিকদের। হংকংয়ের একেকটি পরিবারের গড় আয় যত, ওখানকার সম্পত্তির দাম এর ১৯.৪ গুন। আবাসনের জন্য কুখ্যাত শহর লস অ্যাঞ্জেলসের চাইতেও এখানকার আবাসনের খরচ ৯.৪ গুন। সান ফ্যান্সিসকোর তুলনায় ৯.১ গুন।
প্রতি বর্গফুট জমির দাম ৩ হাজার ২০০ ডলারে পৌঁছেছে। একটি চার বেডরুমের বাড়ি বিক্রি হচ্ছে ১৭৭ মিলিয়ন ডলারে।
২০০৩ সাল থেকে বাড়ির দাম বেড়েছে ৪৩০ শতাংশ। হংকং রিয়েল এস্টেট এজেন্সি মিডল্যান্ড রিয়েলটির একটি প্রতিবেদন অনুসারে, শহরের প্রায় অর্ধেক অ্যাপার্টমেন্টের জন্য মাসে ২,৫৫০ ডলারের বেশি খরচ হয়, যা গড় ব্যক্তির বেতনের ১২২ শতাংশ।
চ্যান টু, ৩০ বছর বয়সি ধূসর চুলের যুবক। গত গ্রীষ্মে বাবুর্চির চাকরি হারিয়েছেন তিনি। এরপর লাইয়ের মতো ঘরহীন হন। ম্যাকডোনাল্ডসের আউটলেটে ঘুমানোর যায়গা খুঁজেন। চারমাস ধরে এভাবেই চলছে। তিনি জানান, ম্যাকডোনাল্ডয়ের মতো রেস্তোরাঁগুলো আবাসনেরও জায়গা।
প্রতিদিন সকালে ম্যাকডোনাল্ডের কর্মীরা খবরের কাগজ পড়তে পড়তে চ্যানকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলেন। পবিত্র দিনগুলোতে একটি স্থানীয় গির্জা বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ করে। আর বাকিদিন মানুষের ফেলে দেওয়া ডিনার কুড়িয়ে খান তিনি।
হংকংয়ের গৃহহীনরা ব্যস্ত সড়কের পাশে ঘুমাতেও বাধ্য হয়। ঢাকার বস্তির মতো সেখানেও আছে অবৈধ খুপরি। ঘুমানোর জন্য আছে ‘কফিন কিউবিকল’। কফিনের মতো ছোট বাকসের ভেতর শরীর ভাঁজ করে শুয়ে যেতে হয়।
একটি বড় ফ্ল্যাটে তৈরি করা হয় অনেকগুলো খাঁচা। সেই খাঁচাগুলো ভাড়া দেওয়া হয় আলাদা করে। দুই লাখেরও বেশি হংকংবাসীর বসবাস এইসব খাঁচাঘরে।
লরি নামের এক নারী জানিয়েছেন, এমন একটি খাঁচাঘরে তিনি তার ৯ বছর বয়সি মেয়েকে সাথে নিয়ে থাকছেন। এদের জন্য আলাদা কোনো বাথরুম নেই। নেই রান্নাঘর।
একটি হোটেলে ক্লিনার হিসেবে কাজ করেন লরি। থাকেন মং কোক পাড়ার আটতলায় খাঁচাঘরে। মাসে উপার্জন করেন ১৪০০ ডলার। এর তিনভাগের একভাগই চলে যায় খাঁচাঘরের ভাড়াবাবদ।
রান্না করতে গেলে বিশাল লাইনে থাকতে হয়। ঘুমাতে গেলে অন্য খাঁচা থেকে শুনা যায় মানুষের কোলাহল।
খাঁচাঘরে এমন অনেকেই দিনের পর দিন কাটিয়ে দিচ্ছেন, যারা থাকার জায়গার অভাবে বিয়ে করতে সাহস পান না। পরিবার নিয়ে যারা থাকেন, তাদেরও ঘুমোনোর পরিসর সীমিত। হংকংয়ে সন্তান নেওয়া দুঃসাহসের ব্যাপার।
হংকং সিটি ইউনিভার্সিটির হাউজিং এবং আরবান স্টাডিজের অধ্যাপক ইপ এনগাই-মিং বলেন, খাঁচাঘরগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। ফ্ল্যাটের ডিজাইন এগুলোর উপযুক্ত করে করা হয়নি। এতে আগুনের ঝুঁকি প্রকট।
অক্সফামের হংকং ম্যানেজার ওং শেক হাং বলেন, ‘আমি পাবলিক টয়লেটেও মানুষকে ঘুমুতে দেখেছি। বিমানবন্দরের পাবলিক টয়লেটগুলোও খালি থাকে না।’
হংকংয়ে আরো পাবলিক হাউজিং তৈরি করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
দ্বীপটিতে প্রায় ৮ লাখ ১৫ হাজার পাবলিক ভাড়া বাড়ি রয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে আরও ২ লাখ ৮০ হাজার পাবলিক অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার।
কীভাবে আবাসন সঙ্কট কাটানো যায়, সে জন্য ঘনবসতির দ্বীপটিতে কাজ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের একটি প্যানেল ব্রাউনফিল্ড সাইট তৈরি করা থেকে শুরু করে ভূগর্ভস্থ গুহা তৈরির কথাও ভাবছে। তবে হংকং সরকারের প্রধান লান্টাউ দ্বীপের পূব দিকে একটি কৃত্রিম দ্বীপ তৈরির প্রস্তাবও দিয়েছেন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে ওই দ্বীপে ২ লাখ ৬০ হাজার থেকে ৪ লাখ বাড়ি তৈরি করা যাবে। এগুলোর ৭০ শতাংশ থাকবে পাবলিক হাউজিং।
কিন্তু পরিকল্পনাগুলো আবাসন সমস্যা মোকাবেলার জন্য যুতসই নয় বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি সংস্থা লিবার রিসার্চ কমিউনিটর প্রধান ব্রায়ান ওং।। তিনি মনে করেন সমুদ্র থেকে জমি উদ্ধার ব্যয়বহুল কাজ। এটি পরিবেশের জন্য হুমকি। তাছাড়া এই কাজটি করতে কয়েক দশক সময় লাগতে পারে।
সমাজকর্মী অ্যাঞ্জেলা লুই মনে করেন, ভাড়ার উপর নিয়ন্ত্রণ না রাখায় লাগামছাড়া পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
মুক্ত অর্থনীতির সূচকে হংকং রয়েছে সবার উপরে। কিন্তু এই লাগামহীন অর্থ ব্যবস্থা হংকংয়ের আবাসন খাতকে নিয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
হংকং কেন এতোটা ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে?
এই প্রশ্নের স্বাভাবিক জবাব হলো- শহরের সীমিত আয়তন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে অদূরদর্শিতাকেই দায়ী করেন। দ্বীপটিতে সমস্ত ভূমির মালিকানা রাষ্ট্রের। নিলামের মাধ্যমে লম্বা সময়ের জন্য ভূমি ইজারা দেওয়া হয়। নিলামে অংশ নেয় আন্তর্জাতিক বিনোয়োগকারী সংস্থাগুলো। এরা চড়া দামে ইজারা নিয়ে নেয়। মুক্ত অর্থনীতিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য সুবিধাজনক এলাকা হংকং। এতে বিপুল লাভসহ তাদের বিনিয়োগ ফেরত পেতে সংস্থাগুলোর সমস্যা হয় না। কিন্তু বিপাকে পড়ে নিম্ন আয়ের লোকেরা। ভূমি ও থাকার জায়গা চলে যাচ্ছে ধরাছুঁয়ার বাইরে।